১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

আসছে কৃত্রিম বুদ্ধির খেলনা


ডমেনিক বাসুস্ত

কৃত্রিম বুদ্ধি ইতোমধ্যে চিকিৎসা থেকে শুরু করে নির্মাণ প্রযুক্তি পর্যন্ত বহু জায়গায় নিজের স্থান করে নিয়েছে। এখন খেলনা শিল্পেও আসছে। বাচ্চারা তাদের খেলনার সঙ্গে খেলবে, কথা বলবে, ভাবের আদান-প্রদান করবে।

খেলনা শিল্পের পুরোধা প্রতিষ্ঠান ম্যাটেলসহ বেশকিছু কোম্পানি তাদের পণ্যে কৃত্রিম বুদ্ধির প্রয়োগ ঘটাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিযুক্ত যে খেলনাটি এখন সাড়া জাগিয়েছে তাহলো ম্যাটিলের ‘হ্যালো বারবি’ নামে একটি পুতুল। পুতুলটি কৃত্রিম বুদ্ধির একটি ‘প্ল্যাটফর্ম দ্বারা চালিত সেটি উদ্ভাবন করেছে টয়টক নামে সানফ্রানসিসকোর একটি কৃত্রিম বুদ্ধি বা এআই কোম্পানি। ধারণা করা হচ্ছে এবারের বড়দিনের ছুটিতে এই পুতুলটি খেলনার সামগ্রীর মধ্যে দারুণ হিট করবে।

বারবি টয় সেই ১৯৫৯ সাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে। কোনটি মিউজিক থাকে, কোনটি ছড়া বলতে ও গান গাইতে পারে। কিন্তু ‘হ্যালো বারবি’ সেই বারবি ডল নয়, এখানে পাঁচমিশালী প্রযুক্তির সমাবেশ আছে। এমনকি ওয়াইফাই ও ভয়েস রিকগনিশন সফটওয়্যারও আছে। কথাবার্তা বা সংলাপ রেকর্ড করার পণ্য এতে আছে মাইক্রোফোন। ওয়াইফাই সেইসব কথাবার্তা ও সংলাপকে কম্পিউটার সার্ভারে পাঠিয়ে দেয়। কণ্ঠস্বর শনাক্তকরণ সফটওয়্যারের কাজ হচ্ছে শিশুটি এ মুহূর্তে কি বলল, তা নির্ণয় করা। এলগোরিদমের কাজ হলো শিশুর কথার জবাবে কি বলতে হবে তা ঠিক করা। পুতুলটি এমন যে তা ৩ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৯ বছরের বালিকা পর্যন্ত খেলতে পারবে। এলগোরিদমে সেটিকে মাথায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে শিশু ও বারবি ডলের মধ্যে কথাবার্তার আদান-প্রদান ২০০ পর্যন্ত হতে পারে। শিশু হয়ত জিজ্ঞেস করবে : ‘গেম খেলতে চাও’ হ্যালো বারবি সম্ভাব্য ৮ হাজার জবাবের একটি বেছে নিয়ে হুবহু শিশুর সংলাপের মতো করে শিশুকে উত্তর দেবে। কোন প্রশ্নের যদি জবাব দেয়া না যায় তাহলে একটা কলব্যাক করা হবে। অর্থাৎ এমন এক জবাব দেয়া হবে যা যে কোন পরিস্থিতিতে নিখুঁতভাবে খেটে খায়। যেমন ‘তাই উপায় নেই’। কথোপকথনের সময় হ্যালো বারবি অতীত থেকে সংলাপের বিষয়গুলো মনে রাখবে। মনে রাখবে সেই শিশুটির ভাইবোন আছে কিনা, থাকলে কটি আছে কিংবা তারা শেষবার কখন খেলেছিল? এ ধরনের বারবি ডলের সঙ্গে খেলার সময় শিশুটির বোঝার চেষ্টা করার অবকাশ থাকে না বারবিটি মানুষ না অন্য কিছু।

এলিমেন্টাল পাথ নামে একটি কোম্পানি আইবিএম ওয়াটসন সফটওয়্যার দ্বারা চালিত কগনি টয়েজ গ্রীন ডাইনো নামে একটি খেলনা বের করেছে যা বাচ্চাদের সত্যিকারের কথোপকথনে নিয়োজিত রাখে। একই কৌশল অবলম্বন করে কোম্পানি পাঁচ বছরের বাচ্চাদের জন্য টকিং ডাইনোসর বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা নিয়েছে যার থাকবে আইবিএম ওয়াটসনের কগনিটিভ কম্পিউটিং ক্ষমতা এবং সেটা ওয়্যারলেস ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে। এ খেলনাটি এমন সব প্রশ্নের উত্তর বের করতে ও দিতে শিখবে যে প্রশ্নোত্তরগুলো শুরু থেকে ওই খেলনার মধ্যে প্রোগ্রাম করা নাও থাকতে পারে। কগনিটয়েজ গ্রীন ডাইনোর প্রচারমূলক ভিডিওতে আইবিএম ওয়াটসনের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ক্ষমতা কতখানি তা দেখতে পাওয়া যাবে। বাচ্ছারা খেলনা ডাইনোসরকে জিজ্ঞেস করতে পারে। ‘চাঁদ আমাদের থেকে কত দূরে?’ কিংবা প্রশ্ন করতে পারে ‘আলোর গতি কত? ওয়াটসন শক্তিচালিত কৃত্রিম বুদ্ধির ইঞ্জিনটা তখন প্রশ্ন বা প্রশ্নগুলো প্রসেস করে উত্তর বের করবে এবং শুধু বের করবে না, উপরন্তু উত্তরগুলোকে শিশুর বয়স ও বিকাশের স্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে পরিবেশন করবে। একবার ভাবুন তো দেখি এমন এক খেলনা ডাইনোসর যা আপনার সন্তানের কথা বলার সঙ্গী এবং শুধু সঙ্গীই নয় বোধশক্তি পর্যন্ত আছে।

স্মার্ট খেলনা তো কত রকমই আছে। তারপরও কগনিটয়েজ গ্রীন ডাইনো বা হ্যালো বারবির একটা মৌলিক পার্থক্য আছে ওসব খেলনার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধি এবং বাক শনাক্ত করার যন্ত্রের বদৌলতে কগনিটস ও বারবি ডল কথাবার্তা বুঝতে পারে, বুদ্ধিদীপ্ত জবাব দিতে পারে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সাড়া দিয়ে অনেক কিছু শিখতে পারে। তাদের এই ক্ষমতাই অন্য খেলনাগুলোর সঙ্গে অসাধারণ পার্থক্য রচনা করেছে। এর মধ্য দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধির জগতে সম্পূর্ণ নতুন একটা ব্যাপারও ঘটে যাচ্ছে। বোধশক্তিসম্পন্ন এসব খেলনার মধ্য দিয়ে গবেষকরা সম্পূর্ণ নতুন শ্রেণীর জিনিস তৈরি করছেন সেগুলো মানুষের তুলনায় হীনতর তবে মেশিনের তুলনায় শ্রেয়তর বা তার চেয়ে বেশি কিছু।

এমআইটির শেরী টার্কল ‘রিক্লেইমিং কনভারসেশন : দি পাওয়ার অব টক ইন ডিজিটাল এজ’ নামক এক নতুন গ্রন্থে বলেছেন, সমাজ হিসেবে আমরা এক রোবোটিক মুহূর্তের মধ্য দিয়ে চলেছি। আমরা আর আশা করি না যে কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন মেশিনগুলো পুরোদস্তুর মানুষে পরিণত হবেÑ যতক্ষণ পর্যন্ত ওগুলো অন্যভাবে পুষিয়ে দিতে পারছে। ব্যাপারটা এই নয় যে আমরা সত্যিই এমন মেশিন আবিষ্কার করেছি যা কোন না কোন আকারে বা রূপে আমাদের নিয়ে ভাবে বা ভালবাসে। বরং ব্যাপারটা হলো আমরা একথা বিশ্বাস করতে প্রস্তুত যে ওরা সত্যিই আমাদের ভালবাসে ও আমাদের নিয়ে ভাবে। আমরা তাদের সঙ্গে খেলা করতে প্রস্তুত।’ হ্যালো বারবি বা কগনিটয়েজ গ্রীন ডাইনোর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিযুক্ত খেলনাগুলো সে ধরনের খেলা খেলনার প্রতিশ্রুতি বহন করে। এ জাতীয় অন্যান্য খেলনা আরও বাস্তবানুগ হতে পারে। সেগুলো শুধু কণ্ঠস্বর চিনতে পারা ও উত্তর দেয়ার কাজে সীমাবদ্ধ থাকবে না, আরও বেশিকিছু করবে। এগুলোতে থাকবে অত্যাধুনিক সেন্সর যা দিয়ে সুনির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গি বা মুখের অভিব্যক্তিও বুঝাতে পারবে খেলনাটি। যেমন গত মাসে গুগল ইন্টারনেটযুক্ত টেডি বিয়ারের একটা পেটেন্ট প্রকাশ করেছে। এতে সেন্সর, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও ওয়্যারলেস ইন্টারনেট সংযোগ থাকবে। পেটেন্টে গুগল বলেছে যে, রোবোটিক টেডি বিয়ার ঘরের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। একটা সুশিক্ষিত পোষা প্রাণীর কাছ থেকে যে ধরনের আচরণ আশা করা যায় তেমন আচরণ পাওয়া যাবে এসব খেলনার কাছ থেকে।

অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিযুক্ত এই খেলনাগুলোর নেতিবাচক বা খারাপ দিক যে একেবারে নেই তা নয়। যারা প্রাইভেসি নিয়ে মাথা ঘামান তারা বলেন, এসব খেলনা নিয়ে সমস্যাও আছে। যেমন হ্যালো বারবিতে ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রাইভেসির অধিকার লঙ্ঘিত হতে পারে। আবার গুগল টেডি বিয়ার সম্পর্কে বিবিসির মন্তব্যÑ এ হলো গা ছমছম করানো ইন্টারনেট খেলনা যেটাকে স্টিভেন স্পিলনার্গের ২০০১ সালে ছায়াছবি ‘এআই’ এর সুপার টেডি বিয়ারের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এখানেই শেষ কথা নয়। ইদানীং ইন্টারনেটযুক্ত যে কোন জিনিসের বেলায় হ্যাকড হওয়ার সম্ভাবনা সর্বদাই থাকে। বিশেষজ্ঞরা এমন খেলনার ভাল-মন্দ দিকগুলো পাল্লায় মেপে বলেছেন এগুলো আসলে বাচ্চাদের জন্য ভাল নয়। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিযুক্ত খেলনা বাচ্চাদের খেলাধুলার বেলায় কল্পনাশক্তি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে পারে। এগুলো সর্বনেশে এই কারণে নয় যে এরা দুনিয়া ধ্বংস করে দিতে পারে। এগুলো সর্বনেশে এই দিক দিয়ে এসব খেলনা আমাদের চারপাশের মানুষ ও বস্তুরাজির সঙ্গে আমাদের মিথস্ক্রিয়ার রূপ ও প্রকৃতি আমূল বদলে দিতে পারে।