১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

সুরতহালে কারসাজি


সুরতহালে কারসাজি

নিয়াজ আহমেদ লাবু ॥ এখনও শরীয়তপুরের চামটার হেনা আক্তারের কথা নিশ্চই মনে আছে অনেকের। ঘটনাটি ২০১১ সালের শুরুর দিকের। চাচাত ভাই মাহবুবের লালসার শিকার কিশোরী হেনা। ঘটনাটি স্থানীয় ইউপি সদস্য ইদ্রিস শেখের কানে পৌঁছলে তিনি আক্রোশে ফেটে পড়েন। তার চ্যালারা গিয়ে হেনাকে ধরে আনে। গ্রামভর্তি মানুষের সামনে কিশোরী হেনাকে গুনে গুনে ১০০ দোররা মারা হয়। হেনার অসহায় আর্তি সমজাপতিদের সমাজ রক্ষায় অবিরাম মেরে চলা দোররার গতি থামাতে পারেনি। যদিও হেনার জীবনের গতি সেদিনই সেখানে থেমে যায়। অথচ এই হেনার সুরতহাল প্রতিবেদনে স্থানীয় নড়িয়া থানার এসআই আসলাম উদ্দিন উল্লেখ করেন, চাচাত ভাই মাহবুবের কাছ থেকে প্রেমের স্কীকৃতি না পেয়ে হেনা আত্মহত্যা করেছে। তার শরীরে কোন আঘাতের চিহ্নও নেই। তাহলে হাজার হাজার মানুষের সামনে অবিরাম মেরে চলা এক শ’ দোররার আঘাত লুকালো কোথায় হেনা, নাকি এসআই আসলাম উদ্দিন সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় চোখে টিনের চশমা পরেছিলেন। এখানেই শেষ নয়, শরীয়তপুরের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও বিষয়টিকে আত্মহত্যা বলেই চালিয়ে দিয়েছেন। তারা দেখিয়েছেন হেনার শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন ছিল না। সংবাদটি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলে উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে। কবর থেকে তুলে আনা হেনার লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বলছে, হেনা আত্মহত্যা নয়, হত্যার শিকার। হত্যার আগে হেনাকে ধর্ষণও করা হয়েছে। তার শরীরে আঘাতের চিহ্নও রয়েছে। পুলিশের কারসাজিতে আর অজ্ঞতায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলার মূল হাতিয়ার সুরতহাল রিপোর্ট এভাবে পাল্টে দেয়া হয়। ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিতই নয়, ঘটনা আড়াল করতেও এই কাজ সচেতনভাবেই করে থাকে পুলিশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের অধিকাংশ সুরতহাল প্রতিবেদন অপ্রয়োজনীয় লেখা, ভুল তথ্য, অপরিচ্ছন্ন লেখার কারণে খুন থেকে শুরু করে বিভিন্ন অস্বাভাবিক মামলার প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা যায় না। সুরতহাল প্রতিবেদনে স্বচ্ছ ধারণা থাকলে মামলার তদন্তে গতি আসে। অপরাধীর শাস্তিও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যাকা-ে দেখা যায়, পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে শুধু ছুরিকাঘাতকে উল্লেখ করেছে। সুরতহাল প্রতিবেদনেই ছুরিকাঘাতকে কিভাবে একমাত্র কারণ হিসেবে পুলিশ ধরে নিল এ নিয়ে পরে বিতর্ক তৈরি হয়। পুলিশী সুরতহালে ছুরিকাঘাত ছাড়া অন্য কারণ উল্লেখ না থাকায় রাসায়নিক পরীক্ষার (ভিসেরা) আলামত সংরক্ষণ করেনি মর্গ। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা সাদা চোখে দেখে একজন এসআই কিভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছান তা নিয়ে মামলার পরবর্তী তদন্ত কর্র্তৃপক্ষ প্রশ্ন তুলেছিল। তারা হত্যাকা-ের ৭৫দিন পর আবারও সাগর-রুনীকে কবর থেকে তুলে আনে আলামত সংগ্রহের জন্য। এই মামলাটিরও কোন কিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

হেনা ট্র্যাজেডি উন্মোচনকারী সদ্য অবসরে যাওয়া বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক সম্প্রতি এক টেলিভিশন টকশোতে বলেছেন, ওই সময় শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন আদালতকে বলেছিলেন, এমনটা জেলা পর্যায়ে হরদমই হয়ে থাকে। পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসক তার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেন।

