১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

০বাংলাদেশের পাটপণ্যে ভারতের এ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক


এম শাহজাহান ॥ বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য আমদানিতে এ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ করতে পারে ভারত। ইতোমধ্যে পাটপণ্যে ভর্তুকির মাধ্যমে এ্যান্টি-ডাম্পিং করা হচ্ছে- এ অভিযোগ তুলেছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ আমলে নিয়ে ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি তদন্ত করছে। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ডাম্পিংয়ের সত্যতা পেয়েছে ভারত সরকার। তবে এ বিষয়ে আরও তদন্ত করে পাটপণ্য আমদানিতে এ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ করা হতে পারে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, পাটপণ্য রফতানিতে কোন ধরনের ডাম্পিং হচ্ছে না। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। আর এর সুফল পাচ্ছেন পাটচাষীরা। তাই পাটপণ্য রফতানি ও ভারতের তদন্তের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

এদিকে দেশে কৃষিতে ভর্তুকি নতুন নয়। কৃষি উৎপাদন বাড়তে সামগ্রিক কৃষি খাতে প্রতিবছর ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। এর সুফল পাটচাষীরা পেয়ে থাকেন। প্রতিটি বাজেটেও এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার। এককভাবে কোন পণ্য উৎপাদন বা শিল্পে নগদ সহায়তা নেই। এ্যান্টি-ডাম্পিং আরোপ করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পাটশিল্প। পাটের সবচেয়ে বড় বাজার হারাতে পারে বাংলাদেশ। তাই শীঘ্রই বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও পাটপণ্য রফতানি বিষয়ে বৈঠক করা হবে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রফতানি) মোঃ শওকত আলী ওয়ারেছী জনকণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য রফতানিতে ডাম্পিং হচ্ছেÑ এ ধরনের একটি অভিযোগ রয়েছে ভারতের পাট ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইন্ডিয়ান জুট মিলস এ্যাসোসিয়েশনের (আইজেএমএ)। সংগঠনটির অভিযোগ আমলে নিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে এর সত্যতাও পেয়েছে ভারত। তাই পাটপণ্য আমদানিতে ভারত এ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ করতে পারে। এটি হলে বাংলাদেশের পাটশিল্পে নতুন সঙ্কট তৈরি হতে পারে। রফতানি বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, পাটপণ্য রফতানিতে এখানে কোন ডাম্পিং হচ্ছে না।

সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সরকার বাজেটে ভর্তুকি দিচ্ছে। পাট উৎপাদনে ভর্তুকির কিছুটা সুফল হয়ত রয়েছে কিন্তু তা অভিযোগ করার মতো নয়। সারাবিশ্বেই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারী সহযোগিতা থাকে। তিনি বলেন, ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগের ভিত্তিতে ওই দেশের সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকেও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে শীঘ্রই ভারতীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করব। এরপরও সমস্যার সমাধান না হলে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা হতে পারে।

এদিকে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাংলাদেশ পাটপণ্য রফতানিতে নগদ অর্থসহায়তা দিচ্ছে সরকার। এ কারণে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা ভর্তুকি মূল্যে ভারতে পাট রফতানি করছেন। ফলে বাংলাদেশ থেকে আমদানিও অনেক বেড়েছে। এর প্রভাবে স্থানীয় শিল্প-সংশ্লিষ্টরা ব্যবসার লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাচ্ছেন না। এ কারণে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এ্যান্টি-ডাম্পিং আরোপ করা প্রয়োজন। সম্প্রতি ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে তাদের সরকারের সঙ্গেও আলোচনা করেছে।

তবে রফতানিকারকদের নগদ অর্থসহায়তার মাধ্যমে এ্যান্টি-ডাম্পিং হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের এক উর্ধতন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, সরকার পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানিকারকদের নগদ সহায়তা দিচ্ছে সত্য, তবে তা দেয়া হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকে। এতে মূল্য নির্ধারণে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি সহজ নয়। কাজেই এখানে এ্যান্টি-ডাম্পিং কেস ফাইলিং গ্রহণযোগ্য নয়।

জানা গেছে, পাটপণ্য রফতানিতে বাংলাদেশের বড় বাজার ভারত। দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে পাট রফতানি করে আসছেন এখানকার রফতানিকারকরা। আর ভোক্তাদের মধ্যে চাহিদা থাকার কারণেই বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পাট আমদানি করে ভারত। আইজেএমএ’র দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি ভারতীয় অর্থবছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট দেশটিতে পাটের সুতা আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। পাটের থলে আমদানি বেড়েছে ২৮ এবং পাটের কাপড়সহ অন্যান্য পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৭ শতাংশ।

এছাড়া চলতি বছর এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ভারতের রফতানি পরিমাণ কমেছে ১১ শতাংশ। সংগঠনটির দাবিÑ বাংলাদেশ থেকে আমদানি বৃদ্ধিই সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রফতানি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার সবধরনের পাটজাত পণ্য রফতানির বিপরীতে ১০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে আর্থিক সহায়তাও পান বাংলাদেশের জুট মিলের মালিকরা।

চীনের সহায়তায় ২৩টি রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিল আধুনিকায়নের পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। এসব কারণেই সক্ষমতা নিয়ে সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন ভারতের ব্যবসায়ীরা। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ভারতে ৪ কোটি ৭২ লাখ ৩৪ হাজার ৯১২ ডলারের পাটপণ্য রফতানি হয়েছে। আর গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ভারতে পাটজাত পণ্যের রফতানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী প্রতি মাসে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার পাটপণ্য রফতানি হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৫ দেশের বাইরেও দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলয়ায় এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। তবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে বেশি রফতানি হয় বস্তা। গত বছর যত বস্তা রফতানি হয়েছে, তার ২৪ শতাংশই গেছে ভারতে। এ কারণে এ্যান্টি-ডাম্পিং আরোপ করা হলে বাংলাদেশের পাটপণ্য রফতানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।