১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কাগজ বিদায় করতে চাই


॥ দুই ॥

সরকারের এটুআই প্রকল্পের আওতায় শিক্ষাকে ডিজিটাল করার জন্য যেসব উদ্যোগের কথা বলা আছে তার মাঝে ডিজিটাল ডিভাইস প্রদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল ক্লাসরুম এমনকি শিক্ষকদের দ্বারা কনটেন্ট তৈরির বিষয়ও রয়েছে। এই বিষয়ে দৈনিক আমাদের সময়-এর ১৮ অক্টোবর ২০১৪ সংখ্যায় ৩-এর পাতায় এম এইচ রবিনের লেখায় আরও জানা যায়, এটুআই-এর বিশেষজ্ঞ ফারুক সাহেবের লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে,‘মালটিমিডিয়া শ্রেণীকক্ষ ও শিক্ষকদের তৈরি ডিজিটাল কনটেন্ট কার্যক্রম যথাযথভাবে চালু নেই এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠন কার্যক্রমের গুণগতমান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সঠিক তদারকির অভাবে এ প্রকল্প নিষ্ফলা।’

ফারুক সাহেবরাই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। এই প্রকল্পের দুটি বড় কম্পোনেন্ট ছিল ক. হার্ডওয়্যার সংগ্রহ এবং খ. প্রশিক্ষণ প্রদান। দুটি কাজই তারা দক্ষতার সঙ্গেই করেছেন। তবে যেসব হার্ডওয়্যার সরবরাহ করা হয়েছিল তার বেশিরভাগেরই এখন ব্যবহার নেই। এমন অভিযোগ আছে যে, প্রতিষ্ঠানপ্রধান বা ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রভাবশালীরা এসব দ্রব্য নিজের বাড়িতেও নিয়ে গেছে। সমস্যাটি আসলে অন্যত্র। একবাক্যে বলতে হলে বলতে হবে এখানে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়া হয়েছে। কোন ধরনের কনটেন্ট ছাড়া হার্ডওয়্যার আর প্রশিক্ষণ দিয়ে আর যাই হোক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম হয় না। কেবল পাওয়ার পয়েন্ট ব্যবহার করতে শিখে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা যেসব কনটেন্ট বানাতে পেরেছে তাতে শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর পুরোপুরি হতে পারে না। প্রকল্প তৈরির সময় কনটেন্ট তৈরির বিষয়টি কেন ভাবা হয়নি সেটি আমি এখনও বুঝতে পারি না।

অন্যদিকে পত্রে মনিটরিং করার যে বিষয়টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি তো এটুআই-এরই করার কথা। এটুআইকেই এখন নির্ধারণ করতে হবে, মনিটরিং কে করবে বা কিভাবে করবে। মাউশি বা এটুআই কারও পক্ষেই যে কাজটি করা হয়নি, সেটি স্বীকার করে এই প্রকল্প থেকেই একটি মনিটরিং পদ্ধতি খুঁজে বের করে নেয়া ভালো। তবে বিশেষজ্ঞ মহোদয় যে নিষ্ফলা মন্তব্য করেছেন তার মূল কারণ প্রকল্পের ত্রুটি। প্রকল্পের তৃতীয় একটি কম্পোনেন্ট যদি থাকত তবে এটি নিষ্ফলা প্রকল্প হতো না।

খবর অনুসারে প্রকল্পের ৪৯ কোটি টাকা এখনও ব্যয় করা হয়নি। শুধু প্রকল্পটিকে একটি রিভাইস করে এতে পাঠ্যপুস্তকের মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট পেশাগতভাবে তৈরি করার কাজটা করলেই অসম্পূর্ণ প্রকল্প পুরোই সফল হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা এটি কেন বোঝেন না যে, শিক্ষকরা তাদের প্রয়োজনে ছোটখাটো কনটেন্ট তৈরি করতে পারলেও পেশাদারি কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন না। যেমন করে সরকারকে পাঠ্য বই ও পাঠক্রম তৈরি করে দিতে হয়, তেমনি করে ক্লাসরুমের পাঠ্যবইকেন্দ্রিক কনটেন্ট সরকারকেই করে দিতে হবে। এজন্য পেশাদার আঁকিয়ে, পেশাদার শব্দ কারিগর, পেশাদার প্রোগ্রামার এবং কনটেন্ট নির্মাতার প্রয়োজন হবে। আমি এটি আশা করতে পারি না যে, একটি পাঠ্যবই একজন শিক্ষক তৈরি করে দেবেন। সেটি সম্ভব হলে এনসিটিবির দরকার হতো না। সেই কারণেই ডিজিটাল কনটেন্ট তাদেরকে দিয়েই করতে হবে যারা এর দক্ষতা রাখেন।

আমি জানি না এটুআই-এর নীতি ও কর্মপন্থায় কোন পরিবর্তন আসবে কিনা। তবে যদি পরিবর্তন না আসে তবে বুঝতে হবে প্রকল্পটি ব্যর্থ করার জন্যই হয়ত একে অসম্পূর্ণ করে রাখা হয়েছে।

আমাদের মতো গরিব দেশে একটি প্রকল্প তৈরি করা, সেটির জন্য অর্থ যোগাড় করা ও সেটি বাস্তবায়ন করা খুবই দুরূহ কাজ। তাই আমাদের প্রত্যাশা থাকে এই গরিব দেশের টাকা যেন যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয় এবং কোন প্রকল্প যেন ব্যর্থ না হয়। আমি নিজে শিক্ষার মাল্টিমিডিয়া বা ডিজিটাল রূপান্তরের স্বপ্ন দেখি এবং সেই স্বপ্ন নিয়ে কাজ করি। আমি এরই মাঝে বিজয় শিশু শিক্ষা এবং বিজয় প্রাথমিক শিক্ষা নামের পেশাদারি উপাত্ত বা শিক্ষামূলক সফটওয়্যার তৈরি করেছি। কিন্তু আমার তো কোটি কোটি টাকা নেই যে, আমি সকল শ্রেণীর সকল পাঠ্য বইকে ইন্টার এ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যারে রূপান্তর করতে পারব। বরং কোটি টাকায় সফটওয়্যার বানিয়ে যখন সেটি ২০০ টাকায় বেচতে হয় এবং যখন সেটিও পাইরেসির শিকার হয় তখন আর সামনে যাওয়া যায় না। অনুরোধ করব, তারা যেন এই দৃষ্টান্তগুলো পর্যবেক্ষণ করে সামনের পথে পা বাড়ান। তাদেরকে নতুন করে চাকা আবিষ্কার করতে হবে না, আমরা ডিজিটাল কনটেন্ট বিষয়ক চাকা আবিষ্কার করেই রেখেছি। তারা যদি সেই চাকাটিকে সামনে নেবার ব্যবস্থা করেন তবেই সহসাই আমরা শিশুদেরকে মেরুদ- সোজা করে হাঁটাতে পারি। সম্ভবত তখন আমরা বলতে পারব যে স্কুল ব্যাগ নয়, ল্যাপটপ বা ল্যাপটপেই পড়বে আমাদের সন্তানেরা। আমাদের ক্লাসরুমগুলোও তখন মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ডেনমার্ক বা যুক্তরাজ্যের মতো হয়ে উঠবে। আমি এটিও প্রত্যাশা করি যে, হাঁটুভাঙ্গা ধরনের ডিজিটাল ক্লাসরুম আমাদের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে না। সুখের বিষয় আমরা স্কুলব্যাগটা যে উধাও করতে পারি তার দৃষ্টান্ত বাংলাদেশেই স্থাপন করেছি। আমাদের মাল্টিমিডিয়া বা ডিজিটাল স্কুলগুলো সেই দৃষ্টান্তই প্রদর্শন করছে। একদিন দেশের সকল ক্লাসরুমই এমন ডিজিটাল হবে।

কেবল ডিজিটাল ক্লাসরুম নয় প্রতি শিক্ষার্থীর হাতে ল্যাপটপ চাই : আমার প্রস্তাবনাগুলো খুবই সরল। প্রথমত দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাসরুমগুলোকে পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল করতে হবে এবং এজন্য প্রজেক্টর নির্ভরতা রাখা যাবে না। প্রজেক্টর বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য উপযোগী নয়। প্রজেক্টরের ল্যাম্প নষ্ট হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কিনতে পারে না। এর দাম প্রায় প্রজেক্টরের কাছাকাছি। বরং ফ্লেক্সি বোর্ড বা বড় পর্দার মনিটর/টিভি ব্যবহার করে প্রজেক্টরের বিকল্প তৈরি করা যায়। এতে কেবল ব্যয় কমবে না বরং টিভি দেখানো সম্ভব হবে। বড় পর্দার সঙ্গে ল্যাপটপ ব্যবহৃত হলেও ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে ল্যাপটপ/ট্যাবলেট পিসি দেয়া যায়। ব্রিটেন যে সিদ্ধান্তটি নিয়েছে সেটি বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা যায়। আমাদের যে বিপুল পরিমাণ ল্যাপটপ ট্যাবলেট প্রয়োজন সেগুলো বিদেশ থেকে আমদানি না করে টেলিফোন শিল্প সংস্থা বা বেসরকারী কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় দেশেই উৎপাদন করা যেতে পারে। এ বিষয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। ৬ আগস্ট ২০১৫ তারিখে অনুষ্ঠিত সেই সভার ৭.১, ৭.৩ ও ৭.৫ নাম্বার সিদ্ধান্তে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমি মনে করি, কেবল ডিজিটাল ডিভাইসই নয়, এতে ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় উপাত্ত নির্মাণ করতে হবে। এসব উপাত্ত হতে হবে পেশাদারি মানের। সেইসব কনটেন্ট সংবলিত ল্যাপটপ/ট্যাবলেটগুলোকে শিক্ষার্থীদের হাতে দিতে হবে। এতে থাকতে হবে ওয়াইফাই এবং ইন্টারনেট সংযোগ।