শরীয়তপুরের সিভিল সার্জনকে উদ্ধৃত করে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের বক্তব্যের সত্যতা মিলেছে অনুসন্ধানে। জেলা পর্যায়ে ময়নাতদন্ত বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেছে, জেলা পর্যায়ে পুলিশের সুরতহাল রিপোর্টের ভিত্তিতে হয় ময়নাতদন্ত। তার ওপর জেলা পর্যায়ের কোন হাসপাতালেই ময়নাতদন্তের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। নিয়মিত কাজের বাইরে অন্যান্য চিকিৎসক অনেকটা দায়সারাভাবেই লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট তৈরি করেন। জেলার সব হাসপাতালে একজন করে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগের প্রস্তাব দীর্ঘদিনের। হাসপাতাল থেকে অনেকদূরে গিয়ে জেলা হাসপাতালের চিকিৎসকদের ময়নাতদন্ত করতে হয়। অনেকক্ষেত্রে চিকিৎসকরা মর্গ সহকারীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ময়নাতদন্ত করে থাকেন। বেশিরভাগ চিকিৎসক লাশ ধরেও দেখেন না। পচা-গলা লাশ হলে তো কথাই নেই; ডোমকে ফোনে নির্দেশ দিয়ে দায়িত্ব সারেন ডাক্তার। এতে মামলা পরিচালনার সময় বিপাকে পড়েন বাদী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মামলার আসামিরাও পার পেয়ে যায় পুলিশের গোঁজামিলের জন্য।

সুরতহাল সম্পর্কে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারায় বলা হয়েছে ‘থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অথবা এ সম্পর্কে ক্ষমতাবান কোন পুলিশ কর্মকর্তা যদি সংবাদ পান যে, কোন ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে অথবা অপর কোন ব্যক্তি বা প্রাণী কর্তৃক বা কোন যন্ত্রের আঘাতে কেউ মারা গেছে যার ফলে যুক্তিসঙ্গতভাবে সন্দেহ করা যেতে পারে যে, অপর কোন ব্যক্তি কোন অপরাধ সংঘটন করেছে, সেক্ষেত্রে অবিলম্বে সুরতহাল তদন্তের জন্য ক্ষমতাবান নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটকে এ ব্যাপারে জানাবেন এবং পুলিশ কর্মকর্তা নিজে সেখানে যাবেন এবং লাশের সুরতহাল প্রণয়ন করবেন। মৃত ব্যক্তির দেহে ক্ষত, ভাঙ্গা বা মচকে যাওয়ার দাগ, আঁচড়ের দাগ ও অন্যান্য আঘাতের চিহ্ন বর্ণনা করে এবং যেভাবে ওই চিহ্নের সৃষ্টি হয়েছে তা উল্লেখ করে আপাতদৃষ্টিতে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদন করবেন এবং এলাকার সম্ভ্রান্ত দুই ব্যক্তির উপস্থিতিতে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রস্তুত করবেন।’ অন্যদিকে ১৭৬ ধারা অনুসারে পুলিশের হেফাজতে কোন ব্যক্তির মৃত্যু হলে সুরতহাল করার ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট তা পরিচালনা করবেন। ম্যাজিস্ট্রেট মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের জন্য লাশ কবর থেকে উঠিয়ে পরীক্ষা করাতে পারেন।

কিন্তু সাম্প্রতিক বহুল আলোচিত কয়েকটি ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে পুলিশের সুরতহালে কারসাজির চিত্র উঠে এসেছে। বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যাকা-ের ঘটনায়ও এই চিত্র দেখা গেছে। রাজধানীর পান্থপথের ফ্ল্যাটে ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র সাংবাদিক মেহেরুন রুনীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই হত্যাকা-ের পর ঘটনাস্থলের আলামত সংগ্রহে শেরেবাংলা নগর থানা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি খুঁজে পায় উচ্চ আদালত গঠিত তদন্ত কমিটি। হত্যা পরবর্তী ওই বাসা থেকে খোয়া যাওয়া একটি মোবাইল ফোনও পরবর্তীতে এক পুলিশ কর্মকর্তার ভাইয়ের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি অতি আশ্চর্যজনক। উচ্চ আদালত গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কামাল হোসেন ও আবু জাফর মোঃ মাহফুজুল কবীরের অদক্ষতার প্রমাণ মিলেছে। কারণ, সুরতহাল প্রতিবেদনের স্থান, তারিখ ও সময় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। দুটি সুরতহাল প্রতিবেদনে একই ভুল করা হয়েছে। দু’জন এসআই একই ভুল করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কমিটির কাছে দেয়া জবানবন্দীতে তেজগাঁও অঞ্চলের উপপুলিশ কমিশনার ইমাম হোসেন বলেছেন, সিআইডির অপরাধস্থল পরিদর্শনকারী দল ঘটনার দিন সকাল দশটা থেকে সাড়ে দশটার পরে ঘটনাস্থলে আসে। তারা ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ (ক্রাইম সিন প্রস্তুত) করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসআই কামাল হোসেনের তৈরি করা সুরতহাল প্রতিবেদনে সাগর সারওয়ারের লাশ কে শনাক্ত করল, তা উল্লেখ করা হয়নি। লাশ শনাক্ত ছাড়া সুরতহাল প্রতিবেদন ত্রুটিপূর্ণ। সুরতহাল প্রতিবেদনে এসআই কামাল হোসেন কীভাবে মৃত সাগর সারওয়ারকে শনাক্ত করলেন, তা বলা হয়নি। দুই সাংবাদিকের মৃতদেহ শয়নকক্ষের কোথায়-কী অবস্থায় ছিল, তারও সুনির্দিষ্ট বিবরণ নেই। জব্দ তালিকায় আলামত জব্দের স্থান শুধু শয়নকক্ষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সামগ্রী শয়নকক্ষের মেঝে বা খাটের উপরে বা নিচে, নাকি টেবিল বা আলমারির নিচ থেকে অর্থাৎ শয়নকক্ষের কোন্ জায়গা থেকে জব্দ করা হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করে বর্ণনা করার দরকার ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্ত কর্মকর্তার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পরপরই শয়নকক্ষটি সিলগালা করা জরুরী ছিল। কারণ, শয়নকক্ষে অনেক আলামত রয়েছে। যা পরবর্তী সময়ে তদন্তের জন্য প্রয়োজন হতে পারে। সিলগালা না করায় গত ১৪ ফেব্রুয়ারি এজাহারকারী মাল খোয়া যাওয়ার বিষয়টি যে আবেদন করেছেন, তা থেকে মনে হয়েছে যে আলামত নষ্ট করার সুযোগ তদন্ত কর্মকর্তা করে দিয়েছেন। ঘটনাস্থলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া যথার্থ হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ছুরিকাঘাতের কারণেই সাংবাদিক দম্পতি সাগর ও রুনীর মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত ছিল পুলিশ। সুরতহাল প্রতিবেদনে হত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ছুরিকাঘাত ছাড়া অন্য কিছু উল্লেখ না থাকায় রাসায়নিক পরীক্ষার আলামত সংরক্ষণ করেনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ। মামলার তদন্ত সংস্থা র‌্যাব বলছে, চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা সাদা চোখে দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কিছু তথ্য ভবিষ্যতের জন্য রাখলে তদন্তে সুবিধা হতো। এত বড় ঘটনায় পুলিশ ও ফরেনসিক বিভাগের উচিত ছিল অন্তত ভবিষ্যতের কথা ভেবে হলেও কিছু আলামত সংগ্রহে রাখা।

একইভাবে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ১৬ মার্চ রাত পৌনে তিনটায় পুলিশ উত্তরখানের আইচি হাসপাতাল থেকে অজ্ঞাতনামা এক বৃদ্ধ পথচারীর লাশ উদ্ধার করে ঢামেক মর্গে পাঠায়। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুল মান্নান লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনের এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, শুক্রবার দিবাগত রাত দুটোয় উত্তরখানের আটপাড়ায় অজ্ঞাতনামা একটি গাড়ি অজ্ঞাত বৃদ্ধ পথচারীকে চাপা দিয়ে চলে যায়। এরপর স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উত্তরখানের ওই হাসপাতালে নিলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের পরনে ছিল বিভিন্ন রঙের শর্টপ্যান্ট ও গায়ে চেক ফুলশার্ট। অপরদিকে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনের প্রাথমিক তদন্তে এসআই আব্দুল মান্নান উল্লেখ করেছেন, নিহত ওই বৃদ্ধ ভাসমান পাগল প্রকৃতির, স্থানীয়রা কেউ তাকে চেনে না। শুক্রবার রাত পৌনে বারোটায় উত্তরখানের আটপাড়ায় বেপরোয়া গতির একটি কাভার্ডভ্যানের (ঢাকা মেট্রো ট-১১-৬২৩৩) চাপায় ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তবে আশ্চর্যজনক হলো, একটি সুরতহাল প্রতিবেদনে দু’রকমের বক্তব্য উপস্থাপন করা হলেও মৃত্যুর আগেই এ সংক্রান্তে থানায় সাধারণ ডায়েরি (যার নম্বর ৫৯৭, তারিখ ১৫/০৩/১৩ইং) করা হয়েছে। আরও আশ্চর্য যে, বিধি মোতাবেক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব এসআই আব্দুল মান্নানের। কিন্তু লাশের চালান কপি তৈরি করলেন এসআই হুমায়ুন কবীর। এ নিয়ে মর্গ সংশ্লিষ্টরাও বিভ্রান্তির মুখে পড়েন। ওই বছর ২ মার্চ শাহ আলী থানার নবাবেরবাগ এলাকা থেকে অজ্ঞাত পরিচয় এক মেয়ের (১৮) লাশ উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে এসআই আবদুল বারী উল্লেখ করেন, তদন্তকালে আরও জানা যায়, মৃতা হজরত শাহ আলী মাজারে অবাধে চলাফেরা করত। তাহার কোন ঠিকানা কেহ বলতে পারে নাই। অসৎ চরিত্রের লোকজন তাকে ফুঁসলাইয়া নিয়া ধর্ষণ করিয়া হত্যা করেছে বলে মনে হচ্ছে। ওই বছর গত ২১ ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর পল্লবী থেকে উদ্ধার করা অজ্ঞাতনামা এক লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে এসআই ইয়াছিন মুন্সি লিখেছেন, ‘মৃতের লাশ সৎকাজের (সৎকার) জন্য আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামকে দেয়া যেতে পারে। সুরতহাল প্রতিবেদনে লাশের সৎকারের কি ব্যবস্থা করা যায় না যায় তা লেখার কি কোন সুযোগ আছে!

অনেকক্ষেত্রে পুলিশ নিজেই সুরতহালকে ত্রুটিপূর্ণ বলে উল্লেখ করছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দেশের ১১ জেলার ১২০ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ছত্রিশটির কারণ উদ্ঘাটন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর সিআইডি এর কারণ হিসেবে বলছে এসব মামলা তদন্তে ব্যর্থতার কারণ হিসেবে বলা হয়, নিহত ব্যক্তির সুরতহাল প্রতিবেদন ঠিকমতো না করা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বুঝতে না পারা, লাশ শনাক্ত না হওয়া এবং বিজ্ঞানসম্মত বস্তুগত সাক্ষ্য সংগ্রহ অনাগ্রহের কারণে ঘটনা উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। সিআইডির বিশেষ সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদের নেতৃত্বে ১২০ মামলার সমীক্ষা করা হয়। ওই সমীক্ষায় বলা হয়, এই ১২০ মামলা থানা থেকে সিআইডিতে আসতে সময় লেগেছে এক বছর চার মাস থেকে চার বছর পর্যন্ত। নিহত ১২০ জনের মধ্যে ৩৯ জনকেই খুন করা হয়েছে শ্বাসরোধে। অন্যদের মধ্যে দেশী অস্ত্রের আঘাতে ৬৩, গুলিতে আট, বিষ প্রয়োগে তিন এবং দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন সাতজন। সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, এসবের মধ্যে ৩৬ খুনের কোন কারণ উদ্ঘাটন করতে পারেনি সিআইডি। এর বেশিরভাগই শ্বাসরোধের মাধ্যমে খুন করা হয়েছে।

মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও সামাজিক সেবা শাখার উপকমিশনার জনকণ্ঠকে জানান, আইন অনুযায়ী সুরতহাল প্রতিবেদনে লাশের পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিভিন্ন দিকের বর্ণনা থাকতে হয়। শরীরের কোন্ অঙ্গটি কিভাবে পাওয়া গেছে। কোন আঘাত বা দাগের চিহ্ন আছে কি না। এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। এখানে মৃত ব্যক্তি কেমন ছিল। কী ধরনের আচরণ। এমন কথা উল্লেখের সুযোগ নেই।

ডিএমপির ৪৯ থানার হত্যা, আত্মহত্যা, সড়ক দুঘর্টনায়সহ ২০১৩ সালের পুলিশের সুরতহাল করতে হয়েছিল দুই হাজার ৮৬৯ মামলার আর গেল বছর এই সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছিল। অর্থাৎ রাজধানীর কোন না কোন থানায় এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। কেবল ঢাকাতে দিনে গড়ে সাত থেকে আটটি মামলার সুরতহাল করতে হচ্ছে পুলিশকে। সারাদেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর এই সংখ্যা আরও বেশি। সঙ্গত কারণে পুলিশ যতœশীল না হলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবেন এটা স্বাভাবিক।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডাঃ মোঃ হাবিবুজ্জামান চৌধুরী জনকণ্ঠকে জানান, অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাটি ধামাচাপা ও ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য সুরতহাল প্রতিবেদন ঠিকমতো লেখেন না। অনেক পুলিশ অতি উৎসাহিত হয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মামলাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালায়। ভুক্তভোগীরা থানায় গেলে মামলা নেয় না। তিনি জানান, পুলিশের গাফিলতির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ও আত্মহত্যার মৃত্যুর কথা বলে অনেক মৃতদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিয়ে যাচ্ছে তাদের পরিবার। অথচ এগুলোর মধ্যে আঘাতজনিত মৃত্যু (হত্যার ঘটনা) রয়েছে। পুলিশ মৃতদেহগুলোর শরীর ঠিকমতো পরখ করলে এই ঘটনাগুলো ধরা পড়তে পারত। মামলাগুলো হত্যা মামলা হতে পারত।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: