১৩ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

নিত্যপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে টিসিবি শক্তিশালী করা হচ্ছে


এম শাহজাহান ॥ নিত্যপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবিকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। সিন্ডিকেট চক্রের মনোপলী ব্যবসা রুখে দিতে বাড়ানো হবে টিসিবির সক্ষমতা। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে পাঁচ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। এছাড়া টিসিবি শক্তিশালী করতে প্রধান সমস্যাগুলোও চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটির কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে টিসিবির কর্পোরেট কর ও ন্যূনতম কর প্রদানের বাধ্যবাধকতা হতে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভর্তুকির পরিমাণ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে টিসিবিকে ২০০ কোটি টাকার সুদমুক্ত চলতি মূলধন প্রদানের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পুনরায় চালু করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। দশম জাতীয় সংসদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ১৪তম বৈঠকে টিসিবিকে শক্তিশালী করতে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টিসিবি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য প্রথমেই টিসিবির ২২৫ জনবল কাঠামোকে ২৭৫ জনে উন্নীত করা হয়েছে। মজুদ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে নিজস্ব ও ভাড়াসহ প্রয়োজনীয় গুদামের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংস্থাটির ডিলার সংখ্যা ১৪০ থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ১৫ জনে উন্নীত করা হয়েছে। টিসিবি আইন পিও-৬৮ যুগোপযোগী করতে সংশোধন করা হয়েছে। এছাড়া ক্রয়সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকারীভাবে অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক কাউন্টার গ্যারান্টি চাওয়া হয়েছে। যার বিপরীতে ব্যাংক হতে ১১-১৬ শতাংশ সুদে এলটিআর গ্রহণ করা হয়। এছাড়া টিসিবি শক্তিশালী করতে স্থায়ী কমিটির দৃষ্টিতে যেসব সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে তা হলোÑ চলতি মূলধন হিসেবে এককালীন অর্থ বরাদ্দ না থাকায় ব্যাংক থেকে ১১-১৬ শতাংশ হার সুদে এলটিআর গ্রহণ করা হয়। ফলে পণ্যের ক্রয়মূল্য বেশি পড়ে। এক্ষেত্রে ২০০ কোটি টাকার সুদমুক্ত স্থায়ী তহবিল প্রদানের লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে দুইবার অনুরোধ করা হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক তা প্রদানের জন্য অপারগতা প্রকাশ করা হয়।

পুনরায় চলতি বছরের গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০০ কোটি টাকার তহবিল চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে। তাছাড়া এলটিআরের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাউন্টার গ্যারান্টি পেতে এক থেকে দুই মাস, কোন কোন ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় লেগে যায়। এতে ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিলম্ব হয়। এছাড়া পিপিআর পদ্ধতি অনুসরণ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যক্রয়ের ক্ষেত্রে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে। ফলে সময়মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহও সরবরাহ কষ্টসাধ্য হয়। এছাড়া ওই সময়ের মধ্যে পণ্যের দাম উঠা-নামা করে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে ১৯৯৩ ও ২০০২ সালে দুই দফা গোল্ডেন হ্যান্ডসেকের মাধ্যমে টিসিবির জনবল ১ হাজার ৩৩৬ হতে হ্রাস করে ২২৫ এ অবনমিত করা হয়। এছাড়া ১৯৯৬ সালের পর হতে দীর্ঘদিন কোন নিয়োগ কার্যক্রম ছিল না। ফলে টিসিবিতে দক্ষ জনবলের অভাব দেখা দেয়।

এছাড়াও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেশে-বিদেশে না থাকার দরুণ বিদ্যমান জনবলের দক্ষতা তেমন বিকশিত হয়নি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে নিজস্ব গুদামসমূহের অবস্থা নাজুক সৃষ্টি হয়েছে। টিসিবির নিজস্ব গুদামসমূহ তৎকালীন সময়ে সিমেন্ট, লবণ ও ওষুধ প্রভৃতি জাতীয় পণ্য রাখার নিমিত্তে তৈরি করা হয়েছিল। তাই গুদামগুলো তেল, চিনি ও ডাল রাখার জন্য তেমন উপযুক্ত নয়। এছাড়াও যে সমস্ত গুদাম ভাড়া পাওয়া যায়, তা টিসিবির পণ্য রাখার জন্য উপযোগী নয়। এ বাস্তবতায় টিসিবির নিজস্ব জমিতে সরকারী অর্থায়নে গুদাম তৈরি একান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে।

এদিকে জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় বর্তমানে টিসিবি ক্রয়মূল্যের চেয়ে কমমূল্যে পণ্য বিক্রয় করছে। অর্থাৎ সরকার থেকে ভর্তুকি নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। টিসিবির ব্যবসায়িক ক্ষতি ভর্তুকি দ্বারা সমন্বয় হলেও সংস্থার অন্যান্য খরচ যেমন- কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য প্রশাসনিক খরচ টিসিবির নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থাৎ অন্যান্য আয় হতে করতে হচ্ছে। টিসিবির অন্যান্য আয়ের প্রধান খাত হলো টিসিবির নিজস্ব বিল্ডিং ভাড়া এবং ব্যাংকে রক্ষিত আমানতের সুদ। সংস্থার নীট আয়ের ওপর ৩৫ শতাংশ হারে কর্পোরেট ট্যাক্স প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকায় এবং পণ্য বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থের সমষ্টির ওপর দশমিক ৩০ হারে ন্যূনতম কর প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এতে চাপে রয়েছে সংস্থাটি। এসব সমস্যা সমাধানে কমিটি যেসব সুপারিশ করছে তা হলো-কর্পোরেট কর ও ন্যূনতম কর প্রদানের বাধ্যবাধকতা হতে টিসিবিকে অব্যাহতি দেয়া। আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভর্তুকির পরিমাণ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে টিসিবিকে ২০০ কোটি টাকার সুদমুক্ত চলতি মূলধন প্রদানের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পুনরায় গ্রহণ, নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে আপদকালীন মজুদ শেষ করার লক্ষ্যে মিলিটারি ও মিলিটারি ফোর্স যেমন- বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি, বর্ডার গার্ড, সিভিল ডিফেন্স ও জেলখানা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে থাকেন তাদের মধ্যে মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্দিষ্ট ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রির জন্য কার্যক্রম গ্রহণ।

জানা গেছে, বাজারে প্রভাব বিস্তার করতে হলে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ পণ্যের মজুদ থাকতে হয়। এটিই প্রচলিত ধারণা। টিসিবি কয়েকটি পণ্যের ২৫ শতাংশ মজুদ রাখতে চায়। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকারভুক্ত পাঁচ বিষয়ের মধ্যে এক নম্বরটাই হলো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ। ইশতেহারে বলা হয়েছেÑ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করা হবে এবং সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য সৃষ্টি করা হবে। এজন্য টিসিবিকে শক্তিশালী করতে স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী দুই ধরনের পরিকল্পনাই রয়েছে।