২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ইন্টারনেট কি আমাদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছে?


আমি যখন ইন্টারনেট নিয়ে লেখালেখি ও ব্যবহার শুরু করি তখন বাংলাদেশে খুব বেশি মানুষ প্রযুক্তি নিয়ে লিখত বলে মনে পড়ে না। অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশের মানুষকে ইন্টারনেট চিনিয়েছে আমার এক সময়কার লেখা। কেউ কেউ আমাকে অনুরোধ করেন, কেন আমি আগের মতো প্রযুক্তি নিয়ে লিখি না। তাদের আমি বলি, আমি সারাজীবন এক জায়গায় আটকে থাকতে চাই না। আমার জীবন চলমান নদীর মতো, প্রবহমান। আমি চাই অন্য কেউ আমার সেই জায়গাটা নিয়ে নিক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার আগ্রহ বদলে গেছে। আমি এখন অনেক বেশি মজা পাই ফিলোসফি নিয়ে পড়তে, ভাবতে এবং লিখতে। প্রযুক্তি নিয়ে লেখার মানুষের এখন অভাব নেই।

বর্তমান সময়ে যারা প্রযুক্তি নিয়ে লেখালেখি করেন তাদের অনেকের লেখাই চোখে পড়ে। ভাল-খারাপ নিয়ে মন্তব্য করার জন্য আমার এ লেখা নয়। তাদের একটি বড় অংশ লেখায় বলার চেষ্টা করেন যে, ইন্টারনেট আমাদের শিশুদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছে। শুধু যে তরুণ লেখকরা এমন বলে থাকেন তা নয়, খুব জনপ্রিয় লেখকদেরও দেখি একই কথা বলতে। তাই এ বিষয়ে আমার একটা মতামত থাকতে পারে বলে মনে করছি। কোন মাতাপিতা এই লেখা পড়ে তাদের চিন্তার খোরাক পেলেও পেতে পারেন।

দুই.

আমার দাদার বাড়ি জামালপুর জেলার ঘোড়াধাপ গ্রামে। সারাজীবনে আমি কতবার দাদার বাড়ি গিয়েছি হাতে গুনে বলে দিতে পারব! আমার বাবার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুব খোলামেলা ছিল না। আমি হয়ত কিছুটা তাকে ছুঁতে পারতাম। বেশিরভাগ সময়ই দূর থেকে কথা হতো। বর্তমান সময়ের ছেলেমেয়েরা এটা বুঝতে পারবে বলে মনে হয় না।

বাবার সঙ্গে আমার যে খুব কথা বলতে হতো তা নয়। বাবা সরকারী চাকুরে ছিলেন। ফরিদপুরের রাজৈরে থাকার সময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেছিলেন, তোর বাবা করে সিওগিরি (সার্কেল অফিসার), তুই করবি ডিসিগিরি! আমি যখন ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বুয়েটের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি আব্বা বললেনÑ তুই কি সরকারী চাকরি করবি না? আব্বা বুঝাতে চাইলেন, আমি প্রকৌশল না পড়ে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এ্যাডমিন ক্যাডারে যাব কিনা? বাবার সঙ্গে ক্যারিয়ার নিয়ে ওইটুকুই কথা। এছাড়া কোথায় পড়ছি, কি পড়ছি, কিভাবে পড়ছিÑ আব্বা কিছু জানতেন বলে মনে হয় না। আর ছোটবেলার হেডস্যারকে মাথা নেড়ে যে সম্মতি দিয়েছিলাম সেটাও রাখতে পারলাম না।

সৎ অফিসার হিসেবে আব্বার খুব নাম-ডাক ছিল। মানুষ ভয় পেত। আমরা ভয় পেতাম না ততটা, তবে দূরত্ব ছিল। তাই বাবাকে জানার সুযোগ আমার খুব একটা হয়নি। বাবার ছোটবেলা কিভাবে কেটেছে তা জানার সুযোগ হয়নি। তবুও যখন দাদার বাড়িতে যেতাম তখন দাদির কাছে কিছু গল্প শুনেছিলাম। তার কিছুটা মনে আছে।

বাবা ছোটবেলা থেকেই খুব নরম শরীরের মানুষ ছিলেন। জমিতে কাজ করতে পারতেন না, হালচাষ তাকে দিয়ে হতো না। আবার বাবা ছিলেন দাদার বড় ছেলে। দাদা দেখলেন তার এই বড় ছেলে তো ভাত খেতে পাবে না। জমি থেকে তাকে সরিয়ে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। বাকি দুই ছেলে জমিতে রয়ে গেলেন। আমরা যখন দাদাবাড়ি যেতাম সেই চাচাদের সঙ্গে আমাদের দেখা হতো। দাদা তখন বিছানায় পড়ে গেছেন, দাদি আমাদের আদর করে খাওয়াতেন। বছরে একবার স্কুল ছুটি হলে যাওয়া হতো আমাদের। নিজের বড় ছেলের সন্তানদের দেখার জন্য তাদের সে কী প্রতীক্ষা! এক দেশে থাকার পরও বছরে দুইবার যাওয়ার মতো আমাদের আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না।

বাবা ছোটবেলায় স্কুলে যেতেন হেঁটে, খালি পায়ে। ধুতি পরতে হতো তখন। দাদার যে পরিমাণ জমি ছিল সেটা অনেক বেশিও মনে হয়নি; আবার একদম খারাপও মনে হয়নি। তবে তখনকার মানুষের জীবনে কষ্ট ছিল সেটা বুঝতে পারতাম। তিন বেলা ভাত জুটলেও অন্য কিছুতে কষ্ট ছিল। একটা শার্ট ছিঁড়ে যাবে সেই ভয়ে পুরোটা সময় পরতেন না। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানোর ঠিক আগ মুহূর্তে গায়ে দিতেন শার্টটা। বাবা জমির আইলের উপর দিয়ে একা একা হেঁটে কয়েক মাইল দূরের একটা স্কুলে যাচ্ছেন এ দৃশ্য আমি চোখ বুঝলেই দেখতে পাই। তখন ওই এলাকায় আর কেউ স্কুলে যেত কিনা সন্দেহ আছে। কারণ বাবা পরবর্তী সময় যাকে বন্ধু হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি পাশের গ্রামের মহিউদ্দিন চাচা (রাশেদা মহিউদ্দিনের বাবা)। বাবাকে যে একটা কাপড় পরেই দিনের পর দিন স্কুলে যেতে হতো তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই।

বাবা যেই বাড়িতে বড় হয়েছিলেন সেই বাড়িটি আমরা দেখিনি; কিন্তু ভিটেমাটি দেখেছি। বাবা চাকরি পাওয়ার পর সেটা ভেঙ্গে একটা টিনের বাড়ি বানানো হয়। সেই বাড়িতে মাটির হাঁড়িতে জিনিসপত্র সিঁকেয় তুলে রাখা হতো। দাদিকে দেখতাম সেই সিঁকে থেকে নামিয়ে আমাদের গুড়-মুড়ি দিতেন। তাহলে বাবার ছোটবেলার বাড়িটি কেমন ছিল? বাবার শৈশব?

বাবা কি স্কুল থেকে এসে জমিতে কাজ করতেন? সন্ধ্যায় গরুগুলোকে ঘরে নিয়ে আসতেন? খড়ে আগুন দিয়ে গরুর ঘরে কি ধোঁয়া তৈরি করতেন? বাবা কি গাভীর দুধ দোয়াতেন? ছাগল চড়াতেন? ছুটির দিনে জমিতে কাজ করতেন? পাশের লাগানো সবজি বাগান থেকে সবজি এনে তার মাকে দিতেন? দুপুরের খাওয়ার জন্য মাটির পাত্র নিয়ে ভাঙ্গা চুলার পাশে বসে থাকতেন, কখন তার মা তার পাতে এক টুকরো মাছ তুলে দেবেন? নাকি কুয়ার পানিতে গোসল করে তার মা উঠানে বসিয়ে নিজের হাতে খাইয়ে দিতেন আমার বাবাকে?

আমার বাবার লেখাপড়ার খরচ আসত কিভাবে? দাদাকে সেটা দিতে হতো নিশ্চয়ই। বই কেনার টাকা- হয়ত কয়েক পয়সা সেই সময়ে। তাতে কি তার অন্য ভাইয়েরা মনে কষ্ট পেতেন? তারা কি তাদের বড় ভাইয়ের এই ‘বিলাসিতা’কে সহজভাবে নিতেন? বাবার কি একটা ঘুড়ি ছিল? বাবা কি সেই ঘুড়ির নাটাই বানানোর জন্য দূর বাজারে চলে যেতেন? আমরা নিজেরাই ওই অজ গ্রামের যে রাস্তা দেখেছি বাবার সময় না জানি কেমন ছিল! শুনেছি অনেক সময় নৌকায় করে স্কুলে দিয়ে আসতেন দাদা।

আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি, আমার বাবার কোন খেলনা ছিল না। অপু-দুর্গার মতো কাশবন পার হয়ে ট্রেন দেখতে যাওয়ার মতো সুযোগ ছিল না। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে স্কুলের পর স্কুল পার করেছেন। তবুও আমি বলতে পারি আমার বাবা যখন কামারের দোকান থেকে একটি চকচকে দা নিয়ে তার বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরতেন তার থেকে আনন্দ আর তিনি কোথাও পেতেন না। নৌকায় করে যখন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতেন, শাপলার পাতা ধরে টানাটানি করে কিংবা ডুব দিয়ে পুরো শাপলা গাছটিকে তুলে আনার আনন্দ থেকে তিনি নিজেকে বঞ্চিত করেননি। নৌকায় বসে মাছ ধরার আনন্দ থেকে বাদ পড়েননি। শীতের রাতে পিঠাপুলি খাওয়ার আনন্দ তাকে যতটা সুখী করেছে পরবর্তীকালে শেরাটনের কেক তাকে সেই আনন্দ দেয়নি। সন্ধ্যায় বাজার থেকে তেল কিনে তার বাবার হাত ধরে ফেরার মুহূর্ত কি তিনি ভুলতে পেরেছিলেন? সেই কেরোসিন তেল দিয়ে নিজের হাতে কুপির আগুন জ্বালিয়ে স্কুলের পড়া শেষ করার আনন্দ কি তিনি টিউবলাইটের আলোতে পেয়েছিলেন? আমার বাবা যখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন তখনও হয়ত সেই ছোটবেলার কথা মনে করে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।

তিন.

আমার জন্ম হয়েছিল ময়মনসিংহ হাসপাতালে। আমার জন্মের সময় মা প্রায় মারাই যাচ্ছিলেন। ডাক্তাররা কিভাবে যেন আমাদের বাঁচিয়ে দেন। আর শৈশব কেটেছে মফস্বলে। সরকারী বিশাল ভবনে আমাদের আবাস। সামনে বিশাল পুকুর, বিশাল মাঠ, অনেক গরু-ছাগল, ধানক্ষেত আর শালিকের সঙ্গে ছুটোছুটি।

আমরাও হেঁটে স্কুলে যেতাম। (আমার পায়ে সেন্ডেল থাকলেও আমার প্রধান শিক্ষকের পায়ে সেন্ডেল থাকত না। তার ফেটে যাওয়া পা আমি এখনও দেখতে পাই।) স্কুল থেকে ফেরার সময় পকেটে গুলতি থাকত। সেই গুলতি দিয়ে শালিক মারতে গিয়ে ঝুলন্ত রসের হাঁড়ি ভেঙ্গে ফেলা, খেজুরের রস খাওয়ার জন্য বন্ধুরা মিলে এক গাছ থেকে আরেক গাছে ছুটে চলা, বর্ষার দিনে নৌকায় চড়ে নদীতে গোসল করতে যাওয়া, দিনের পর দিন সেই নদীতে বড়শি ফেলে বসে থাকা, সাইকেলে করে পুরো শহর ঘুরে বেড়ানো, কোথায় ঘুড়ির সুতার মাঞ্জা দেয়া যাবে সেই কাঁচ যোগাড় করার জন্য মাইলের পর মাইল যাওয়া, পুকুরে গোসল করতে গিয়ে চোখ লাল না হওয়া পর্যন্ত বাসায় না ফেরা, তারপর মায়ের হাতে পিটুনি খাওয়াÑ এই শৈশব কি আমার বাবার ছিল?

তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। আমার জুনিয়র আরিফ একদিন ক্লাসে একটা ছোট যন্ত্র এনে বলল, এটার নাম ক্যালকুলেটর; এটা দিয়ে যোগ-বিয়োগ করা যায়। আমরা সবাই হাসতে হাসতে মারা যাচ্ছি। চাপা মারার আর জায়গা পাও না। সেই ক্যালকুলেটর নিয়ে টানাটানি করতে করতে সেটা ভেঙ্গে ফেলার পর ভয়ে কুঁকড়ে থাকার মধ্যে যে আনন্দ লুকানো ছিল এখনকার আইপ্যাড হাতে আমার মেয়ে কি সেটা বুঝতে পারবে?

মিল্ক ভিটার দুধের প্যাকেটের ভেতর ঘাস ঢুকিয়ে ক্রিকেটের বল বানাতাম আমরা। সেই বল দিয়ে ক্রিকেট খেলার কি যে সুখ! খেলতে গিয়ে একদিন কালির দোয়াত আমার হাত থেকে ছুটে গিয়ে আসিফের কপাল ফেটে গেল। তারপর বাসায় এসে মায়ের হাতে সে কি পিটুনি! বাড়তি শাস্তি হিসেবে সারারাত মেঝেতে বিছানাহীন শুয়ে থাকার পরও কি আসিফের সঙ্গে খেলা বন্ধ হয়েছিল?

ছোটবেলায় আমরা পিকনিক পিকনিক খেলতাম। সবাই নিজের বাসা থেকে চাল, ডাল, সবজি, মসলা নিয়ে আসত। স্কুলের জমানো টাকা দিয়ে কেনা হতো চ্যাগা পাখি। পেয়ারা গাছের নিচে চুলা বানিয়ে সবাই মিলে রান্না করা হতো। মাঝে-মধ্যে পুতুলের বিয়েও চলত। রান্না শেষ হলে পুরো উঠান পরিষ্কার। তারপর পুকুরে গিয়ে গোসল করে সবাই মিলে খাওয়ার যে আনন্দ তা কি আর কখনও পাওয়া যাবে? আমাদের সময় সব জায়গায় বিদ্যুত ছিল না। সন্ধ্যায় হারিকেনের আলোতে পড়তে বসতাম। ইউনিসেফের দেয়া খাতার গন্ধে মন ভরে থাকত।

এখনও মনে আছে সাইকেল চালাতে গিয়ে কতবার পা কেটেছি, আবার উঠেছি, আবার চালাতে শিখেছি। মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে ভ্যানের পেছনে লাগিয়ে দিয়ে প্রায় মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছি, টিয়া পাখি ধরার জন্য লম্বা লম্বা গাছে উঠে কোথায় না হাত ঢুকিয়ে দিয়েছি। এতকিছুর পরও আমার শৈশবের সবচেয়ে প্রিয়বস্তু ছিল বাবার দেয়া প্লাস্টিকের বল। আমরা তখন নরসিংদী থাকি। টিনের ছোট একটা ভাড়া করা বাসা। আমাদের বাসার সামনে মালিকের বাড়ি, আর পেছনে স্বপ্নাদের বাসা। কয়েকটা বাসা মিলে একগুচ্ছ পরিবার। অফিসের কাজে মাঝে-মধ্যে আব্বাকে ঢাকায় আসতে হতো। আব্বা ঢাকায় এলে আমরা এতিমের মতো ঘুমিয়ে যেতাম। কিন্তু সেই ঘুম যখন ভাঙতো তার চেয়ে সুন্দর সকাল আমার জীবনে আর কখনই আসেনি। আব্বা বালিশের নিচে বল রেখে দিতেন। ঘুম থেকে উঠে লাল রঙের সেই বল ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে যখন তা ছিঁড়ে যেত সেই কান্না লুকাবার কোন উপায় ছিল না।

টিভি দেখাটা ছিল আমাদের কাছে সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার। ফরিদপুরে তখন আমাদের ক্যাম্পাসে একটা সাদাকালো টিভি ছিল, যা কিনা বিশাল বাঁশের সঙ্গে লাগানো একটা এন্টেনার ওপর যাবতীয় কেরামতি নির্ভর করত। আমরা বিকেলে সবাই মিলে অফিসের বারান্দায় বসে ঝিরঝির করা টিভিতে টার্জান দেখতাম। আমরা তখন বিশ্বাস করতাম টিভির ভেতর মানুষ থাকে। এমনকি আমাদের ক্যাম্পাসের থানা কৃষি কর্মকর্তার কাছে যে রেডিও থাকত তাকে গিয়ে বলতামÑ আঙ্কেল একটু গান শুনব। তিনি গান ছাড়তেন, আর আমরা চারদিকে খুঁজতাম তিনি কোথায় গায়ককে লুকিয়ে রেখেছেন।

তারপর রেডিও-টিভি দ্রুত ছড়িয়ে গেছে। টিভিতে রঙ এসেছে। তারপর যখন আরেকটু বড় হলাম তখন দেখতাম কেউ কেউ সাইকেলের পেছনে বইয়ের সঙ্গে ভিডিও ক্যাসেট নিয়ে যেত দোকান থেকে। আমাদের ভিসিপি বা ভিসিআর ছিল না। কিন্তু যারা ওগুলো দেখত তারা বখে গেছে বলে আমরা মনে করতাম। মহল্লায় স্যারের কাছে পড়া শেষ করে যারা ভিডিও ক্লাব থেকে ক্যাসেট নিয়ে ফিরত তাদের মতো খারাপ ছেলে আমাদের চোখে আর দ্বিতীয়টি ছিল না।

কিন্তু সেই শৈশবের কথা মনে হলে এখনও নেচে ওঠে মনপ্রাণ। আহ! যদি আবার ফিরে পেতাম সেই দিনগুলো মোর!

চার.

আমার মেয়ের জন্ম হয়েছে আমেরিকার সিলিকন ভ্যালিতে। এই গ্রহের সবচেয়ে ধনী দেশে এবং সবচেয়ে ভাল হাসপাতালে। তাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় আনা হয়েছে চমৎকার গাড়িতে করে। তারপর সে পেয়েছে এই গ্রহের সবচেয়ে বিশুদ্ধ পরিবেশ, যেই বাতাসে পলিউশন নেই বললেই চলে। তাকে খাওয়ানো হয়েছে সবচেয়ে ভাল খাবার, যা আমার সারাজীবনে জোটেনি।

তার জীবন শুরু হয় কিন্ডারগার্টেন দিয়ে। তার চারপাশে সবসময় থাকে হরেক রকমের খেলনা আর দোলনা। বাসার নিচে খেলতে গেলেও কোথাও সামান্য আঘাত লাগল কিনা সেই চিন্তায় মা-বাবা অস্থির। স্কুলে গিয়ে হাতে ময়লা লাগল কিনা তার জন্য রয়েছে বিশেষ টিস্যু পেপার, নয়ত হাত পরিষ্কার করার জেল। সে যখন ঘুমাবে তার পাশে রাখা থাকে বিশেষ নিরাপত্তা এ্যালার্ম। যদি তার ঘুম ভেঙ্গে যায় কিংবা কেঁদে ওঠে, নয়ত কোন অসুবিধা হয়Ñ তা মনিটর করে দূর থেকে। কেউ কেউ বাচ্চাকে ডে-কেয়ারে পাঠায়। সেখানে ক্যামেরা লাগানো। সেই ক্যামেরা আবার তাদের মা-বাবারা অফিসে বসেই এক্সেস করতে পারে। দেখে নিতে পারে তাদের শিশুটি ঠিকমতো আছে কিনা।

আমার মেয়ে স্কুলে যাবে না। মাকে রেখে সে একা থাকতে পারে না। স্কুলে রেখে এলেই সে কী চিৎকার তার। শিক্ষকরা একটুও বিরক্ত হন না। উল্টো আমাদের বুঝায় যে, প্রথম প্রথম বাচ্চারা এমন করতে পারে। তাদের সেপারেশন এ্যাংজাইটি হতে পারে। আমার স্ত্রী স্কুলেই দূরে বসে থাকে।

ধীরে ধীরে সে আরও বড় হয়। মায়ের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলে যেতে পারে। আসার সময় দুজন মিলে ‘পম্পাই’ থেকে ফ্রাইড চিকেন খেয়ে বাসায় ফেরে। মাঝে-মধ্যে বাবার জন্যও নিয়ে আসে। দোকানে নিয়ে গিয়ে যদি জিজ্ঞেস করি এটা লাগবে কিনাÑ সে উত্তর দেয়, দাঁড়াও মাকে জিজ্ঞেস করে দেখি ওটা আমার প্রয়োজন কিনা! লাইব্রেরীতে নিয়ে গেলে আর আসতে চাইবে না। শিশুদের জন্য আলাদা সেকশন। নিজের মতো অজস্র বই নিতে পারে, দেখতে পারে, পড়তে পারে।

কিছুদিন পরই তার হাতে চলে আসে মাউস। বাবার টেবিলে বসে বাবার কম্পিউটার নাড়াচাড়া করা। কিছুদিন পর হাতে পেয়ে যায় আইপ্যাড। বাচ্চাদের কার্টুন দিয়ে শুরু। ইউটিউব শিখতে বেশি সময় লাগল না। ওটার যাবতীয় বাটন বুঝে ফেলেছে। তারপর শুরু হলো অ্যাপ-ডাউনলোড করা। এখন সে আরও বড় হয়েছে। স্কুলের অনেক কিছুই করে ফেলে ইন্টারনেট থেকে।

মেয়েটা বেড়ে উঠছে ওর কাজিনদের সঙ্গে। সেখানে তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্লে-স্টেশন নিয়ে। কে কোন্ গেম খেলবে এবং খেলায় কে কোন্ ক্যারেক্টার নেবে- সেটা নিয়ে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে। একদিন আমার সামনেই ঘটল একটা ঘটনা। ওই বাসার বড় ছেলের নিয়ন্ত্রণে থাকে পিএস-ফোর, যে কিনা এখন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। সে বাসায় এসে দেখে তার পিএস-ফোরে খেলছে তার ছোট ভাই এবং তার আরেক বন্ধু। খেলতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু বিপত্তি বাধল আরেক জায়গায়। ছোট ভাইয়ের বন্ধুটি লগ-আউট না করেই বড় ভাইয়ের এ্যাকাউন্ট দিয়ে একটা বাচ্চাদের গেম খেলে ফেলেছে। এখন সেটা বড় ভাইয়ের এ্যাকাউন্টে দেখাচ্ছে। এটা দেখে তো বড় ভাই রেগে আগুন। আমি গিয়ে তাকে থামাতে পারছি না। সে চিৎকার করে বলেই যাচ্ছেÑ ‘আমার এ্যাকাউন্টটা নষ্ট করে দিল। আমি এতদিন ধরে একটা প্রোফাইল তৈরি করেছি, সেটা এক মুহূর্তে সে নষ্ট করে দিয়েছে। এখন অন্যরা দেখলে কী ভাববে!’

নিজের এ্যাকাউন্টে বাচ্চাদের গেম কেন, এটা তার জীবনের একটা বিশাল সমস্যা। এ সমস্যার সমাধান কী আমি জানি না। বড় ভাই পারলে ছোট ভাইকে খুন করে ফেলে। পরবর্তী সময় যদি এমন খুনের খবর আসে আমি অবাক হব না। সেদিন যে রাগ তার চোখে দেখেছিলাম তা আমাকে ভীত করে বৈকি!

পাঁচ.

আমি তিন সময়ের তিনটা শৈশব ধরার চেষ্টা করেছি। এটাই যে ওই সময়ের একমাত্র শৈশব তা নয়। আমার বাবার সময়ে অন্যের শৈশব যেমন ভিন্ন হবে, তেমনি আমার সহপাঠীদের শৈশবও আমার থেকে ভিন্ন হবে। আমার মেয়ের শৈশব তার সময়ের অন্যদের থেকে আলাদা। কিন্তু চোখ বন্ধ করে একবার ভাবুন তোÑ জামালপুরের ঘোড়াধাপ গ্রাম, তারপর ঢাকা শহর, তারপর সিলিকন ভ্যালিÑ তিনটি ডট! মাত্র তিন জেনারেশনে কত পার্থক্য! কারও শৈশব কি অন্য কারও থেকে কম রঙিন?

আমার বাবার শৈশব কি আমার থেকে খারাপ ছিল? আমার মেয়ের শৈশব কি আমার চেয়ে ভাল? এটা কি আসলেই এভাবে বিচার করা যাবে? কোন্্টা ভাল আর কোন্টা খারাপÑ সেটা কি আপেক্ষিক বিষয় নয়? আমরা যখন ছোটবেলায় টিভি দেখতাম তখন অনেকেই মনে করত আমরা নষ্ট হয়ে গেছি। কিংবা টিভি দেখতে দেখতে আমাদের শৈশব নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা যাদের সাইকেলের পেছনে ভিডিও ক্যাসেট নিয়ে ঘুরতে দেখেছি তাদের ধিক্কার দিয়েছি। বলেছি, এরা মহল্লার নষ্ট ছেলে। আর কোন মেয়ে যদি ভিডিও ক্লাব থেকে ক্যাসেট নিয়েছে তার নামে তো কুৎসা রটানোর শেষ নেই। তারপর যাদের বাসায় ডিশ এন্টেনা ছিল তারা তো আর এই গ্রহের মানুষই ছিল না। তাদের বাচ্চারা তো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

যাদের শৈশবে নৌকায় করে স্কুলে যাওয়া নেই, যাদের শৈশবে সাপের মাথা থেকে মণি ছিনিয়ে আনার গল্প নেই, যাদের শৈশবে বিশাল মাঠে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দ নেই, যাদের শৈশবে সাইকেল চালানোর প্রতিযোগিতা নেইÑ তারা কি জীবনে সফল হন না? নাকি যাদের জীবনে এসব আছে তারাই সফল হন? এমন কোন ড্যাটা দিয়ে এটাকে প্রমাণ করা যাবে? এমন উদাহরণ তো ভূরি ভূরি আছে, ছোটবেলায় ভীষণ দুষ্টু ছিল, লেখাপড়ায় অমনোযোগী ছিল; কিন্তু পরবর্তী সময় খুব ভাল করে গেছে। আবার ঠিক উল্টোটাও তো রয়েছে অনেকÑ ছোটবেলায় খুব ভাল, বড় হয়ে আর সুবিধা করতে পারেনি।

আমরা আসলে চাই প্রত্যেকের শৈশবটা খুব সুন্দর হোক, শিশু-কিশোররা যেন শ্রমিক হয়ে না যায়, কিংবা তাদের শেখার আনন্দটুকু যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। একটি শিশুকে যদি দিনভর পরিশ্রম করে জীবন চালাতে হয়, কোন কারখানায় কিংবা দোকানে কাজ করতে হয়Ñ তখন আর তার শৈশব থাকে না। তাকে তখনি জীবনের চাপটুকু নিতে হচ্ছে। এর বাইরে প্রতিটি শিশুই যদি একটি আনন্দময় শৈশব পায় সেটাই কি সেই শিশুটির জন্য মঙ্গল নয়?

তবে এটা নিশ্চয়ই সবাই স্বীকার করবেন যে, কোনকিছুই অতিরিক্ত খারাপ। সেটা হোক বল নিয়ে সারাদিন বৃষ্টির মধ্যে মাঠে পড়ে থাকা, কিংবা সাইকেলে করে দিনের পর দিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, কিংবা স্কুল ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন নৌকা নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, নয়ত প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইন্টারনেট ব্যবহার করা। আমার বাবাকে যেমন বিদ্যুতের সঙ্গে এ্যাডজাস্ট করতে হয়েছে, আমাকে যেমন টিভি-ভিসিআরের সঙ্গে এ্যাডজাস্ট করতে হয়েছে, তেমনি আমাদের বর্তমান সময়ের শিশু-কিশোরদেরও ইন্টারনেটের সঙ্গে এ্যাডজাস্ট করতে হবে। তাদের এটা নিয়েই বড় হতে হবে। এর থেকে যেটুকু ভাল সেটুকু কেউ গ্রহণ করবে, যেটুকু খারাপ সেটা বেশি নিয়ে ফেললে তাকে ভুগতে হবে। আর এই ব্যালেন্স প্রতিটি মা-বাবা সবসময়ই সবকালেই করে এসেছেন। সেই নিয়ম কিছু ছেলেমেয়ে মেনেছে, কেউ কেউ মানেনি পুরোটা। এটাই জীবন। জীবন কম্পিউটারে প্রোগ্রাম করে দেয়া কোন সফটওয়্যার নয় যে, প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত একইভাবে চলবে। জীবনে উত্থান থাকবে, পতন থাকবে, হাসি থাকবে, কান্না থাকবে, ভালবাসা থাকবে, ঘৃণাও থাকবে। এর সবকিছু নিয়েই একটা মানুষ ছোটবেলা থেকে বড় হয়, তারপর এই গ্রহ ছেড়ে চলে যায়। এটা নিয়ে এত চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। আপনি আপনার সন্তানকে ইন্টারনেট না দিলে সে বরং পিছিয়ে পড়বে। সে অনেক কিছু বুঝতে পারবে না, যা তার ক্লাসের অন্যরা পারবে। একটি উন্নত দেশের শিশুর যে দক্ষতা থাকে, জ্ঞানের পরিধি থাকে, আপনার শিশুর তা থাকবে না। ভবিষ্যতের প্রতিটি শিশুই কোন দেশের শিশু নয়, পৃথিবী নামক এই গ্রহের শিশু। তার পরিচর্যা করুন।

আমি আমার বাচ্চাদের একটা কথা বলি। সেটা এখানে লিখে দিচ্ছিÑ আমাদের চোখ দুটো সামনে বসানো, পেছনে নয়। লুক ফরওয়ার্ড এ্যান্ড মুভ অন!

৩০ অক্টোবর ২০১৫

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সম্পাদক, প্রিয়.কম

ুং@ঢ়ৎরুড়.পড়স