এই ট্যাবলেটগুলোর ওজন খুব কম হবে। শিশুরাও সহজেই এটি বহন করতে পারবে। এটি মজবুত হবে যাতে ছেলেমেয়েরা সাধারণভাবেই এটি ব্যবহার করতে পারে। এর মেরামতি ও রক্ষণাবেক্ষণ যাতে প্রতিটি গ্রামেই পাওয়া যায় তার ব্যবস্থাও করতে হবে। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি সেটি হচ্ছে, এর দাম হতে হবে খুব কম। সরকার বছরে যে হাজার হাজার কোটি টাকা বই মুদ্রণের জন্য ব্যয় করে তার অংশ বিশেষ ব্যবহার করেই দেশের সকল শিক্ষার্থীর হাতেই ল্যাপটপ/ট্যাবলেট পৌঁছানো যাবে। এজন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো তৈরির কাজটিও সরকারকেই করতে হবে।

সরকার ইতিমধ্যে ডিজিটাল ক্লাসরুম গড়ে তোলার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তাকে নতুন করে পর্যালোচনা করতে হবে এবং যেসব ত্রুটি ধরা পড়বে সেগুলো সংশোধন করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে হার্ডওয়্যার সংগ্রহ করার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে এবং সফটওয়্যার তৈরির ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের সময় তারা যাতে সঠিকভাবে বাংলা বর্ণ ব্যবহার করে সেটিও লক্ষ্য রাখতে হবে। রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

আমরা শিশুদের জন্য ইন্টারঅ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার তৈরি করে দেখেছি যে তার প্রতি শিশুরা দারুণভাবে আকৃষ্ট হয় এবং তাদের লেখাপড়ার মান ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। শিক্ষা উপকরণ হিসেবে সফটওয়্যারের গ্রহণযোগ্যতা শিশুদের কাছে প্রচ-। বিজয় শিশু শিক্ষা বা বিজয় প্রাথমিক শিক্ষার সহায়তায় আমরা সেটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি।

আমরা ২০১৬ সালে নেত্রকোনার পূর্বধলার একটি স্কুলে প্রথমবারের মতো ল্যাপটপভিত্তিক একটি ক্লাসরুম চালু করতে যাচ্ছি। স্কুলটির প্রথম শ্রেণীর সকল ছাত্র ছাত্রীকে ক্লাসরুমে ও বাড়িতে ল্যাপটপ পিসি ব্যবহার করতে দেয়া হবে। যদিও তাদের পাঠ্য বই পুরোই বাদ দেয় হবে না তবুও লেখাপড়ার প্রধান কেন্দ্র হবে তাদের ট্যাব। ট্যাবগুলো হবে উইন্ডোজনির্ভর। এতে তারা কম্পিউটারের ব্যবহারও শিখবে। কম্পিউটারের প্রাথমিক কাজ যেমন এটি চালু করা, অপারেটিং সিস্টেম, অফিস, ইন্টারনেট ইত্যাদি ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যবই এবং সফটওয়্যার এতে দেয়া হবে। বিজয় প্রাথমিক শিক্ষা ১ সিরিজের বাংলা, ইংরেজী ও গণিত সফটওয়্যার থাকবে তাদের ট্যাবে। ইতিমধ্যে শিক্ষিকাদেরকে এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়েছে। এই বছরের ডিসেম্বরে স্কুলটির উদ্বোধন হবে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শিশুদেরকে ইন্টারঅ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার দিয়ে শিক্ষা দেয়া।

অন্যদিকে সরকারের টেলিকম বিভাগ ঢাকা-গাজীপুরের ২০টি প্রাথমিক স্কুলের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সকল ছাত্রছাত্রীকে ল্যাপটপ দিয়ে সজ্জিত করার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তারা ৮ ইঞ্চি পর্দার টু ইন ওয়ানকে এজন্য পছন্দ করেছে। এই ডিজিটাল যন্ত্রটি একাধারে ল্যাপটপ ও ট্যাব হিসেবে কাজ করবে। এই প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ৬ হাজার ল্যাপটপ ছোট শিশুদের হাতে দেয়া হবে। এতে তাদের পাঠ্যবইও থাকবে। তাদের ক্লাসরুমগুলোকে ডিজিটাল ক্লাসরুম হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এইসব ক্লাসরুমে একটি ১০ ইঞ্চি মাপের ল্যাপটপ এবং ৩৯ ইঞ্চি মাপের টেলিভিশন থাকবে। টেলিফোন শিল্প সংস্থা পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ যন্ত্রপাতির দেখাশোনাটিও তারাই করবে।

কোন সন্দেহ নেই যে, এর ফলে আমরা তাদের ঘাড়ে চাপানো স্কুল ব্যাগটা উধাও করে দিতে পারব। পরের বছর স্কুলটির আরও ক্লাসকে এভাবে ডিজিটাল করা হবে। আমি আশা করি পূর্বধলার এই স্কুলটি বাংলাদেশের ডিজিটাল শিক্ষার প্রতীক হিসেবে পরিগণিত হবে।

এই কথাটি মনে রাখা দরকার, শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর ছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে উঠবে না। সবার আগে তাই শিক্ষাকে ডিজিটাল করতে হবে। (সমাপ্ত)