১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

যথাযোগ্য মর্যাদায় জেলহত্যা দিবস পালন


যথাযোগ্য মর্যাদায় জেলহত্যা দিবস পালন

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ গভীর শ্রদ্ধা-ভালবাসায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীরসেনানী শহীদ জাতীয় চার নেতাকে স্মরণ করল কৃতজ্ঞ বাঙালী জাতি। শহীদের কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি, আলোচনা সভা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলসহ নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মঙ্গলবার ঢাকাসহ সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে জেলহত্যা দিবস। দেশের ইতিহাসে অন্যতম বর্বরোচিত এই কালো অধ্যায়টিকে স্মরণ করে দেশবাসী। দিবসটির প্রতিটি অনুষ্ঠানেই একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসরদের রাজপথে থেকে মোকাবেলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

দিবসটি পালনে সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধানম-িতে বঙ্গবন্ধু জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পর প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতিকে সম্মান জানাতে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। পরে ৭টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী বনানী কবরস্থানে জাতীয় তিন নেতা শহীদ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। বনানী কবরস্থানে পবিত্র ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে এবং বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা জানানোর সময় কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর পুত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের পুত্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক, ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, মাহবুব-উল-আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আহমদ হোসেন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, মেজবাহ উদ্দিন সিরাজ, ফরিদুন্নাহার লাইলীসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। বনানী কবরস্থানে পবিত্র ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় চার নেতার মধ্যে এএইচএম কামারুজ্জানকে রাজশাহীর কাদিরগঞ্জে তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে সেখানেও নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয় শহীদ এই জাতীয় নেতাকে।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর সন্তান ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, জাতীয় চার নেতার পলাতক খুনীদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকরের মাধ্যমে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ করা হবে। সাজাপ্রাপ্ত পলাতক খুনীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দিতে আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের যে রাষ্ট্রগুলো কথায় কথায় আমাদের গণতন্ত্র শেখাতে চায়, যারা মানবাধিকারের কথা বলেন, তারাই বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার খুনীদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। তাই ওই সকল দেশকে বলব, যে সকল খুনী আপনাদের দেশে পালিয়ে আছে, তাদের বাংলাদেশে ফেরত দেয়া হোক।

১৯৭৫ সালের এই দিন সূর্যোদয়ের আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাÑ তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের সঙ্গে আপোস না করে মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন বলেই জাতির মুক্তি সংগ্রামের এই চার নেতা এখনও বাঙালী মানসে স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন। আদর্শের প্রতি অবিচল এই নেতাদের হার না মানার শক্তি আজও তাদের পরিজনদের শোকাকুল না করে, করে তোলে গর্বিত। শহীদ পরিবার ও তাঁদের স্বজনদের মতে, এই চার নেতা বেঁচে থাকলে তাঁদের প্রজ্ঞা আর বিচক্ষণতায় বাংলাদেশ এগিয়ে যেত অনেক দূর।

সকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যাকা-স্থল ‘মৃত্যুঞ্জয়ী কক্ষ’ পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামসহ শহীদ চার নেতার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেলহত্যার পলাতক খুনীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সাহায্য নেয়া হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দীবিনিময় চুক্তি না থাকায় হত্যাকারীদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।

এছাড়া বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও জাতীয় চার নেতার কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান জাতীয় পার্টি জেপির চেয়ারম্যান ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, ছাত্রলীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, যুবলীগ উত্তর ও দক্ষিণ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, ছাত্রলীগ উত্তর ও দক্ষিণ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক্যজোট, বাস্তুহারা লীগ, আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা লীগ, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিভিন্ন দল অসংখ্য সংগঠন।

দিবসটি পালন উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলীয় কার্যালয়সহ দেশের সর্বত্র সংগঠনের শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, কালো পতাকা উত্তোলন এবং কালোব্যাজ ধারণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ বনানীতে জাতীয় তিন নেতার মাজার এবং ১৫ আগস্টের শহীদদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ব্লকের নিচতলায় স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালে পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডাঃ কামরুল হাসান খানের নেতৃত্বে শিক্ষক, চিকিৎসক, কর্মকর্তা, নার্স ও কর্মচারীবৃন্দ। এ সময় উপউপাচার্য অধ্যাপক ডাঃ শরফুদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক ডাঃ রুহুল আমিন মিয়া, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাঃ আলী আসগর মোড়ল, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডাঃ আসাদুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাব কনফারেন্স হলে বঙ্গবন্ধু পরিষদ এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ডাঃ এসএ মালেকের সভাপতিত্বে সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ফায়েক উজ্জামান, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি শফিকুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। বক্তারা স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি বিএনপি-জামায়াতের সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলার জন্য স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির প্রতি আহ্বান জানান।

মনসুর ভবনে মিলাদ-মাহফিল ॥ জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার বাদ মাগরিব মনসুর ভবন, ধানম-ি-৭০১, রোড ১৩ (নতুন) এ মিলাদ-মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

মিলাদ-মাহফিলে অন্যদের মধ্যে অংশ নেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এম মনসুর আলীর পুত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, সভাপতিম-লীর সদস্য এ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালিক, মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এমপি, বিএমএ মহাসচিব অধ্যাপক ডাঃ এম ইকবাল আর্সলানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। মিলাদ মাহফিলে জাতীয় চার নেতার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।