১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

পথে পথে দিলাম ছড়াইয়ারে সে চোখেরও পানি...


পথে পথে দিলাম ছড়াইয়ারে সে চোখেরও পানি...

মোরসালিন মিজান

অদ্ভুত আঁধার আর বলা যাবে না। নিকষ কালোয় ডুবছে বাংলাদেশ। সোনার বাংলা কপচানো যায়। প্রতিনিয়ত কপচানো হচ্ছে। আদতে মৌলবাদী জঙ্গীদের এটি স্বর্গরাজ্য। এই রাজ্যে মুক্ত চিন্তার কোন সুযোগ নেই। একেবারে নির্দোষ বিনয়ী মানুষটিকে কুপিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। এই যখন বাস্তবতা তখন শনিবার স্মরণ করা হলো কলিম শরাফীকে। মৌলবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে সারা জীবন সংগ্রাম করা মানুষটি আবারও সামনে আসলেন। কথা ও গানের ভাষায় শ্রদ্ধা জানানো হলো বাঙালীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রামের পুরোধা ব্যক্তিত্বকে। পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা।

সম্মেলক কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। একঝাঁক শিল্পী গেয়ে যানÑ আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।/ এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে/... আঁধারের গায়ে গায়ে পরশ তব/সারা রাত ফোটাক তারা নব নব।/নয়নের দৃষ্টি হতে ঘুচবে কালো,/যেখানে পড়বে সেথায় দেখবে আলো ...। দ্বিতীয় সম্মেলক গানটিÑ সমুখে শান্তিপারাবারÑ/ ভাসাও তরণী হে কর্ণধার।/ তুমি হবে চিরসাথি, লও লও হে ক্রোড় পাতিÑ/ অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি ধ্রুবতারকার...। সম্মেলক শেষে শুরু হয় একক পরিবেশনা। কবিগুরুর গানে গানে শিল্পীরা শ্রদ্ধা জানান কলিম শরাফীকে। তপন মাহমুদ, সাজেদ আকবরের মতো সিনিয়রা যেমন গেয়েছেন, তেমনি গেয়েছেন অনিমা রায়ের মতো নবীনরা।

সঙ্গীতে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি ছিল আলোচনা। এদিন কলিম শরাফীর স্মৃতিচারণ করেন তাঁর ঘনিষ্ট সুহৃদ কামাল লোহানী ও সৈয়দ হাসান ইমাম। সংস্থার সভাপতি সঙ্গীত শিল্পী তপন মাহমুদের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক সাজেদ আকবর। বক্তারা বলেন, কলিম শরাফী এক ধ্রুবতারার নাম। যে কোন সামাজিক সাংস্কৃতিক দুর্যোগের সময় তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পথ দেখিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেছেন অহর্নিশ। এর পর বিষন্ন দেখায়, বিপন্ন দেখায় বক্তাদের কারও কারও মুখ। শনিবারের মৌলবাদী আক্রমণের ঘটনার কথা উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, এই দেশ এখন মৃত্যুপুরী। স্বাভাবিক চিন্তা খুন হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার তখন চোখের সামনে পরাজিত হচ্ছে বাংলাদেশ। এ পরাজয় মেনে নেয়া যায় না। এমন দুর্দিনে কলিম শরাফীর মতো দীপশিখার বড় প্রয়োজন ছিল জানিয়ে তারা বলেন, এখন নির্মম নিষ্ঠুর অন্ধদের সমাজ। এ থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে হলে কলিম শরাফীর মতো মানুষদের দেখানো পথে সাহসের সঙ্গে এগোতে হবে।

অনুষ্ঠানে গান আলোচনা ছাড়াও কলিম শরাফীর উপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। সেখানে তাঁর জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। এই বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে ভেসে আসছিল কলিম শরাফীর সেই চিরচেনা ভরাট কণ্ঠÑ পথে পথে দিলাম ছড়াইয়ারে/ সেই দুঃখে চোখেরও পানি/ ও আমার চক্ষু নাই/ পাড় নাই কিনার নাই রে/ ও আমার চক্ষু নাই...। গানটি শুনতে শুনতে কখন যেন ভিজে ওঠে চোখ। আসলেই তো চক্ষু নেই। আজকের এই বেঁচে থাকা তো চোখের পানিতেই শুধু!