মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

পীর সাহেবের হুকুমাতে প্রেমের বিয়ে চলে না!

প্রকাশিত : ৩১ অক্টোবর ২০১৫

আরাফাত মুন্না ॥ ইডেন কলেজের মাস্টার্সের ছাত্রী নাবিলা। ঠাকুরগাঁও সদরের খানকা শরীফের পীর সাহেবের নাতনি। গত ১২ মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা কাজী অফিসে মুহাম্মদ নোমান হোসাইনের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তবে এখন নাবিলা-নোমানের সংসার হয়তো আর টিকছে না। কারণ নাবিলার পরিবার তাকে গত একমাস ধরে বাড়িতে আটকে রেখেছে অন্যত্র বিয়ে দেবে বলে। নোমান পারিবারিকভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করলেও কোন ফায়দা হয়নি। পীর সাহেব এলাকায় আইন করেছেন প্রেম-ভালবাসার বিয়ে চলবে না। খানকা শরীফ (ইসলাম নগর) এলাকায় ওই পীর সাহেবেরই হুকুমাত (আদেশ-নিষেধ) চলে। ওই এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনও নির্বিকার বলেই শোনা গেছে। নাবিলার স্বামী নোমান এখন পাগলপ্রায়। তাই বৃহস্পতিবার নাবিলার বিয়ে ঠেকাতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে তার দুই বান্ধবী। এই আবেদনের অনুলিপি আইন সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ও ব্লাস্টের ইমেইলেও পাঠানো হয়েছে।মানবাধিকার কমিশনে করা আবেদনে তারা জানিয়েছে, স্থানীয় এক ছেলের সঙ্গে নাবিলার পরিবার তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। আগামী ২ নবেম্বর বিয়ের দিন ঠিক করা হয়েছে বলে নাবিলা তাদের জানিয়েছে। এদিকে, নাবিলার স্বামী নোমান জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, তাদের বিয়ে এখনও টিকে আছে, তাদের মধ্যে কোন প্রকার বিভেদ নেই। তার পরও তার স্ত্রীকে আবার বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হলে তা অবৈধ হবে। প্রয়োজনে নাবিলার পরিবারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে নোমান জানিয়েছেন।

আইনজ্ঞরা জানিয়েছেন, স্বামীর সঙ্গে যদি কারও ছাড়াছাড়ি না হয়, তাহলে তাকে দ্বিতীয় বার বিয়ে দেয়া যাবে না। এ বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ও আছে। মানবাধিকার কমিশনে দেয়া আবেদনে নাবিলার দুই বান্ধবী বলেছেন, নাবিলার স্বপ্ন ছিল পড়া শেষ করে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করবে। নাবিলা বেসরকারী কলেজ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে সে দু-একটি কলেজে চেষ্টাও করেছে। স্বামী নোমানও নাবিলার শিক্ষকতা পেশায় নিয়োগের ইচ্ছায় উৎসাহ যুগিয়েছেন।

মানবাধিকার কমিশনে করা আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নোমানের সঙ্গে বিয়ের বিষয়টি জানার পরেই নাবিলার পরিবার তাকে বাড়িতে নিয়ে যায়। তার পর থেকেই তাকে অন্যত্র বিয়ে দেবার জন্য উঠেপড়ে লাগে। তবে নাবিলা ওই বিয়েতে রাজি না হওয়ায় তিনবার আকদ করানোর চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। পরে নাবিলা দুইবার বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করলেও পরিবারের সদস্যরা তাকে আটকে ফেলে। আবেদনে আরও বলা হয়, নাবিলাকে কড়া প্রহরায় রাখতে ঠাকুরগাঁও শহরের পীর সাহেবের মহল্লাসহ আশপাশের এলাকায়ও প্রহরা বসানো হয়েছে। পীরবাড়ির এই কন্যা ইডেন কলেজের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছেন। তবে ভাইবা এখনও বাকি। বৃহস্পতিবার মানবাধিকার কমিশনে দেয়া চিঠিতে দুই বান্ধবী দাবি করেছেন, আমরা জানতে পারি, সে কোনভাবেই এই বিয়েতে রাজি না। তাকে জোরপূর্বক এই বিয়ে দেয়া হচ্ছে। এই অবস্থায় তাকে এই জোরপূর্বক বিয়ের হাত থেকে বাঁচাতে আপনার সদয় পদক্ষেপ কামনা করছি। চিঠিতে আরও বলা হয়, যে মানুষটার সঙ্গে নাবিলাকে সারা জীবন কাটাতে হবে, সেই মানুষটা কে হবে, সেটা ঠিক করার অধিকার তাকেই দেয়া হোক। তার মত প্রকাশের সুযোগ দেয়া হোক। বন্দীদশা থেকে গিয়ে বিয়ে নয়, মুক্ত অবস্থায় থেকে যেন নাবিলা নিজের জীবনের এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেই সুযোগ তাকে দেয়া হোক।

ওই আবেদনে আরও বলা হয়, আমরা এত ঘনিষ্ঠ বান্ধবী, আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। এর মাঝে গত ১৪ অক্টোবর পরিবারের কড়া প্রহরায় নাবিলা কলেজ ক্যাম্পাসে আসে। সেখানে নাবিলাকে করা সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছে, তার মা ও অন্য স্বজনরা। সে কোন প্রশ্নের জবাবও দিতে পারেনি। দ্রুততার সঙ্গে কাজ সেরে ১০ মিনিটের মধ্যে তারা কলেজ এলাকা ত্যাগ করে। পরে জানতে পারি, গেটেও তাকে কড়া প্রহরার মাঝে রাখা হয়েছে। আবেদনে আরও বলা হয়, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরসাহেব গোলাম নাকশাবান্ধ উলুব্বির ছেলে আব্দুল্লাহ আহমেদ উলুব্বি নাবিলার পিতা। একটি ধর্মীয় পরিবারে বড় হওয়ায় তাকে আমরা উদার, মননশীল মানুষ হিসেবে পেয়েছি।

এ বিষয়ে নাবিলার স্বামী নোমান হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা ভালবেসে বিয়ে করেছিলাম। আমাদের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ভালবাসা এখনও পূর্ণমাত্রায় অটুট আছে। তিনি বলেন, এরপরও তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই, নাবিলা আমাকে ত্যাগ করতে চায় তাহলে এই সিদ্ধান্ত কেবল সেই নিতে পারে। কেউ চাপ দিয়ে সেটা করতে পারে না। কিন্তু তাকে তো জোর করে আটকে রাখা হয়েছে। তার সঙ্গে আমাকে যোগাযোগই করতে দেয়া হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, একটি বিয়ে বর্তমান থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ে বৈধ হতে পারে না। এরপরও কেউ যদি সেই পথে পা বাড়ায় আমি অবশ্যই আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করব। উল্লেখ্য, নোমান নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আলউয়ারপুর গ্রামের মাহমুদুল হাসানের ছেলে।

এ বিষয়ে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ফাওজিয়া করিম ফিরোজ জনকণ্ঠকে বলেন, এ ধরনের জোরপূর্বক বিয়ে দেয়া কখনই সম্ভব হবে না। কারণ দেশের প্রচলিত আইনের সঙ্গে সঙ্গে হাইকোর্টের একটি রায়ও রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে কারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাউকে বিয়ে দেয়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, এখানে আবার মেয়েটির একবার বিয়ে হয়েছে, তার স্বামীও আছে। এ বিষয়ে নাবিলার বাবা আব্দুল্লাহ আহমেদ উলুব্বির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে নাবিলার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে জনকণ্ঠের। তিনি বলেন, আমরা নাবিলাকে জোরপূর্বক বিয়ে দিচ্ছি না। নাবিলা এই বিয়েতে রাজি আছে। নাবিলার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি ফোন নাবিলাকে দিতে অস্বীকৃতি জানান। নাবিলার আগে বিয়ে হওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। নোমান নামের একটি ছেলের সঙ্গে নাবিলার সম্পর্ক ছিল জানতাম। তবে ওদের বিয়ে হয়নি বলেই জানি।

স্বামী বর্তমান থাকা অবস্থায় জোর করে বিয়ে দিলে আইনগত জটিলতায় পড়তে পারেন কি-না এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আইন আমরাও জানি। আমাদের আইন শেখাতে আসবেন না। আমরা নাবিলার বিয়ে দেব তাতে কেউ কোন সমস্যা করতে পারবে না।

প্রকাশিত : ৩১ অক্টোবর ২০১৫

৩১/১০/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: