২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

মানুষ শেষ কথা নয়


যদি বলি আধুনিকতা এবং উত্তর-আধুনিকতা, দুই-ই, ঐতিহাসিক চেতনা বোধের সঙ্কটের প্রতিভূ। যেক্ষেত্রে আধুনিকতা একটা অসম্ভব প্রয়াস বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতার মধ্যে সমগ্র তৈরি করার, সেক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিকতা ইতিহাস থেকে সকল নিউরোসিস ঝেঁটিয়ে বিদায় করার প্রয়াস। এই প্রয়াসে অন্তর্ভুক্ত প্রতিযোগী মতাদর্শ, পদ্ধতি এবং সঙ্কট। নিটশে, মার্ক্স, ফ্রয়েডের শিষ্যরা সংস্কৃতি ও প্রতিসংস্কৃতির নাম করে ঐতিহ্য, আধুনিকতা ও চেতনার নাম করে আকাশ বাতাস ভরিয়ে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে একটা প্রতিযোগিতা আছে। প্রতিযোগিতার একদিকে আছে পশ্চিমা বুর্জোয়া ইতিহাসবিদদের মডেল, যাদের অন্যতম হবসবম, অন্যদিকে আছে দক্ষিণ এশিয়ার নন-বুর্জোয়া ইতিহাসবিদদের মডেল, যাদের অন্যতম হচ্ছে সাব-অলটার্ন স্টাডিজ গ্রুপের রণজিৎ গুহ, যার বক্তব্য হচ্ছে ভারতীয় ইতিহাস কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস লিখতে হবে প্রকৃত ইতিহাস-নির্মাতাদের পরিপ্রেক্ষিত থেকে : শহুরে জনসাধারণ, গ্রামের দরিদ্রজনদের পরিপ্রেক্ষিত থেকে, জাতীয়তাবাদী এলিটদের বাদ দিয়ে। এ এলিটরা নন-এলিটদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে না। ফাননের কথা আমাদের মনে রাখা জরুরী : সমগ্র তৃতীয় বিশ্ব ইউরোপের ইতিহাস তৈরি করেছে। আমরা কি করে ভুলব জাতীয়তাবাদী এলিট ও জাতীয়তাবাদ প্রতিরোধকারী নন-এলিটদের দ্বন্দ্বের কথা, যে দ্বন্দ¦ ও সংঘাত ভারতে, বাংলাদেশে, চীনে, আফ্রিকার কোন কোন অংশে, আরব দুনিয়ায় ও লাতিন আমেরিকায় দেখা দিয়েছে। যারা ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন তারা জানেন কোন ধরনের বিতর্ক ইসলামিক, চৈনিক, জাপানিজ, আফ্রিকান, ভারতীয়, বাংলাদেশী স্টাডিজে গর্জন করছে ইতিহাস লেখার অথরিটি ও রিপ্রেজেন্টেশনের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, এখানেই কাজ করছে মুনতাসীর মামুন, সালাউদ্দিন আহমেদ, স্বদেশ রায়, মিলু শামসের ইতিহাস সম্বন্ধে মনোভঙ্গি। তারা ধর্মের রাজনীতিকীকরণের বিরুদ্ধে ও সাধারণ মানুষের অধিকারের সপক্ষে। জামায়াত, বিএনপি ও অন্যান্য ধর্মজ রাজনৈতিক দল ধর্মের রাজনীতিকীকরণ করে চলেছে এবং সাধারণ মানুষদের সকল অধিকার থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। যেন সাধারণ মানুষ কম মূল্যের অধিকার বড় মাপের ইতিহাস নির্মাণের ক্ষেত্রে। অধিকার মোল্লা-মৌলভীদের কিংবা ধর্মজ রাজনৈতিক নেতাদের : অন্যদের হটিয়ে দিতে হবে। এই দাবি সত্য নয়।

বর্তমান মুহূর্তে, অদ্ভুত জোর দেয়া হচ্ছে জাতীয় স্মারকের রাজনীতির ওপর। এই স্মারক বাঙালী স্মারক নয়, এই স্মারক মুসলমানের স্মারক। এই স্মারকের উদ্ভব ঘটেছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্রাজ্যবাদী অভিজ্ঞতা থেকে। এই অভিজ্ঞতার একটা অংশ ধর্মজ স্মারক থেকে উদ্ভূত হয়েছে, অন্য অংশ কলোনাইজড জনসাধারণের অভিজ্ঞতা থেকে। কলোনাইজড জনসাধারণের অভিজ্ঞতার অংশ ইংরেজ ও ফরাসী এবং ধর্মজ অভিজ্ঞতা। এর ফলে জনসাধারণের মধ্যে ইংরেজ, ফরাসী, বিভিন্ন ধরনের মুসলমান জাতি দেখা দিয়েছে। আমরা কি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলমান জাতির অংশ কিংবা বাঙালী বলে মুসলমান জাতির মধ্যে অংশগ্রহণ করতে অক্ষম। এই সূত্র ধরে জামায়াত, বিএনপি ও অন্যান্য ধর্মজ রাজনৈতিক দল বাঙালিত্বের বিরোধিতা করছে। এই বিরোধিতার কোন ভিত্তি নেই।

বর্তমান মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, উত্তর আফ্রিকা থেকে প্রধানত গরিবদের বিতাড়িত করা হচ্ছে এবং তারা আশ্রয়ের খোঁজে, জীবিকার খোঁজে ইউরোপে যাত্রা করা শুরু করেছে। ইউরোপের পূর্ব অংশ তাদের দেশে ঢুকতে দিচ্ছে না, অন্যপক্ষে ইউরোপের পশ্চিম অংশ তাদের আশ্রয় এবং জীবিকা দিতে কিছু পরিমাণ রাজি। কিন্তু কোন মুসলমানের দেশ (মধ্যপ্রাচ্য) তাদের আশ্রয় এবং জীবিকা দিতে রাজি নয়। যদিও এই সমস্ত দেশ সমৃদ্ধশালী, জনসংখ্যার দিক থেকে বিশাল নয়। সৌদি আরব, ইয়েমেন (যদিও এই দুটি দেশ পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত), ইরাক, তুরস্ক, লেবানন প্রধানত মুসলমান হওয়া সত্ত্বে¡ও তাদের এসব দেশে জায়গা নেই। ধর্ম এক, সংস্কৃতি এক : তবু তাদের জায়গা নেই। বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা হেঁটে কিংবা নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অজানার সন্ধানে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

এসব ঘটনা, প্রধানত, ফোকাস করছে মুসলমানদের বিভিন্নতা, তাদের এথনিক আইডেনটিটি, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য। এসব জাতি ধর্মজ এক আইডেনটিটি থাকা সত্ত্বেও, সাব-অলটার্ন, অধস্তন, তারা অক্ষম মধ্যপ্রাচ্যের সমৃদ্ধশালী সংস্কৃতি শেয়ার করার ক্ষেত্রে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে বলতে হয় : ইতিহাস হচ্ছে বাস্তবতার বিজ্ঞান, এই বিজ্ঞান সরাসরি আমাদের ওপর প্রতিক্রিয়া বিস্তার করে, আমাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়, বাধ্য করে আমাদের চেতনার দিকে মনোনিবেশ করতে। এটা হচ্ছে, একমাত্র বিজ্ঞান যেখানে মানুষ চলাফেরা করতে বাধ্য হয় তাদের সমগ্র বোধ নিয়ে। ইতিহাসের ছত্রছায়ায় আমরা শুধু অতীত বুঝি না, সাধারণভাবে সব ঘটনার দিকে ফিরে তাকাই, ইতিহাস সে জন্য বর্তমানকে অন্তর্ভুক্ত করে।

সংস্কৃতি হচ্ছে ইতিহাস, সাহিত্য, ভূগোল সম্বন্ধে সচেতন হওয়া। সংস্কৃতি উত্থিত ধর্মবোধ কিংবা সংস্কৃতি হচ্ছে আধুনিকতা বিষয়ে সংঘাত (যেখানে আমরা জাতিত্বের বোধ নিয়ে লড়াই করি এবং অতীত বোঝার চেষ্টা করি), এখানেই লুকাস এবং গ্রামসী আধুনিকতা নিয়ে লড়াই করেছেন। আধুনিকতা কিংবা উত্তর-আধুনিকতা হচ্ছে সঙ্কট। কোন ফিনিশড আদর্শ রাষ্ট্র নয়। আধুনিকতার চিহ্ন কোন চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়, ক্ষমতার দিক থেকে, যুক্তির দিক থেকে, ধর্মবোধের দিক থেকে শেষ কথা নয়।

শেষ কথা বলে বেড়ায় ধর্মজ রাজনীতি তাদের পেশা। মানুষ কখনও শেষ কথা বলে না এবং সমাপ্তির দিকে অগ্রসর হয় না। সেজন্য মানুষ মহান এবং জ্ঞানী।