২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সীমিত ব্যবসায়ের সুযোগ


দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় নাম লেখানো হয়েছে। এখন স্বপ্ন উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছানো। এমন অবস্থায় সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘ডুয়িং বিজনেস ২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ব্যবসায়ের পরিবেশের যে নাজুক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা শঙ্কার। সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দুর্নীতির কারণে ব্যবসায় পরিবেশে প্রচ- বৈরিতা দৃশ্যমান। এ কারণে, ব্যবসায় পরিবেশ সূচকে এদেশের অবস্থান ১৮৯টি দেশের মধ্যে ১৭৪তম। বিগত কয়েক বছর ধরেই এদেশের অবস্থান খারাপের দিকে। সাত বছর আগে ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১৫তম। এখন ১৭৪। এমনকি গত বছরও এদেশের অবস্থান ছিল ১৭২তম। উন্নত বিশ্বের কাতারে ওঠার স্বপ্নে বিভোর কোন দেশের জন্য ব্যবসায় পরিবেশ সূচকের এই ক্রমাবনতি অত্যন্ত লজ্জার এবং আশঙ্কার।

ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন তৈরিতে ব্যবসায় পরিবেশকে দশটি উপসূচকে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো যথাক্রমে ব্যবসায় শুরু, অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি, বিদ্যুতের প্রাপ্যতা, সম্পত্তি নিবন্ধন, ঋণ প্রাপ্যতা, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, কর পরিশোধ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তির বাস্তবায়ন ও অসচ্ছলতা দূরীকরণ। এই সূচকগুলোর কোনটিতেই উন্নতি করতে পারেনি বাংলাদেশে। এর মধ্যে বিদ্যুত সংযোগ, অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তির বাস্তবায়ন এবং অসচ্ছলতা দূরীকরণ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান গত বছর যা ছিল তাই আছে। বাকি পাঁচটি সূচকে অবস্থান আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।

এদেশে ব্যবসায় শুরু করতে গেলে উদ্যোক্তাদের বেজায় হাঙ্গামা পোহাতে হয়। ব্যবসায় শুরু করতে হলে সর্বাগ্রে নয়টি আনুষঙ্গিকতা শেষ করতে হবে। এতে সময় লেগে যায় ১৯ থেকে ২০ দিন। প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত নাম যাচাই-বাছাই, নাম নিবন্ধন, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স নিতে এ সময় লেগে যায়। এতে ব্যয় হয় গড়ে সাড়ে বারো হাজার টাকা। এ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১০০ তে ৮১ দশমিক ৭২ এবং অবস্থান ১১৭তম।

সম্পত্তি বিশেষ করে জমির নিবন্ধন প্রক্রিয়া এদেশে অত্যন্ত জটিল। দলিলাদি যাচাই-বাছাই করে নিবন্ধন পর্যন্ত প্রায় ২৪৪ দিন সময় লেগে যায়। আটটি ধাপ অতিক্রম করার পরই একজন ব্যবসায়ী সম্পত্তি নিবন্ধন করতে সক্ষম হন। এবং এতে সম্পত্তির মূল্যের সাত শতাংশ সমপরিমাণ টাকা ব্যয় করতে হয় চার্জ বাবদ। এছাড়াও গড়ে অতিরিক্ত আটাশ হাজার টাকার মতো ব্যয় করতে হয়। এ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১০০ তে ২৭ দশমিক ৪৮ এবং অবস্থান ১৮৫তম।

ব্যবসায়ের জন্য অনুমতি, সম্পত্তি নিবন্ধন ছাড়াও কারখানা ভবন, পয়োনিষ্কাশন সংযোগ, পানি ও গ্যাসসংযোগসহ নানা ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করতে হয়। কিন্তু নির্মাণের অনুমতি পেতেই এদেশে গড়ে ২৬৯ দিন সময় লেগে যায়। শুধু কী তাই, অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি পাওয়ার জন্য ধরনা দিতে হয় তেরো ঘাটে। এতে গড়ে সাড়ে ছিয়াত্তর হাজার টাকার মতো ব্যয় করতে হয় ব্যবসায়ীদের। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর ১০০ তে ৬৫ দশমিক ২৭ এবং অবস্থান ১১৮তম।

