১৭ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

সত্য ও সঙ্কট ॥ অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট হত্যার নিরিখে


ব্লগার হত্যা (যদিও আমি ব্লগার না বলে অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট শব্দটাকেই যথার্থ মনে করি) বিষয়টি হয়ত পানসে হয়ে গেছে আমাদের মানসে। আর বেশিদিন লাগবে না ভুলে যেতে। হয়ত ইতোমধ্যে ভুলে গেছি হাজার হাজার দুর্ভাগা মানুষকে, যারা দালালের মাধ্যমে ট্রলারে সওয়ার হয়ে নয়া সিন্দাবাদের মতো মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিতে গিয়ে পাচারকারী চক্রের হাতে নিপীড়িত-নির্যাতিত হয়েছেন। অনেকেই জীবনের শেষ ঠিকানা নিয়েছেন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার জঙ্গলের গণকবরে। মিডিয়াতে বিষয়টি প্লাবনের মতো আসে, আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অতঃপর আমরা ভুলে যাই। ভুলে যেতে হয় আমাদের জীবনের প্রাত্যহিক প্রয়োজনে।

বলছিলাম অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টদের কথা। যাদের শাহবাগ চত্বরের নবজাগরণের সৈনিক, নয়া সামাজিক আন্দোলনেন অগ্রদূত, কেউ কেউ আবার নতুন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা বলেছেনÑ কেমন আছেন তারা! ধর্ম নিরপেক্ষ সেক্যুলার বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যেই নির্মমভাবে হত্যাকা-ের শিকার আর কেউ কেউ দেশের বাইরে পাড়ি জমালেও বৃহত্তর অংশ দেশের ভেতরেই আছেন। হয়ত তারা প্রয়োজনে পুলিশের সাহায্য পাচ্ছেন এবং নিরাপদ স্থানেই আছেন।

শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম কর্মীর কাছ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু আভাস পাই। তাতে স্বস্তি পাই এমন নয়। তিনি জানান, ‘সন্ধ্যা ৬টায় বাসায় যাই। দিনের আলোয় একা ঘুরি না। শাহবাগে প্রোগ্রাম ছাড়া যাই না। একা অফিসে থাকি না। থাকলেও তালাবদ্ধ অবস্থায়। কোন হোটেলে একা খাই না। এত খারাপ অবস্থায়ও আমি রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত কিন্তু আশ্বস্ত নই।’ না তিনি কোন সেলিব্রেটি ব্লগার নন, কিন্তু অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব।

ভাবনার বিষয় এসব ব্যক্তিকে ঘিরে সাধারণ মানুষদের নিয়ে। যারা নিয়ত আতঙ্কের ভেতর বাস করছেন, তারা কারও মা, কারও বোন। তারা ব্লগ, ব্লাসফেমি কোনটাই জানে না, জানতে চায় না। শুধু তাদের প্রিয়জনদের নিরাপত্তা চায়, চায় সে বেঁচে থাকুক। ধর্ম অবমাননার যে ছাপ তাদের দেয়া হয়েছে, সেটা যাচাই করার আদৌ কোন মাপকাঠি দিয়েছে কিনা অভিযোগকারীরা? আর অভিযোগকারী কোন মাপকাঠি না দিলেও যারা প্রতিদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করেন সেই সাধারণ নাগরিক, সেক্যুলার সুশীল সমাজ, রাষ্ট্র তার কোন উদ্যোগ নিয়েছে কিনা! যদি না হয় তাহলে ৫৭ ধারাক্রমে যে কেউ দুর্ভোগের শিকার হতে পারেন। এমনকি রাজনীতিকও। তার জন্য তাকে অন লাইন এ্যাক্টিভিস্ট হতে হবে না, এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার এ্যাকাউন্ট না হলেও অসুবিধা নেই। যে কেউ তার নামে ‘জাল’ বা ‘ভুয়া’ এ্যাকাউন্ট খুলতে পারে পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে এবং সেটুকুই যথেষ্ট। বিষয়টা নিয়ে সত্যিই কাজ করার আছে। সমবেতভাবেই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রয়োজন আছে। না হলে মায়েদের নির্ঘুম রাত, বোনের দীর্ঘশ্বাস বাড়তেই থাকবে। জমবে চোখের কোলে কালি। চুরাশিজন ব্লগার (অভিযোগকারীদের মতে) নাস্তিক হলেও অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টের সংখ্যা হাজার হাজার।

হাজার হাজার তরুণ-তরুণী, তাদের আত্মীয়রা আতঙ্কে আছে। তাদের একমাত্র অন্যায় তারা শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল। তারা যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবির নেতাসহ দুষ্কৃতকারী গণহত্যাকারীদের উপযুক্ত সাজা চায়। তাই নাস্তিক হত্যার নামে এ ইতিহাসের জঘন্য হত্যাকা- মাত্র ১০ জনের (জাফর মুন্সী, রাজীব হায়দার, জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবু, আশরাফুল ইসলাম, রাকিব মামুন, অভিজিৎ রায়, জগত জ্যোতি তালুকদার, আরিফ রায়হান দ্বীপ, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, নিলাদ্রি নীল) মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এ সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। যারা এ হত্যাকা-ের প্ররোচক, সহায়তাকারী এবং সমর্থক তাদের কি মানুষ বলা যায়! ব্লগার নাস্তিকী সমীকরণের উদ্দেশ্য ভুল পথে পরিচালিত করা। যুদ্ধাপরাধের সত্যকে আড়াল করা।

সঙ্কট এই জন্য, সেক্যুলার সমাজের আদর্শ এই তরুণরা ধারণ করে রাস্তায় নেমেছিল, শাহবাগ জাগরণ ঘটিয়েছিল, সে ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে কোন ফাঁক ছিল কি-না সেটা আগে জানা দরকার। গলদটা কোথায়? যেটা অভিযোগ আনা হয়েছে সেই নোংরা সংস্কৃতি ব্লগার বা অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টদের ভেতর হচ্ছে কিনা। থাকলে কারা বা কি উদ্দেশ্যে করছে সেটা জানা প্রয়োজন। শুধু একজন দু’জন অ-এ্যাক্টিভিস্টের কারণে যদি গোটা অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট কম্যুনিটিকে দায়ী হতে হয়, তাহলে সে দায় থেকে বেরিয়ে আসার দায়িত্ব সর্বাগ্রে তাদের নিজেদের। সঙ্কট চিহ্নিত করতে পারলে সঙ্কট উত্তরণের পথ খুঁজলে পরিকল্পিত প্রতিরোধের মাধ্যমে তা অর্র্জন সম্ভব। শাহবাগের ‘সাইবার যুদ্ধে’ সাঈদীর ‘চাঁন্দমুখ/চাঁদমুখ’ বা ‘কাবার গিলাফের’ উন্মোচন তার প্রমাণ।

একটা সত্য যে অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টরা প্রতিটি দেশেই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরাগভাজন, কখনও কখনও সরকারেরও। সত্য উন্মোচন করার জন্য তাদের সইতে হয় নানান দুর্ভোগ। সময়ের সঙ্গে তাই নানান কৌশল গ্রহণ করতে হয় তাদের। প্রথমে নিজের অবস্থানে টিকে থাকা এবং কাজটি চালিয়ে যাওয়া। সত্য প্রকাশিত হবেই। দশ দশটি জীবননাশের পর হলেও আজকে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম স্পষ্ট বলেছে- যে ধর্ম মানে না দেশটা তারও।

যে মাদ্রাসা ছাত্রটির হাতে চাপাতি তুলে দেয়া হচ্ছে তার সঙ্গে সেক্যুলার অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টদের শুধু নয়, গোটা সমাজের একটা দূরত্ব আছে। কিন্তু তাকে যদি তথ্য প্রযুক্তির উপযোগিতা বুঝিয়ে দেয়া যায়, তাহলে তার হাত ধরেই হয়তো গুণে গুণে ঘুষ নেয়ার মতো আরও প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। এ জায়গাটিতে অনেক কাজ করার আছে। সেসব অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টরা এড়াতে পারবেন না। শুধু কয়েকটা পোস্ট বা ব্লগ লিখে শাহবাগের সেক্যুলারিজমকে দেশের প্রান্তিক মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তার জন্য মাঠে নামা চাই এক্ষুণি।

আরও আছে। আজ যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, তাদের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। তথ্য বলে, যারা অভিজিৎ আর রাজীব হায়দার হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত তারা দেশের সেরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আর হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে জড়িত। এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, দীর্ঘদিন ধরে হিযবুত তাহরীর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তরুণদের ভেতর তাদের জাল বিস্তারই শুধু করেনি, তাদের তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী যদিও সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করেছেন কিন্তু তথ্য প্রযুক্তি ও এই তরুণদের কর্মকা- বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এই তরুণদের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর অংশীদার করার কঠিন কাজটি আপনাকেই শুরু করতে হবে। কারণ আপনিই জানেন তথ্য প্রযুক্তির সম্ভাবনার দিক যতটা, ঝুঁকিও আছে ততটা। উন্নয়নশীল একটি দেশের তরুণদের ঝুঁকি সামলানোর ব্যবস্থা না রেখে হাতে প্রযুক্তি তুলে দেয়া হয়েছে। কিছু প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তাদের নিজেদের বিশ্বাসের ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে তথ্য প্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্র্রি তৈরি করে নিয়ে তার যথেচ্ছ ব্যবহার করছে। আজ সাঈদীর ছবি চাঁদে পাঠিয়ে উদ্দেশ্য সাধন করেছে, কাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মদ্রোহী হিসেবে আপনার আমার নামে অপপ্রচারে পিছপা হবে না। কারণ তাদের উদ্দেশ্য একটাইÑ সত্যকে আড়াল করে মিথ্যা প্রচার করে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করা। পুরোটাই এক ধরনের শয়তানী।

মান্যবর, আপনারই সহৃদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কারণ এটা সত্য, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনুমান করছি, রাজনীতিকরা ব্লগ লিখবেন না। অন্তত আমাদের দেশে, এই সময়ে কিন্তু তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ্যাকাউন্ট আছে। ফেসবুকে আপনি চিহ্নিত ব্যক্তি এবং গত সপ্তাহেই দেশের মন্ত্রিপরিষদের একজন মন্ত্রীর সদয় নজরে দূর মালয়েশিয়ার একজন নিগৃহীত প্রবাসী শ্রমিকের উদ্ধার লাভ ঘটেছে। তথ্য প্রযুক্তির সেই ইতিবাচক দিকটাই চিহ্নিত করতে চাইছি।

দুটি বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত. হত্যাকা-ের ধরন। অভিজিৎ বা নীলাদ্রি যারা মুখেই সেক্যুলার ছিলেন না, তাদের জীবনে জীবনসঙ্গী নির্বাচনের মাধ্যমে মুক্তবুদ্ধির চর্চার প্রমাণ দিয়েছিলেন। এ হত্যাকা- সেই ইতিবাচক সেক্যুলার জীবনচর্চার মূলে আঘাত হেনেছে। অনেক দম্পতি ভয়ে আছেন। অনেকেই যারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তারা সাহস পাচ্ছেন না দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করার।

॥ দুই ॥

আইসিসের প্রধান বলে যাকে ধরা হয়েছে সেই আমিনুল ইসলাম বেগ এক মাস আগেও দেশের অন্যতম বৃহত্তর মোবাইল অপারেটর কোম্পানি রবির বিলিং বিভাগের প্রধান ছিলেন। দেশে কয়েকটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানিতে চাকরি করার পর সর্বশেষ কোকা-কোলায় আইটি বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আর গ্রামীণফোন ‘ল ইনসেপশন সেল’ থেকে শুরু করে জিপির (এচ) গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির লোক বসে আছে। মোবাইল অপারেটগুলোর এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির লোক বর্তমান। তাহলে দেশের প্রতিটি প্রগতিশীল মানুষের ব্যক্তিগত ডাটা কতটা নিরাপদ! আমরা এই সঙ্কটের মধ্যে আছি। সমস্যাটা শুধু ধর্ম-অধর্মের মধ্যে নেই। কোন্্ পক্ষ কতটা তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফায়দা হাসিল করছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। শয়তানদের চিহ্নিত করা ছাড়া অন্য কোন পথ নেই।

লেখক : সাস্কৃতিক কর্মী, এ্যাক্টিভিস্ট এবং সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘যোগাযোগ ও নয়া মাধ্যম’-এ পিএইচডি করছেন