২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

গুরুত্বপূর্ণ মামলা তদন্তে মাঠে নেমেছে পুলিশের চৌকস ইউনিট পিবিআই


সমুদ্র হক ॥ মেধাদীপ্ত চৌকস পুলিশ অফিসারদের নিয়ে দেশে এই প্রথম চালু হয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। অতি মর্যাদাসম্পন্ন পুলিশ বিভাগের এই শাখা অত্যাধুনিক ডিজিটাল সরঞ্জামাদি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) আদলে গঠিত। পিবিআইয়ের অনেক কর্মকর্তা ইতোমধ্যে এফবিআই ও মার্কিন পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পুলিশের এমন শাখা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সেন্ট্রোল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) নামে পরিচিত।

সূত্র জানায়, দেশে অপরাধ দমনে, অপরাধী ও অপরাধ ডিকেটশনে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অতি উন্নত তদন্তের লক্ষ্যে এফবিআইয়ের মতো একটি চৌকস পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা হয়। পিবিআই নামে পৃথক তদন্ত ইউনিট গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত পিবিআই গঠনের সিদ্ধান্ত দেন। ২ হাজার ১১ সালে পুলিশ এ্যাক্টের একটি ধারার ক্ষমতাবলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশে পিবিআই গঠিত হয়। তারপর চৌকস ও মেধাবী অফিসারদের পিবিআইতে যোগদান করিয়ে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় এবং দেশে ও বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক এনে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

মূলত পিবিআই গঠিন হয়েছে আলোচিত চাঞ্চল্যকর মামলাসহ যে মামলাগুলো ডিটেক্ট করা যাচ্ছে না বা যে হত্যাকা- ক্লুলেস হয়ে আছে এ ধরনের সকল জটিল মামলা দ্রুত তদন্ত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসাই পিবিআইয়ের কাজ। তদন্ত ছাড়া পিবিআইয়ের বাড়তি কোন কাজ নেই। যে কারণে আশা করা হচ্ছে পুলিশ বিভাগের মর্যাদা বাড়াতে পিবিআই বিশ্বের উন্নত দেশের মতোই কাজ করবে। পিবিআইয়ের কাছে যানবাহনসহ অত্যাধুনিক সকল সরঞ্জামাদি সরবরাহ করা হবে। পিবিআইয়ের সবচেয়ে বড় প্রশিক্ষণ ক্রাইম সিন ম্যানেজমেন্ট। এই কাজে দক্ষ অফিসার আছে। যাদের সঙ্গে থাকবে বিশেষ ধরনের কিট বক্স। এভিডেন্স কালেকশন বক্স। টুলস এ্যাপারেটাস ও এগুলোর ব্যবহার। ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করে মেলানো হবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের আঙুলের ছাপের সঙ্গে। পায়ের ছাপ ডিএনএর আলামত, রক্ত ও হলুদ ফিতার মধ্যে (ক্রাইম সিন এরিয়া) পাওয়া সকল কিছুই সংগ্রহ করে কম্পিউটারের বিশেষ ধরনের কয়েকটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে। অপরাধী শনাক্তে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় বিশেষ সফটওয়্যারে স্কেচ করা হবে (ছবি আঁকা)। যতক্ষণ পর্যন্ত এই ছবি অপরাধীর আদলের সঙ্গে না মিলবে ততক্ষণ কম্পিউটার স্কেচ করতেই থাকবে। এই কাজে ভাল ছবি আঁকার কোন শিল্পী নিয়োগ করা হতে পারে। বর্তমানে সেল ফোন (মোবাইল ফোন) ট্র্যাকিংয়ের সঙ্গে আরও আধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্ত করা হচ্ছে। বিশেষ ধরনের এই সফটওয়্যারও মোবাইল ফোন নষ্ট করা হলেও পূর্বে ব্যবহৃত সিমের মডিউলের সকল তথ্য বের করা যাবে। এ ছাড়াও এমন কিছু প্রযুক্তি পিবিআইয়ের সঙ্গে যোগ হচ্ছে তদন্তের পর যা দিয়ে অপরাধী শনাক্ত সহজ হবে। আগামী দিনে অপরাধ করে পার পাওয়ার দিন আর থাকবে না। যেভাবেই হোক তা ডিকটেক্ট হবেই, এমন আশাবাদ বেশ জোরের সঙ্গে করলেন পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আখতার হোসেন। জানালেন পিবিআইয়ের সকল অফিসারকে কম্পিউটারের নতুন প্রযুক্তিগুলোর সঙ্গে পরিচিত করিয়ে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে মাঠপর্যায়ে যে কোন পরিস্থিতিতে কাজ করতে তারা সক্ষম। উদাহারণ দিয়ে বললেন, গত এক বছরের কার্যক্রমে তারা প্রতিটি জটিল মামলার টু দ্য পয়েন্টে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করেছেন এবং অপরাধী শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনেছেন। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তদন্ত শেষে আদালতে দাখিলের সময় প্রতিটি মামলার চেকলিস্ট সংযুক্তকরণ বাধ্যতামূলক। এ ছাড়াও চার্জশীট প্রদানের সময় তদন্তকারী কর্মকর্তা পোস্টমর্টেম করা চিকিৎসক সাক্ষী বাদী কে কি তথ্য দেবেন ও বলবেন তারও ফিরিসিবত তুলে ধরতে হবে। প্রতিটি তদন্ত নির্ভুল ও বিজ্ঞানের যুক্তিতে বাস্তবতার নিরিখে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

পিবিআই প্রথম পর্যায়ে ঢাকা, কুমিল্লা, গাজীপুর, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও সিলেটে অফিস স্থাপন করে কার্যক্রম শুরু করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে এ বছরের শুরুতে বগুড়া, মানিকগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ, কক্সবাজার, যশোর, পটুয়াখালী ও দিনাজপুরে কার্যক্রম শুরু করেছে। তৃতীয় পর্যায়ে আগামী বছর হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পাবনা ও কুষ্টিয়ায় পিবিআই কার্যক্রম শুরু করবে। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি জেলায় পিবিআই প্রতিষ্ঠিত হবে। সূত্র জানায়, বর্তমান অর্গানোগ্রামে পিবিআইয়ের প্রধান ডিআইজি পদমর্যাদার। বর্তমানে পিবিআইয়ের জনবল ৯শ’ ৭০ জন। যাদের মধ্যে আছেন একজন ডিআইজি, দুইজন অতিরিক্ত ডিআইজি, ৯ জন পুলিশ সুপার, ৭০ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ৪ জন সহকারী পুলিশ সুপার, ৩শ’ ১০ জন ইন্সপেক্টর, ২শ’ ৮০ জন সাব ইন্সপেক্টর, ১শ’ ২১ জন সহকারী সাব ইন্সপেক্টর ২শ’ ৪২ জন কনস্টেবল। পিবিআইয়ে এখনও কোন মহিলা অফিসার নেই। তবে শীঘ্রই মহিলা অফিসার সংযুক্ত হবে। নতুন এই প্রতিষ্ঠানে আরও ১ হাজার ৭২ জনবল চাওয়া হয়েছে। পিবিআইয়ের জন্য এখনও নির্দিষ্ট পোশাক নির্ধারণ হয়নি। অপারেশনে যাওয়ার সময় জেলা পুলিশের পোশাক এবং তদন্তের কাজে সাধারণ পোশাক ও জ্যাকেট পরতে পারবে। পিবিআই বগুড়া অফিসের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আখতার হোসেন জানান, দেশে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নেয়ার পর এ বছর জানুয়ারিতে তিনি দায়িত্ব নিয়ে আসেন। থানা পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া মামলাসহ তিনটি জটিল মামলার তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হয়। আরও কয়েকটি মামলার তদন্ত চলছে। আশা করা হচ্ছে সবগুলো মামলার প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হয়ে অপরাধীকে শনাক্ত করা যাবে।

আরেক সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত সারাদেশে জটিল প্রায় দেড় শ’ মামলার তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় দেড় লাখ মামলা হয়। পিবিআই জনবলসহ দ্রুত সব ধরনের সাপোর্ট পেলে এর অর্ধেক মামলা তদন্ত করতে পারে। পুলিশ বিভাগের কয়েক কর্মকর্তা বললেন, যেহেতু পিবিআইয়ের কাজ জটিল মামলাগুলোর শুধু তদন্ত করা এবং যেখানে চৌকস ও মেধাবী অফিসাররা আছেন সেখানে দেশের পুলিশ বাহিনীর মর্যাদা তুলে ধরতে পারবে তারা। আমাদের পুলিশ কর্মকর্তাগণ যখন বিদেশে গিয়ে দক্ষতা দেখিয়ে সুনাম ও সম্মান বয়ে আনে তখন পিবিআইও এই সুনাম ধরে রেখে পুলিশের গৌরব বাড়াবে। ২৫ মার্চ ভয়াল রাতে দেশের এই পুলিশ বাহিনী রাজারবাগে জীবন দিয়ে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে হানাদার পাকিস্তানী সেনাবহিনীর বিরুদ্ধে। গর্বিত সেই পুলিশ বাহিনী গর্ব করতে পারে পিবিআই দিয়ে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: