২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ফণীভূষণ মজুমদার


অগ্নিযুগের বিপ্লবী ফণীভূষণ মজুমদারের আজ ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিনে (৩১ অক্টোবর) তিনি পরলোকগমন করেন। ব্রিটিশ-ভারত, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ- এই ত্রিকালজুড়ে রাজনৈতিক ভুবনে প্রবল পদচারণা ছিল ফণীভূষণ মজুমদারের। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন তখন বিশ্বাসঘাতক ও ষড়যন্ত্রকারী এবং সামরিক-স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুর রোষানলে নিপতিত ছিল। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগসহ তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং অন্যান্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক অসংখ্য নেতাকর্মী ছিলেন ঘরছাড়া, কেউবা কারান্তরীণ। ফণীদাকেও ১৯৭৭ সালে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে সামরিক-স্বৈরাচার। হাইকোর্টের আদেশবলে ১৯৭৮ সালে তিনি মুক্তিলাভ করেন। জেলের ভেতরে কি বাইরে সে সময় দলের অন্যতম মূলনীতি নির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদকে। পিপিআরের অধীনে সীমিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠন, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের দেখভাল করা, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনে কমিটি গঠন, ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ১৯৭৯ সালে সংসদ নির্বাচন এবং ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন- এসবের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে ফণীদার ইতিবাচক ভূমিকা দলের ভেতরে এবং দলীয় গণ্ডি পেরিয়ে তাঁকে জাতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। তিনি সবার কাছে হয়ে ওঠেন প্রিয় মানুষ আর প্রিয় ফণীদা।

‘ফণীভূষণ মজুমদার স্মৃতি সংসদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং অধুনা নারী জাগরণের মূর্ত প্রতীক বেগম সুফিয়া কামাল তাঁর এক সংক্ষিপ্ত লেখায় বলেন, ‘ফণীভূষণ মজুমদার ছিলেন একজন হৃদয়বান সত্যনিষ্ঠ ও কর্তব্যপরায়ণ মানুষ। তাঁর আড়ম্বরহীন জীবনযাপন, অথচ দেশকে ভালবেসে তিনি দেশের মঙ্গল কামনায় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে এগিয়ে এসেছেন শাসক-শোষকের বিরুদ্ধে। তাঁর সমস্ত জীবনই ছিল এক আদর্শের অনুবর্তিতায়, নিজের দেশকে, নিজের ঐতিহ্যকে রক্ষা করে তিনি স্বকীয় মর্যাদা রক্ষা করেছেন। মনে-প্রাণে তিনি ছিলেন বাঙালী। তাঁর চালচলন, পোশাক-আশাক এবং জীবনযাপনের মধ্যে ছিল নিজস্ব সত্তার বলিষ্ঠ পরিচয়। কর্মজীবন তাঁর ছিল ন্যায়নিষ্ঠ, নির্ভীক দৃঢ়, সততায় সমুজ্জ্বল। সদাহাস্যময় সহৃদয় সেই মানুষকে আমরা চিরদিন স্মরণ করব। তাঁর আদর্শ গ্রহণ করে আমাদের দেশের মানুষ কর্মী, দেশপ্রেমিক হয়ে উঠবে এই আশা করব।’

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অগ্রজতুল্য অগ্নিযুগের বিপ্লবী পঞ্চানন চক্রবর্তী বয়সে ফণীদার চেয়ে বছর দুয়েকের বড় হলেও বেঁচে ছিলেন ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত। ১৯৮৪ সালে ফণীদার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণিকা প্রকাশের কথা জানালে তিনি ‘ফণী : জেলে জেলে’ শিরোনামাঙ্কিত যে প্রবন্ধটি লিখে পাঠালেন তাতে দুর্ভল তথ্যাবলী দেখে সবাই তাজ্জব বনে গেলেন। প্রবন্ধের উপ-শিরোনামগুলো ছিল- ‘ফরিদপুর জেল, ১৯৩০’, ‘বক্সাদুর্গ, ১৯৩২’ এবং ‘দেউলি বন্দীনিবাস, ১৯৩৭’। শিরোনাম এবং উপ-শিরোনামগুলোই বলে দেয় এই দুই বিপ্লবী একসঙ্গে কতটা বছর বিভিন্ন কারাগারে বন্দী ছিলেন। এখানে অংশবিশেষ উল্লেখ করা হলো মাত্র। ইংরেজ সৈনিকদের পরিত্যক্ত কলকাতায় আলীপুরের বক্সাদুর্গে ১৯৩২ সালে কারাবন্দী থাকা অবস্থায় যুগান্তর এবং অনুশীলন দলের সদস্যদের মধ্যে ছলচাতুরি ও রেষারেষিতে ফণীদার সর্বজনীন ভূমিকা সম্পর্কে বলতে গিয়ে পঞ্চানন চক্রবর্তী লিখেছেন- ‘এই ছলনার খেলায় সকলেই সাবধানে পা ফেলিয়ে চললেও ফণী যেন সকল পর্দা তুলিয়া দিয়া সকলের আপন হইয়া গেল। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সকল শাখা মনে ও কর্মে এক হলেও পরিচয়ের অবয়বে ছিল ভিন্ন। সে ব্যবধান ভাঙ্গিয়া সহসা ফণী সকলের আপন হইয়া গেল। যুগান্তর নেতা মহলে ফণীর আদর হইতেই পারে কিন্তু অনুশীলন নেতাদের আসরেও ফণীর খাতির বেশ জমিয়া উঠিল। বিদ্রোহী নেতা প্রতুল ভট্টাচার্য জিজ্ঞাসা করিলেন পঞ্চাননবাবু- ব্যাপার কি বলুন ত, ফণীবাবুর হালচাল কেমন কেমন ঠেকছে না?’ তাছাড়া, পঞ্চানন চক্রবর্তী এবং ফণীদা ১৯৩৭ সালে রাজস্থানের মরুভূমিতে অবস্থিত দেউলী বন্দীনিবাসে একসঙ্গে কারাবন্দী থাকা অবস্থায় এক ইংরেজ কর্নেলকে চাকরি থেকে ইস্তফা দেয়ার ঘটনা বর্ণনায় পঞ্চানন চক্রবর্তী লিখেছেন- ‘বাংলার বহরমপুর বন্দীনিবাসের কর্তা ছিল কর্নেল টবিন। উগ্র আবাসিকদের ঠেঙ্গাইয়া কীর্তি অর্জন করিয়াছিল। সুতরাং দেউলী বন্দীদের সম্ভাব্য উষ্ণতা শীতল করিতে প্রমোশন পাইয়া আসিল কর্নেল টবিন। তাহার অফিসে প্রতিনিধিদের বসিতে চেয়ার দেয়া লইয়া বিতণ্ডার শুরু। সে দিন কথায় কথায় কর্নেল টবিন বলিয়া ফেলিল- তোমরা এখানে শিক্ষিত ও ভদ্র মানুষ কিন্তু বহরমপুরের ওসব গেঁয়া ও গোঁয়ার। ফণী সাপের মতই ফণী তোলার ভঙ্গিতে দাঁড়াইয়া বলিল- এই মুহূর্তে তোমার মন্তব্য প্রত্যাহার কর। পাঁচ নম্বর ক্যাম্পের প্রতিনিধি আমিও উপস্থিত ছিলাম সেইখানে। খুশী হইলাম। কর্নেল টবিন কথা প্রত্যাহার করিল না। চাকরিতেই ইস্তফা দিয়া চলিয়া গেল।’ পঞ্চানন চক্রবর্তী তাঁর প্রবন্ধ শেষ করেছেন এই বলে- ‘ফণী তেজে ব্যক্তি মর্যাদা, দুঃসাহসে সহকর্মীদের মর্যাদা এবং সংগ্রামী নির্দেশে জাতির মর্যাদা উঁচাইয়া ধরিল। নেতৃত্বের এইত আবাহন। এই আমাদের ফণী।’

আওয়ামী লীগের প্রাক্তন প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন ফণীদা’ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছেন। বলে নেয়া দরকার, পঁচাত্তরÑ পরবর্তী বাংলাদেশের মহাদুর্যোগপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের এক অনন্য রাজনৈতিক জুটি গড়ে উঠেছিল। সামরিক এবং বেসামরিক গোয়েন্দাদের চোখ এড়িয়ে সন্তর্পণে সাক্ষাতে পরামর্শ, ফোনালাপ এবং বার্তাবাহক মারফত যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁরা বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। ঘাতকের বুলেট আর বেয়োনেটের নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত তৃষিত স্বামীহত্যার রাজনৈতিকভাবে বদলা নিতে সে সময় সদ্য রাজনীতিতে পা রাখা সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন তাঁর পরামর্শদাতাকে সঠিকভাবেই খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই খুব কাছে থেকে দেখা ফণীদাকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক লেখা প্রবন্ধের এক জায়গায় তিনি বলেছেন- ‘অকুতোভয় ফণীভূষণ মজুমদারের আদর্শের প্রতি ছিল ইস্পাত কঠিন আনুগত্য। দেশ ও জনগণকে তিনি সব কিছুর উর্ধে স্থান দিয়েছেন। জাতির চরম ক্রান্তিলগ্নে বার বার মনে পড়ছে মহান ফণীভূষণ মজুমদারকে। অতীতে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনই তাঁর মোহনীয় ব্যক্তিত্ব কাজ করেছে প্রদীপ হিসেবে। ১৯৭৭ সালে আওয়ামী লীগের আহ্বায়িকার দায়িত্বে থাকাকালীন সেই সময়গুলোতে কাছে থেকে ফণীদার দৈনন্দিন রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্মের নিরলস ভূমিকা চোখে দেখার এবং উপলব্ধি করার আমার সৌভাগ্য হয়েছিল। যাঁর প্রতিটি কাজের সঙ্গে এক গভীর দেশপ্রেমবোধ সদাজাগ্রত থাকত।’

ফণীভূষণ মজুমদারের মতো ত্যাগী, নিরহঙ্কারী, সৎ, নিষ্ঠাবান, আত্মপ্রচারবিমুখ, আদর্শবান, নির্ভীক এবং দেশ ও জনদরদী এক মহান বিপ্লবী জননেতার অভাবের কথা আজও বার বার স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই তো মৃত্যুর পরও তিনি যুগ যুগ বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন।

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ

নহ.ধফযরশধৎু@মসধরষ.পড়স