২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শ্রদ্ধাঞ্জলি ॥ বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য


মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে বাংলাদেশে যত নাগরিক আন্দোলন হয়েছে সবচেয়ে দীর্ঘ, কঠিন ও জটিল ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন। ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠনের মাধ্যমে সংগঠিতভাবে এই নাগরিক আন্দোলন বিকশিত হলেও এর সূচনা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ঠিক পরই, ১৯৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ প্রথম রাস্তায় নেমেছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে দাবিতে, যে আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের পরিবারবর্গ। ’৭২ সালের ১৭ মার্চ এই আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মারকপত্র প্রদান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ’৭২ সালেই ’৭১-এর ঘাতক দালালদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, যা তাঁর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এসে বন্ধ করে দেয়। জিয়া শুধু যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচারই বন্ধ করেননি, বঙ্গবন্ধুর সময় ৭৩টি ট্রাইব্যুনালে যে সব যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি হয়েছিল, যারা কারাগারে শাস্তিভোগ করছিল তাদেরও ছেড়ে দিয়েছিলেন।

১৯৭২-এ সূচিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নাগরিক আন্দোলন অসংগঠিত হলেও ’৯২ সাল পর্যন্ত নাগরিকদের বিভিন্ন ফোরামে এই বিচারের দাবি বার বার উত্থাপিত হয়েছে, যা সংগঠিত ও শক্তিশালী অবয়ব পেয়েছে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে।

যে কোন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন তখনই সফল হয় যখন সে আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকেন লক্ষ্য অর্জনে অবিচল, দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধ, সৎ ও মেধাবী নেতৃত্ব। আন্দোলনে সাফল্য অর্জনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হচ্ছে দাবির যৌক্তিকতা এবং এর তাত্ত্বিক ভিত্তি। জাহানারা ইমামের আন্দোলন সফল হতে পেরেছে যোগ্য নেতৃত্বের কারণে, যাদের ভেতর দেশের ছিলেন বরেণ্য শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা। এই আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি যাঁরা নির্মাণ করেছেন তাঁদের অন্যতম হচ্ছেন বিচারপতি দেবেশচন্দ্র ভট্টাচার্য।

গণআদালতে গোলাম আযমের বিচারে কর্মসূচীকে বিএনপি সরকার প্রথম থেকেই ‘বেআইনী’ বলেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে আমরা নাকি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছি। সরকারের এই অভিযোগের জবাব দেয়ার জন্য শহীদজননী জাহানারা ইমাম এবং তাঁর সহযোগীরা বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক অন্যান্য প্রবীণ আইনজ্ঞদের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় আমাদের বলেছেন এবং সংবাদপত্রে প্রদত্ত সাক্ষাতকারে গণআদালত সম্পর্কে সরকারের অভিযোগের জবাবেও বলেছেন, গণআদালতের ধারণা বাংলাদেশে বা অন্যত্র নতুন কিছু নয়। এটি একটি প্রতীকী আদালত, যার মাধ্যমে কোন অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি এবং জনগণের অভিপ্রায় মূর্ত হয়। গণআদালতের উদ্যোক্তারা কোন অবস্থায় প্রচলিত আদালত বা বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিছু করছেন না। সরকারের হুমকির কারণে গণআদালতের কর্মসূচী সম্পর্কে কারও কারও ভেতর দ্বিধা ও সংশয় ছিল বটে, বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্যের সহজ সরল যুক্তি ও আইনগ্রাহ্য বক্তব্য সব দ্বিধা অপসারিত করেছে।

আদালতে এই মামলা পরিচালনা করেছেন ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার শওকত আলী খান ও ড. কামাল হোসেনসহ সুপ্রীমকোর্ট ও জেলা কোর্টের শত শত আইনজীবী। বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য ছিলেন তাদের সকলের অভিভাবক। যখনই কোন আইনী বিষয়ে পরামর্শের প্রয়োজন হয়েছে তখনই আমরা তাঁর শরণাপন্ন হয়েছি। আইনের অত্যন্ত জটিল বিষয়গুলো সহজ প্রাঞ্জল ভাষায় তিনি যেভাবে আন্দোলনের নেতাদের বুঝিয়ে দিতেন। গণআদালতের যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের পর অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের দুষ্কর্ম সম্পর্কে তথ্য প্রমাণ সংগ্রহের জন্য ১৯৯৩-এর ২৬ মার্চ এদেশের নাগরিক আন্দোলনের পুরোগামী নেতা কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে ১২ জন বরেণ্য আইনজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল জাতীয় গণতদন্ত কমিশন, যার অন্যতম সদস্য ছিলেন বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মহাজোট ক্ষমতায় এসে ১৯৭৩-এর আইনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে আমাদের দীর্ঘকালের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন পূরণ করেছেন, আমাদের চেতনায় যার বীজ বপন করেছিলেন বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য।

মুক্তিযুদ্ধের চেতানায় ভাস্বর বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়েছে ১৯৭২-এর ৪ নবেম্বর। কাকতালীয়ভাবে ৪ নবেম্বর বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্যেরও জন্মদিন এ বছর পালিত হচ্ছে তাঁর জন্মশতবার্ষিকী। ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ ৪৪তম সংবিধান দিবসের সকল কর্মসূচী তাঁকে উৎসর্গ করেছে।

বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির ‘পাকিস্তানীকরণ’ বা ‘ইসলামীকরণ’ কখনও মেনে নেননি। ’৭২-এর সংবিধানের গুরুত্ব তুলে ধরে এটি পুনর্প্রবর্তনের জন্য তিনি ক্রমাগত লিখেছেন যা মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী প্রগতির আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের আলোকিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যে মশাল তিনি আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন সেটি বহন করে নিয়ে যেতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, যতদিন পর্যন্ত এ দেশের মাটি থেকে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ চিরতরে নির্মূল না হয়।

৩ নবেম্বর ২০১৫