ব্যবসায় স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো বিদ্যুত সংযোগ। এদেশে বিদ্যুত সংযোগ পেতে সময় লাগে ৪২৯ দিন। পেরোতে হয় নয়টি ধাপ। এর মধ্যে বিদ্যুত সংযোগের আবেদন করার পর ডিমান্ড নোটের জন্য অপেক্ষা করতে হয় গড়ে ২৭৭ দিন। বিদ্যুত সংযোগ পেতে গড়ে ব্যয় করতে হয় প্রায় ঊনত্রিশ লাখ ঊনত্রিশ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর ১০০ তে মাত্র ১৫ দশমিক ৩১ এবং অবস্থান ১৮৯তম। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি বাংলাদেশের।

ব্যবসায়কে গতিশীল করতে ব্যবসায়ীদের ঋণের প্রয়োজন হয়। ঋণ প্রাপ্তিতে এদেশের ব্যবসায়ীদের নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা সঠিক তথ্যের অভাব। এদেশে ৩ লাখ ২৮ হাজার ২৭০টি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করার জন্য ঋণ নিয়েছে। আর ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৫৩১ জন ব্যক্তি ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছেন। ঋণ প্রক্রিয়ায় দাতা ও গ্রহীতার আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার ভিত্তি শক্তিশালী। কিন্তু ঋণের জন্য পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব ও জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে এর স্কোর ১০০ তে ৩০ এবং অবস্থান ১১৩তম।

চুক্তি বাস্তবায়ন সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২২ দশমিক ২১ এবং অবস্থান ১৮৮তম। চুক্তি বাস্তবায়নে প্রায় চার বছর সময় দেয়া হলেও পাওনা টাকার এক-তৃতীয়াংশ আদায় করা যায় না। বহির্বাণিজ্য সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭২তম এবং স্কোর ৩৪ দশমিক ৮৬। আমদানির ক্ষেত্রে বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে গন্তব্যে পণ্য পৌঁছাতে সময় লাগে গড়ে সাড়ে ১৪ দিন এবং রফতানি পণ্যের ক্ষেত্রে কারখানা থেকে বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে লাগে ১১ দিন। আবার দেখা যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হলে বিপাকে পড়তে হয় ব্যবসায়ীদের। বিরোধ নিয়ে মামলা হলে তা নিষ্পত্তি হতে গড়ে ৩ বছর ১১ মাস ১২ দিন সময় লাগে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৮তম। আর্থিক অসচ্ছলতা দূরীকরণ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৫তম। দেউলিয়া দশার সমাধানে মাত্র চার বছর সময় দেয়া হয়, যা নতুন বিনিয়োগকারীর জন্য খুবই কম। এক্ষেত্রে ১০০তে স্কোর ২৬ দশমিক ৩৬। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় কিছুটা ভাল অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। একই ব্যবসায় ছোট ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। তবে সব সূচকের মধ্যে কর পরিশোধ সূচকেই এদেশ ভাল অবস্থানে আছে। এ সূচকে এদেশের অবস্থান ৮৬তম।

বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী। উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখা কোন দেশের ক্ষেত্রে এটা আরও ভীষণ রকম সত্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এদেশে এখনও কার্যকর বাণিজ্য পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। বরং দিনকে দিন ব্যবসায় পরিবেশে পিছিয়ে পড়ছে। মূল কারণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, ঘুষ ও দুর্নীতি। প্রতি ঘাটে ঘাটে পয়সা দিতে হয়। না দিলে, ফাইল মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর টেবিলে পড়ে থাকে। নানাভাবে হেনস্থার শিকার হন ব্যবসায়ীরা। এতে দিনকে দিন ব্যবসায়-বাণিজ্য হয়ে পড়ছে গতিহীন। রফতানি বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে ধসই এর প্রমাণ। সরকার ব্যবসায় পরিবেশের উন্নয়নে নানারকম পদক্ষেপ নিয়েছে কিন্তু যতদিন পর্যন্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ঘুষ ও দুর্নীতিকে সমূলে উৎপাটন করা না যাবে, ততদিন ব্যবসায় পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে না। এজন্য চাই সরকারের কঠোর নজরদারি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ।