মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৫ আশ্বিন ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

চট্টগ্রামে কুকুরের কামড়ের উপদ্রব ভ্যাকসিনের বদলে চলছে কুকুর নিধন

প্রকাশিত : ৩১ অক্টোবর ২০১৫

এম হুমায়ুন, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রামে বেড়েছে কুকুরের কামড়ের প্রকোপ। গত বছরের ১২ মাসে যে পরিমাণ মানুষ কুকুরের কামড়ের শিকার হয়েছিল এ বছর মাত্র নয় মাসেই ওই পরিমাণ মানুষ কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছে। কুকুরের কামড়ের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় জলাতঙ্ক রোগের আশঙ্কাও বেড়েছে। তবে যে হারে জলাতঙ্কের আশঙ্কা বেড়েছে সে অনুযায়ী কোন কর্মসূচী গ্রহণ করেনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। গত বছর কর্পোরেশনের উদ্যোগে নগরীর বেওয়ারিশ কুকুরগুলোকে ভ্যাকসিন প্রদান করলেও এবার তারা এ বিষয়ে কোন আগ্রহ দেখায়নি। উল্টো গত কয়েকদিনে কর্পোরেশনের লোকজন চট্টগ্রাম নগরীর বেশকিছু এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুর নিধন করেছে। অথচ নিধন না করে কুকুরকে ভ্যাকসিনেশনের আওতায় এনেই জলাতঙ্ক প্রতিরোধ সম্ভব বলে অভিমত বিশেষজ্ঞ মহলের।

গত রবিবার নগরীর জামালখান এলাকার প্রেসক্লাবের সামনে কর্পোরেশনের লোকজন তিনটি বেওয়ারিশ কুকুর নিধন করে। ওই দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মৃত কুকুরগুলো প্রেসক্লাবের সামনে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে বেওয়ারিশ কুকুর নিধনের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এসব বেওয়ারিশ কুকুর নিধন করায় সমালোচনার মুখে পড়েছে। নগরীর বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, জলাতঙ্ক রোগ থেকে মুক্তির জন্য বেওয়ারিশ কুকুর নিধনের প্রয়োজন নেই, কুকুরগুলোকে প্রি-এক্সপোজার ভ্যাকসিন দিলেই হয়।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি এ্যান্ড ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্টের প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুল আহাদ বলেন, ‘পরিবেশ অধিদফতরের করা রিটের প্রেক্ষিতে বেওয়ারিশ কুকুর নিধনের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে। তারপরও আমরা অন্যায়ভাবে কুকুর নিধন করে পরিবেশের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করছি। কুকুরকে টিকাদানের মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগ থেকে যেমন মুক্তি মিলবে তেমনি কুকুরও রক্ষা হবে।’ তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোঃ শফিউল আলম। তিনি বলেন, ‘কুকুর নিধনে আইনী নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই আমরা কুকুর নিধনের কর্মসূচী হাতে নেইনি। হয়ত কুকুরের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে লোকজন কুকুরগুলো মেরে ফেলছে। পরে সেগুলো সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা সরিয়ে ফেলছেন, যাতে পরিবেশ দূষণ না হয়।’

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জেনারেল হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৪ সালে এখানে কুকুর, বিড়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর কামড় খেয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন দুই হাজার ৩শ’ ৯৮ জন এবং চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন দুই হাজার ৩শ’ ৭৯ জন। শুধু কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন তিন হাজার ৯শ’ ৮৬ জন। ২০১৪ সালে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৩১ জন এবং ২০১৫ সালে আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৯শ’ ৫৫ জন।

এদের মধ্যে ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে চিকিৎসা নেন ১৫৬ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ১৮৬ জন, মার্চ মাসে ১৫৮ জন, এপ্রিল মাসে ১৭৯ জন, মে মাসে ১৪৪ জন, জুন মাসে ১২৯ জন, জুলাই মাসে ১৬৪ জন, আগস্ট মাসে ১৬৪ জন, সেপ্টেম্বর মাসে ২৪৪ জন, অক্টোবর মাসে ৩০০ জন, নবেম্বর মাসে ২৭৭ জন এবং ডিসেম্বর মাসে ২৯৭ জন।

২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে ২৫৩ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ১৯৫ জন, মার্চ মাসে ৩২২ জন, এপ্রিল মাসে ২২০ জন, মে মাসে ২৪১ জন, জুন মাসে ২৬৮ জন, জুলাই মাসে ২৭৩ জন, আগস্ট মাসে ৩৩৬ জন এবং সেপ্টেম্বর মাসে ২৭০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

ওই হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ২০১৪ সালে তিনজন জলাতঙ্কের শিকার হন। তিনজনই মৃত্যুবরণ করেন। চলতি বছর মাত্র একজন জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে শীতকালে জলাতঙ্কের প্রকোপ বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ সরফরাজ খান চৌধুরী বলেন, ‘জলাতঙ্ক মরণব্যাধি রোগ। এই রোগে আক্রান্ত কোন রোগী বেঁচে থাকে না। কুকুর, বিড়াল, শিয়ালসহ মাংসভোগী কিছু প্রাণীর মধ্য দিয়ে ভাইরাসটি মানুষের দেহে প্রবেশ করে। জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হলে ওই ব্যক্তির মৃত্যু অবধারিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রামে দিন দিন কুকুরের কামড়ের মাত্রা বাড়ছে। কুকুরের কামড়ের উপদ্রব বাড়ায় জলাতঙ্ক রোগের শঙ্কাও বাড়ছে। জনসচেতনতা ও বেওয়ারিশ কুকুরগুলোকে প্রি-এক্সপোজার ভ্যাকসিনেশনের মাধ্যমে এটি নিরাময় করা সম্ভব।’

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে মোট ১২ লাখের মতো কুকুর রয়েছে। এদের মধ্যে দুই লাখ ১২ হাজার ৪২১টি (১৭ দশমিক ২৯ শতাংশ) পোষ্য এবং ৯ লাখ ৯৫ হাজার ৬৭টি (৮২ দশমিক ৭০ শতাংশ) বেওয়ারিশ। জলাতঙ্ক রোগে প্রতি বছর গড়ে দুই হাজার মানুষ এবং ২৫ হাজার গবাদিপশুর মৃত্যু হয়।

পাবলিক হেলথ বিভাগের ওই পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, দিন দিন কুকুরের কামড়ের রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সালে কুকুরের কামড়ের চিকিৎসা দেয়া হয় ৪৩ হাজার ২৫৯ জনকে এবং জলাতঙ্ক রোগী ছিল ১০৪ জন। ২০১১ সালে চিকিৎসা দেয়া হয় ৪৫ হাজার ৫৩৬ জনকে এবং জলাতঙ্ক রোগী ছিল ১০৯ জন। ২০১২ সালে চিকিৎসা নেয় ৯৭ হাজার ৩১০ জন এবং জলাতঙ্ক রোগী ছিল ৮৮ জন। ২০১৩ সালে মোট চিকিৎসা নেয় ৮৬ হাজার ৬৯৬ জন এবং জলাতঙ্ক রোগী ছিল ৮৬ জন।

২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিন বছরে মোট কুকুরের কামড়ের চিকিৎসা নেয় দুই লাখ ৭২ হাজার ৮০১ জন এবং জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয় ৩৪৭ জন। চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আবদুল হাই বলেন, ‘প্রতি ১০ মিনিটে বিশ্বে একজন লোক জলাতঙ্কে মারা যায়। পৃথিবীতে যে পরিমাণ মারা যায় তার ৯০ শতাংশ ঘটে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশসমূহে। এখানে শিশু ও নারীদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বেশি।’ তিনি আরও বলেন, ‘কুকুর আমাদের শত্রু নয়, বন্ধু। কুকুর আমাদের পরিবেশ রক্ষা করে। ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকার আওতায় আনা গেলে জলাতঙ্ক নির্মূল করা সম্ভব।’

প্রকাশিত : ৩১ অক্টোবর ২০১৫

৩১/১০/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: