মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৪ আশ্বিন ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

সুপ্রীমকোর্ট খোলার পর দিনই সারাদেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে

প্রকাশিত : ১ নভেম্বর ২০১৫
  • সাকা, মুজাহিদের রিভিউ এবং নিজামীর আপীলের শুনানি হবে

বিকাশ দত্ত ॥ দীর্ঘ ৪৪ দিন ছুটির পর আজ সুপ্রীমকোর্ট খুলছে। আদালত খোলার পর নবেম্বর মাস জুড়ে থাকবে সর গরম। এর মধ্যে ২ নবেম্বর মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের আপীল বিভাগের মৃত্যুদ-ের বিরুদ্ধে রিভিউয়ের শুনানি ২ নবেম্বর সোমবার আর জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর আপীল শুনানি ৩ নবেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে। এদিকে মুজাহিদ ও সাকার মৃত্যুদ- ঠেকাতে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, আল জাজিরাসহ ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ইন্টারন্যাশনাল জুরিস্ট ইউনিয়ন, টবি ক্যাডম্যানরা তোড়জোড় শুরু করেছে। শত কোটি টাকার বিনিময়ে লবিস্ট নিয়োগ করা হয়েছে। বিএনপি এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লবি ফার্ম একিন গাম্পের ভেতর একটি চুক্তি হয়েছে। বিএনপি ইতোমধ্যেই রিটেইনার ফি হিসেবে ১,২০,০০০ মার্কিন ডলার একিন গাম্পকে প্রদান করেছে। দেশের আইনবিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের কথা, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তাদেরই বিচার হচ্ছে। এখানে কে কি রাজনীতি করছে তা মুখ্য নয়। যারা অপরাধীদের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছে তারা অর্থের বিনিময়ে কথাগুলো বলছে। এরা নব্য রাজাকার। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কথা বলছে।

মানবতাবরিাধী অপরাধের বিচার হচ্ছে দেশের নিজস্ব আইনে। এই সংগঠনগুলো মৃত্যুদ- স্থগিত করার আহ্বান জানালেও খোদ আমেরিকাসহ বিশ্বের ৫৫ দেশে এখনও মৃত্যুদ- কার্যকরের বিধান রয়েছে। ১৯৭৬ সাল থেকে চলতি বছরের নবেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ১৪১৬ জনের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে, যার মধ্যে ২০১৫ সালে কার্যকর করা হয়েছে ১২টি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে এ সকল অপরাধীকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- দেয়া হচ্ছে। কোনভাবেই একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার সিদ্ধান্তকে কার্যকর না করার আহ্বান আইনসিদ্ধ নয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শুধু জামায়াতে ইসলামী নেতাদেরই বিচার করে মৃত্যুদ- দেয়া হয়নি। এর বাইরে জাতীয় পার্টি, বিএনপি, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম ও আওয়ামী লীগের নেতৃতবৃন্দও রয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ জনকণ্ঠকে বলেছেন, আমরা আন্তর্জাতিক মানের অনেক উপরে উঠে এ বিচার কাজ সম্পন্ন করছি। অভিযুক্তদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছি। কাউকে কাউকে জামিনও দেয়া হয়েছে। এছাড়া তারা সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ পেয়েছে। পৃথিবীর আর কোন আদালতে এমন সুযোগ দেয়া হয়নি। অথচ এ বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আর এ ষড়যন্ত্র করছে তিনটি সংগঠন ও একজন সাংবাদিক। সংগঠনগুলো হলো- এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও আল জাজিরা।

তিনি আরও বলেন, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নব্য হানাদার বাহিনী ও রাজাকারে পরিণত হয়েছে। একাত্তরে রাজাকার, আলবদর, আলশামসরা যেভাবে কথা বলত, সেই একই ভাষায় কথা বলছে সংগঠনটি। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের বিচারের কথা বলে ঔদ্ধত্য প্রদর্শনও করছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। কিন্তু তারা কতটা স্বচ্ছ? তারা তাদের ওয়েবসাইটে ডোনারদের নাম উল্লেখ করে না। কাদের টাকায় তারা সংগঠন চালায়?

প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল জনকণ্ঠকে বলেছেন, সম্প্রতি বিএনপি এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লবি ফার্ম একিন গাম্পের ভেতর সম্পাদিত চুক্তিটি আমাদের গোচরে এসেছে। চুক্তিটি প্রকাশিত হবার পর, বিভিন্ন মিডিয়ার কাছে বিএনপি নেতৃবৃন্দ এবং তাদের আন্তর্জাতিক আইনজীবী টবি ক্যাডমান প্রদত্ত (একিন গাম্পের চুক্তিতে বিএনপির পক্ষে যিনি প্রতিনিধিত্ব করেছেন) প্রতিক্রিয়াতে পরিষ্কারভাবে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, তারা এখনও ‘অস্বীকার’ করার সংস্কৃতি বা পঁষঃঁৎব ড়ভ ফবহরধষ লালনপালন করছে। আর চুক্তিটি হয়ে থাকলে, বিএনপি ইতোমধ্যেই রিটেইনার ফি হিসেবে ১,২০,০০০ মার্কিন ডলার একিন গাম্পকে প্রদান করেছে। সুতরাং, সময় এসেছে, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের চলমান বিচার প্রক্রিয়া নস্যাত করতে দেশে-বিদেশে বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক গৃহীত সকল প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার।

মুজাহিদ ও সাকার মামলা যখন শেষ পর্যায়ে ঠিক তখনই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী আটজনের সাফাই সাক্ষ্য নেয়ার যে আবেদন করেছেন, সেই আবেদনও রিভিউয়ের সঙ্গে আদালতে যাবে। রিভিউ শুনানিতে পাঁচ পাকিস্তানীসহ আটজনের সাফাই সাক্ষ্য নেয়ার জন্য তাদের নামে সমন জারির এই আবেদন করে সাকা চৌধুরী। তারা হলেনা- পাকিস্তানের স্থপতি মুনিব আরজুমান্দ খান, পাকিস্তানের ডন গ্রুপের চেয়ারম্যান আমবর হারুণ সায়গল, পাকিস্তানের সাবেক মন্ত্রী ইসহাক খান খাকওয়ানি, ভিকারুননিসা নূনের নাতি রিয়াজ আহমেদ নূন এবং পাকিস্তানের প্রাক্তন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান মোহাম্মদ মিয়া সুমরো। বাকি তিনজন হলো- যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাবেক কূটনীতিক এম ওসমান সিদ্দিক, বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শামীম হাসনাইন ও তার মা জিনাত আরা বেগম। এ বিষয়ে এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, এ পর্যায়ে এসে আবেদন করার সুযোগ নেই। ত্বরিত গতিতে শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের মামলাগুলোও দ্রুত শুনানি হয়েছে। সময় কতদিন লাগবে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা আাদালতের বিষয়। তবে আমার মতে, সময় লাগার কথা নয়। এদিকে সাকার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে চাওয়া ৫ পাকিস্তানী নাগরিকের নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আসামি পক্ষের ঐ আবেদনটিরও ২ নবেম্বর শুনানি হবে।

এর আগে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) তাদের ওয়েবসাইটে ‘বাংলাদেশ: আযম কনভিকশন বেজড অন ফ্লড প্রোসিডিংস’ শীর্ষক এক বিবৃতিতে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিচারকে গভীর ত্রুটিপূর্ণ ও পক্ষপাতমূলক বলে দাবি করে। অবশ্য তাদের এ বিবৃতির পর এইচ আর ডব্লিউর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা হয়। কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়ে মামলাটি নিষ্পত্তি করে দেয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ইউরোপীয় পার্র্লামেন্টের প্রতিনিধি দলের চেয়ারম্যান জিন ল্যাম্বাট জামায়াত নেতা মুজাহিদের মৃত্যুদ- বহাল রাখায় উদ্বেগ জানিয়েছেন। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিমালা অনুয়ায়ী রিভিউ আবেদনে মুজাহিদের বর্তমান দ- বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রসিকিউটর তাপস কান্তি বল জনকণ্ঠকে বলেন, সম্প্রতি বিএনপি এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লবি ফার্ম একিন গাম্পের ভেতর সম্পাদিত চুক্তিটি আমাদের গোচরে এসেছে। চুক্তিটি প্রকাশিত হবার পর, বিভিন্ন মিডিয়ার কাছে বিএনপি নেতৃবৃন্দ এবং তাদের আন্তর্র্জাতিক আইনজীবী টবি ক্যাডমান প্রদত্ত (একিন গাম্পের চুক্তিতে বিএনপির পক্ষে যিনি প্রতিনিধিত্ব করেছেন) প্রতিক্রিয়াতে পরিষ্কারভাবে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, তারা এখনও ‘অস্বীকার’ করার সংস্কৃতি বা পঁষঃঁৎব ড়ভ ফবহরধষ লালন-পালন করছেন। তা না হলে এই চুক্তিটি প্রকাশিত হবার পরেও কেন তারা ক্রমাগত চুক্তির অস্তিত্ব অস্বীকার করে যাবেন।

তিনি আরও বলেন, চুক্তির এনেক্স বি অংশের ৭নং ক্লজে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের ‘যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল’, যার প্রকৃত নাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, একিন গাম্পের লবিংয়ের অন্যতম বিষয় এবং একই অংশের প্রথম বাক্যটি পড়লে বোঝা যায়, একিন গাম্প ‘যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, থিংকট্যাঙ্ক ও মিডিয়ার কাছে লবিং করবে। বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত আন্তর্র্জাতিক অপরাধে জামায়াতের সম্পৃক্ততা, চলমান বিচার সম্পর্কে বিএনপির ধোঁয়াটে অবস্থান এবং ১৯৭১ সালে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধ সম্পর্কে ও ট্রাইব্যুনাল বিরোধী টবি ক্যাডম্যানের বক্তব্যসমূহ যদি আমরা আমলে নেই তাহলে একিন গাম্প আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রে কি ধরনের লবিং করবে; সেটা বুঝতে আর বাকি থাকে না বলে জানান ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল। এরই মধ্যে আমরা জানতে পেরেছি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পার্লামেন্টের প্রতিনিধি চিন ল্যাম্বার্ট বাংলাদেশ সরকারের কাছে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি মুজাহিদের মৃত্যুদ-াদেশ রহিত করে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়ার অনুরোধ করেছে। এই অনুরোধ কি গত ফেব্রুয়ারিতে একিন গাম্পের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিরই প্রতিফলন কিনা, তাও ভেবে দেখার সুযোগ রয়েছে বলে আমি মনে করি। একই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে আমরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংগঠনগুলোকেও মুখর হতে দেখি। মনে রাখতে হবে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের ফান্ডিং বা অর্থের উৎস প্রকাশ করে না এবং একাধিকবার উন্মোচিত হয়েছে যে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মানবতাবিরোধীদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে থাকে এবং কোন ধরনের প্রকৃত গবেষণা ছাড়াই তারা প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। সামগ্রিক বিবেচনায়, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংগঠনগুলো কি একিন গাম্পের ইশারাতেই নাচছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। কেননা, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না- বিএনপি একিন গাম্পকে মাসিক ৪০,০০০ ডলার প্রদান করবে এবং লবিংয়ের কাজে বাড়তি খরচ হলে সেটাও বিএনপিই প্রদান করবে। আর চুক্তিটি হয়ে থাকলে, বিএনপি ইতোমধ্যেই রিটেইনার ফি হিসেবে ১,২০,০০০ মার্কিন ডলার একিন গাম্পকে প্রদান করেছে। সুতরাং, সময় এসেছে, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের চলমান বিচার প্রক্রিয়া নস্যাত করতে দেশে-বিদেশে বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক গৃহীত সকল প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার।

প্রকাশিত : ১ নভেম্বর ২০১৫

০১/১১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: