১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ভারতীয় ঋণে শর্তের জাল


হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ শর্তের বেড়াজালে নতুন ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিডের (এলওসি) ২০০ কোটি ডলার ঋণ। ফলে আন্তর্জাতিক ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরও দেরি হচ্ছে। এ বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে আগামী সপ্তাহে ঢাকায় বসছে দু’দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। তবে ঋণের কয়েকটি শর্তের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কয়েক দফা চিঠি চালাচালী হয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারত থেকে পণ্য আমদানির শর্ত চূড়ান্ত করার বিষয়সহ ঋণ চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করতে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগামী ৯ নবেম্বর দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে ভারতের এক্সিম ব্যাংক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে পণ্য ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। গত আগস্টে দুই দফা এবং অক্টোবরের মাঝামাঝিতে আরেক দফা আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পূর্ত কাজ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে অর্ধেক পণ্য এবং অন্য প্রকল্পে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত আনার সিদ্ধান্ত হয়। এর পর ভারতের কাছে সেই প্রস্তাব পাঠানো হয়। এ প্রস্তাবে এখনও সম্মতি দেয়নি ভারত। দেশটি আগের ১০০ কোটি ডলার ঋণের মতো প্রতিটি প্রকল্পে পৃথকভাবে বিবেচনা করে পণ্য আমদানির শর্ত নির্ধারণ করতে চেয়েছে। ফলে ভারত থেকে আমদানির শর্ত শেষ পর্যন্ত শিথিল হতে পারে নাকি আগের মতোই থাকবে কথা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। তবে শেষ পর্যন্ত শর্ত শিথিল হবে বলে মনে করছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।

ইআরডির এশিয়া উইংয়ে যুগ্ম সচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভারতীয় দ্বিতীয় ঋণের বিষয়ে নানা বাংলাদেশের প্রস্তাবগুলো এতদিন চিঠিপত্রের মাধ্যমে তাদের জানানো হতো। এখন দু’দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এক টেবিলে বসে সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারবে। এর ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

সম্প্রতি চুক্তির একটি খসড়া পাঠিয়েছে ভারত। যেখানে প্রতিশ্রুত ঋণের প্রত্যেকটি প্রকল্পে ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। তবে সব প্রকল্পে ঢালাওভাবে পরামর্শক নিয়োগে অর্থ ব্যয় করতে চায় না বাংলাদেশ। সম্প্রতি ইআরডিতে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ইআরডি এশিয়া উইংয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পাঠানো খসড়ায় আগের ঋণের তুলনায় বেশ কিছু শর্ত পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে নতুন শর্তের মধ্যে রয়েছে- প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সকল ভারতীয় জন্য কর ও ভ্যাট মওকুফ, সব ক্ষেত্রে পরামর্শক নিয়োগ, ঋণপত্র পদ্ধতির পরিবর্তন। এসব শর্তের বাইরে সম্প্রতি এক বৈঠকে প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় সংক্রান্ত বিষয়ে মন্ত্রণালয়গুলোর সুনির্দিষ্ট পরামর্শ নেয়া হয়েছে। এখন সেটি ঋণ চুক্তির আগে ভারতের কাছে পাঠানো হবে। তবে খসড়া চূড়ান্ত করার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে।

ইআরডির কাছে পাঠানো দেশটির চুক্তির খসড়ায় সকল পণ্য ও সেবা সংগ্রহের ক্ষেত্রে এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ভারতের ব্যক্তিদের কর ও ভ্যাট মওকুফের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, এ ধরনের কর ও ভ্যাট মওকুফের সুযোগ নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ ক্ষেত্রে কোরিয়া এবং চীনা ঠিকাদারদের ক্ষেত্রে কোন ধরনের সুযোগ দেয়া হয়েছে সেটি যাচাই-বাছাই করছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

গত জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকালে ২০০ কোটি ডলার ঋণের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। নতুন ঋণের আওতায় বাস্তবায়নাধীনে প্রত্যেকটিতে পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। তবে এ প্রস্তাবের বিষয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়গুলো অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছে। তাদের মতে, প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শকের প্রয়োজন নেই। কোন প্রকল্পের জন্য ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজন হলে ঋণের বদলে সরকারের অর্থে নিয়োগ করা যেতে পারে। ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগের বিষয়টি ঐচ্ছিক রাখতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন হলে সরকারী অর্থে বাংলাদেশ ও ভারতসহ বিশে^র যে কোন দেশ হতে নিয়োগের সুযোগ রাখতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া উইংয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, শর্তগুলোর বিস্তারিত নিয়ে ইআরডিতে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রস্তাব নেয়া হয়েছে। এখন চুক্তির আগে বাংলাদেশের প্রস্তাবগুলো পাঠানো হবে। সেখানে ভারতের মতামত পাওয়ার পর আলোচনা সাপেক্ষে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করা হবে।

নতুন ঋণের আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারত থেকে ৭৫ শতাংশ পণ্য ও সেবা আমদানির শর্ত রয়েছে। নতুন ঋণের সুদহার ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে ভারত থেকে পণ্য কেনার শর্ত শিথিলের দাবি করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো। তারা চায়, ভৌত অবকাঠামো সংক্রান্ত নির্মাণে প্রকল্পের ৭৫ শতাংশের পরিবর্তে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ আমদানির শর্ত দিয়ে চুক্তি হোক। আগের ঋণে ভৌত অবকাঠামো প্রকল্পে ৬৫ শতাংশ পণ্য আমদানির শর্ত ছিল। আর পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।

সূত্র জানায়, ভারতীয় নতুন ঋণে ১৪টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪৫ কোটি ডলার। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চারটি মেডিক্যাল কলেজ ও একটি জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট স্থাপন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আশুগঞ্জ নদী বন্দরের আধুনিকায়ন এবং আশুগঞ্জ বন্দরের অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ব্যবস্থার উন্নয়ন, আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া সড়ক চার লেনে রূপান্তর, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৪৯টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও দুটি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট উন্নয়ন এবং মংলায় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

সূত্র জানায়, ২০১০ সালে ভারত সরকার বাংলাদেশকে প্রথম দফায় ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেয়। তৎকালীন ভারতীয় অর্থমন্ত্রী বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী ওই ঋণের ২০ কোটি ডলার পরে অনুদান হিসেবে ঘোষণা করেন। বাকি ৮০ কোটি ডলার দিয়ে বর্তমানে ১৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।