২০ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

গাঁওত এখন সলক... আইস্যে গেল ভোটের হাওয়া


সমুদ্র হক ॥ এবারের শীত মৌসুমে ঘন কুয়াশা ও শিশিরের সঙ্গে হিমাঙ্ক যত নিচেই নামুক উষ্ণতার তাপাঙ্ক যে ওপরের দিকেই উঠে মিলনমেলা বসবে সেই বাদ্য বেজে উঠেছে। ইলেকশন মানেই মেলার মতো উৎসবের আমেজ। সেই ভোট যদি হয় একেবারে মাঠ পর্যায়ে তাহলে তো কোন কথাই নেই। শীতে জবুথবু কাহিল হওয়া মানুষও উষ্ণতার শক্তি খুঁজে পায়। গ্রামজুড়ে হাজরো মানুষের শোরগোল ‘ভোট চাই ভোট চাই ভোট চাই ভাই ভোট দিলে যাহা চাবে তাহা পাবে ভাই...’ এমন শব্দ ধ্বনিকে চাপা দিতে পারে না। দুয়ারে টোকা দিয়েছে স্থানীয় সরকার পর্যায়ের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন। এর আগে অবশ্য পৌর নির্বাচনও দোরগোড়ায়। বর্তমানে দেশের প্রায় সকল উপজেলা পৌর এলাকায় পরিণত হওয়ায় এই নির্বাচনেও অনেক গ্রাম অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই হিসেবে আশপাশের গ্রামগুলোতেও নির্বাচনী আমেজ পড়েই যায়। হেমন্তের এই সময়টায় গ্রামের পথে পা বাড়ালে মনে হবে গেরস্ত বাড়ির বহির্আঙিনায় (স্থানীয় কথায় খুলি) বোরো আবাদ নিয়ে যতটা না ভাবনা তার চেয়ে ঢের বেশি আলোচনা আগামীতে কে হতে যাচ্ছেন ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার। বর্তমানের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের গত ক’বছরের কার্যক্রমের চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। গ্রামের পরিচিত মুখের প্রবীণরা তো বলতে শুরু করেছেন ‘ওদের আমলনামা’ এখন পাবলিকের হাতে। দেখা যাবে সামনের দিনে। এই অবস্থায় কায়দা ও বেকায়দা উভয় অবস্থানে আছেন বর্তমানের পরিষদের সদস্যরা।

গ্রামে ভোট মানেই কিছুদিনের জন্য মধুর দিনের শুরু। নির্বাচনের আগের কয়েক মাস বলতে গেলে নির্বাচনী মেলা বসে গ্রামের প্রতিটি ঘরে, পথে প্রান্তরে ও হাটেবাজারে। চা বিস্কুট পানসুপারি তো নির্বাচনের অন্যতম অনুষজ্ঞ। বর্তমানে এর সঙ্গে পেঁয়াজু, ফুচকা, ডালপুরি, হালিম, চটপটি শহুরে এই খাবারগুলো গ্রামে পৌঁছেছে বিজলীর আলোয় গ্রামগুলোতে এখন আর সন্ধে বেলায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যায় না। চোখে পড়ে না জোনাকির আলো। পেঁচাও প্রহরের ডাক দিতে ভুল করে। গ্রামের কুটিরগুলোতেও আধুনিকতার প্রলেপ পড়েছে। উঠানের সামনে দিয়ে শর্টকাটে এ বাড়ি ওবাড়ি যাওয়ার সময় ঘরের ভেতর থেকে টেলিভিশন অনুষ্ঠানের ও কোন সিরিয়ালের শব্দ ভেসে আসে। গ্রামের মানুষের আলাপচারিতারও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে তবে শিকড়ের সেই আঞ্চলিক মধুময় কথার রেশ এখনও রয়ে গেছে। বগুড়ার সোনাতলা এলাকার রানীরপাড়া গ্রামের সোলায়মান বললেন ‘গাঁওত এখন কি সলক (আলোকিত)। এরই মধ্যে ভোটও আস্য গেল। কত রঙের মানুষ যে কত নাটক শুরু করবি! টেলিভিশনের ওগলে (ওইসব) সিরিয়াল কুলাবি না।’

সামনের দিনগুলোতে যে গ্রামের আতিথেয়তার চিত্র পাল্টে যাবে সেই আলামতও এখন দৃশ্যমান। মঞ্চ নাটকের অডিশন ও রিহার্সালের মতো ভোটের অডিশন ও রিহার্সালও শুরু হয়ে গেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা যাচাই করে নিচ্ছেন তাদের অবস্থান। বর্তমানে যারা আছেন তারাও খোঁজখবর করে জানার চেষ্টা করছেন দলীয় মনোনয়নে তারা কতটা টিকতে পারবেন। বড় কথা এবারের নির্বাচন দলীয় মনোনয়ন ও দলীয় প্রতীকেই হতে যাচ্ছে, যা হবে দেশে প্রথম। এর আগে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো দলীয় প্রতীকে ও দলীয় মনোনয়নে হয়নি। তবে পরোক্ষভাবে প্রার্থীদের দলীয় পরিচয় ছিল। এবার একেবারে সরাসরি মাঠে নামতে যাচ্ছেন তারা। এ নিয়েও মাঠ পর্যায়ে নানা গুঞ্জন উঠেছে। নির্বাচনে অংশ নেয়ার ইচ্ছে আছে দলীয় মনোনয়ন না পেলে কী করবেন এ নিয়েও চলছে জোর জল্পনা-কল্পনা। বলাবলি হচ্ছে দলীয় মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার।

উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে এটুকু অন্তত বোঝা গেছে, সকলেই উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনের অপেক্ষায় আছে। এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে একই কথা নির্বাচনে কে দাঁড়াচ্ছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখনই গ্রামের পথে ঘুরছেন। এই সময়টায় ফসলের মাঠে কৃষকদের দেখে দু’দ- কথা বলছেন খোঁজখবর নিচ্ছেন।

সাধারণত শীতের সময়টাকেই নির্বাচনের আয়োজন হয়ে থাকে। এবারও তাই হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন মাঠ পর্যায়ে যে উৎসবের আমেজ এনে দেয় এবারও তারচেয়ে বেশি আমেজ সৃষ্টি হবে এই কারণে যে, এই সময়টাতেই গ্রামে বাঙালী সংস্কৃতির শিকড়ের মেলা বসে। ভোটের মেলা আর সংস্কৃতির মেলা যোগ হয়ে নতুন উৎসবে মেতে উঠবে গ্রাম। শীতের মিষ্টি রোদের সকালের সঙ্গে রাতের শীতের হিমেল হাওয়াও ভোটের হাওয়ার উষ্ণতা এনে দেবে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: