২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

টিআইবির ট্রান্সপারেন্সির ওপর তদন্ত হওয়া দরকার


বাংলাদেশ যখন আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও বহির্বিশে^ সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে থাকে, তখনই একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র শুরু করে। নাশকতার পথ ধরে। এটি অনেক আগে থেকেই। বঙ্গবন্ধুর সময় হয়েছে। এখন বঙ্গবন্ধুকন্যার সময়ও হচ্ছে। এ পর্যন্ত যারা ক্ষমতায় এসেছে, গেছে, দেশের জন্য কিছু করতে পারেনি। করেছেন বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনাই। কারণ তাঁরা সঠিক দিকনির্দেশনায় রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তাই দেশ-জাতি এগিয়ে গেছে।

বাংলাদেশ এখন চাল রফতানি করছে। এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কায় এক লাখ টন চাল রফতানি করেছে। মাছ উৎপাদনে এখন বিশে^ চতুর্থ। গলদা চিংড়ি, ইলিশ, বোয়াল, আইড়, ভেটকি বা কোরাল প্রভৃতি মাছ পশ্চিমা দুনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। বাংলাদেশের শাকসবজি এখন বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। আলুর ফলন বেড়েছে তিনগুণ এবং বিশে^ সপ্তম। অর্থাৎ দশমিক ৮৩ কোটি মেট্রিক টন। মাথাপিছু বছরে আলু খায় ২৩ কেজি করে। ধরনও পাল্টেছে। ভর্তা থেকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এবং চিপস চলছে দেদার। গার্মেন্টসে চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। গত বুধবার প্রথমবারের মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এবার জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং আগামী বছর তা ৬ দশমিক ৭ থেকে ৭ শতাংশ হতে পারে বলে আশা করা যাচ্ছে। পদ্মা সেতু চালু হলে ৯ শতাংশ হবে। মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। গড় আয়ু ৭০ এবং শিক্ষার হারও প্রায় অনুরূপ। অর্থাৎ মধ্য আয়ের দেশে পা রেখে খুব দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় কমিউটার ট্রেন চালু, একটার পর একটা ফ্লাইওভার নির্মাণ সমাপ্তির পর্যায়ে এনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিলেন আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন বা পাতাল রেল নির্মাণ করবেন। শেখ হাসিনা এখন চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থÑধরিত্রীর আদরের কন্যা। আমাদের অহঙ্কার।

সম্প্রতি টিআইবি তার বার্ষিক রিপোর্টে হতাশাব্যঞ্জক কতগুলো তথ্য তুলে ধরেছে। সংস্থাটির এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর ড. ইফতেখারুজ্জামান বর্তমান পার্লামেন্টকে বলেছেন ‘পুতুল নাচের নাট্যশালা।’ তার আগে একজন ইতালীয় ও একজন জাপানী নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। একজন ধর্মীয় যাজককে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। পুলিশ হত্যা করা হয়েছে। তারও আগে গার্মেন্টসের জিএসপি সুবিধা বাতিল করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের একজন সেলিব্রিটি তার আন্তর্জাতিক কানেকশনের সুযোগ নিয়ে এটি করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন। একই ভদ্রলোক পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ^ব্যাংকের অর্থায়ন প্রত্যাহারেও ভূমিকা রেখেছেন বলে ধারণা। পদ্মা সেতু অর্থায়ন চুক্তি বাতিলের ঘটনাটি খুবই অবাক করার মতো। সেতু নির্মাণে মূল কাজ নয় এমন একটি কাজে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। অর্থাৎ কানাডার একটি তদারকি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে দুর্নীতির গন্ধ আবিষ্কার করে অর্থায়ন প্রত্যাহার করা হয়। দেখা গেল, কিছু সংবাদ মাধ্যম ‘লাজে মরি’ বলে কোরাস গাইতে শুরু করল। পরবর্তীকালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করে তার কিছুই পেল না। এমনকি কানাডার আদালতেও দুর্নীতি প্রমাণ হলো না। অথচ দেশের একজন জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন কেবল নির্বাচিত এমপি ও মন্ত্রী পদই হারালেন না, সামাজিকভাবে অপদস্থ-অপমানিত হলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়- ‘অপরাধী জানিল না কি বা অপরাধ তার, বিচার হইয়া গেল’। আজ প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে যে সব পত্র-পত্রিকা বা টেলিভিশন ‘আহা বেশ বেশ বলে গান গেয়েছিল’ তারা কি একজন সম্মানিত জনপ্রতিনিধির মান ফেরত দিতে পেরেছে, না পারবে? এখানেই আমরা বলি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দায়িত্বহীনতা নয়। কিংবা সাংবাদিকতা এ্যাডভেঞ্চারিজমও নয় যে, এ নিয়ে পাগলামো করা যাবে। না, করা যাবে না। ভিত্তিহীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রিপোর্ট প্রথম পাতায় ছেপে পরে রিজয়েন্ডার বা প্রতিবাদ ভেতরে এক কোণে বিজ্ঞাপনের পাশে ছোট করে ছেপে দেয়াটাও হিপোক্রাসি। কেন হচ্ছে এসব? হচ্ছে এ জন্য যে, টাকাঅলা দুর্বৃত্ত এবং অসৎ দুর্নীতিবাজ আমলারা এখন রাজনীতির পাশাপাশি মিডিয়া জগতেও প্রবেশ করেছে, করছে। ক্ষমতার জোরে খাস জমি বা পরিত্যক্ত হিন্দুদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখল করছে সেই একই দুবর্ৃৃত্ত। এদের কেউ কেউ আবার এমপি, ক্ষমতাসীন দলের নেতা। কম দুঃখে বন্ধু ওবায়দুল কাদের (সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী) বলেননি যে, ঐড়ি পধহ ধ পড়ঁহঃৎু ৎঁহ রভ ষধসিধশবৎং নবপড়সবং ষড়ি নৎবধশবৎং (ডেইলি স্টার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৫) অল্প কিছু দুর্নীতিবাজ খারাপ নেতাকর্মীর অপরাধ এবং অপরাধ প্রবণতার দায় বইতে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। যে মানুষটি একজন শুদ্ধ মানুষ, শুদ্ধ নেতা এবং শুদ্ধতম মেধাবী সাহসী দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক এবং সত্যিকারের দেশনেত্রী-জননেত্রী। তাঁর তুলনা কেবল তিনি নিজেই। নেহাত যদি তুলনা করতেই হয় তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে করা যেতে পারে। অন্য কারও সঙ্গে নয়।

তাহলে একটা ব্যাপার পরিষ্কারÑ বাংলাদেশের ভালোটা যারা দেখতে চায় না, যাদের গা-জ¦ালা করে, গায়ে ফোসকা পড়ে, দেশে-বিদেশে তারাই ওইসব ষড়যন্ত্র করে চলেছে। লন্ডনে বসে মা-বেটা কি করছেন, টিআইবির ইফতেখারের বাপ-দাদার পরিচয় কি, তা দেখা দরকার। খোঁজ নিলে হয়ত মির্জা ফখরুলের ঠিকুজির মতো কোন রাজাকার চখা মিয়ার নাম সামনে আসতেও পারে।

আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, পার্লামেন্ট ও সরকার সম্পর্কে অসম্মানজনক এবং আপত্তিকর মন্তব্যের জন্য টিআইবিকে ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় ব্যবস্থা নেয়া হবে। মোহাম্মদ নাসিম বাড়িয়ে কিছু বলেননি। যে কোন নাগরিক সরকারের সমালোচনা করতেই পারেন, তবে তা হতে হবে সভ্য রাজনীতির ভাষায়। কিন্তু পার্লামেন্ট সম্পর্কে অসম্মানজনক মন্তব্য কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমি মনে করি আইনী ব্যবস্থা নেয়াই দরকার। অতীতেও আমরা দেখেছি অর্থনীতির প্রফেসর শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেলের ক্রেস্টটা হাতে করে দেশে ফিরেই বললেন, ‘রাজনীতিকরা দুর্নীতি পরায়ণ’। তারপর যা হবার হয়েছে। জিএসপি সুবিধা হারাতে হয়েছে, পদ্মা সেতুর অর্থায়ন ফিরে গেছে। সবচে’ বড় কথা বহির্বিশে^ বাংলাদেশের সম্মানহানি হয়েছে। তারপরও বাংলাদেশ থেমে থাকেনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডায়নামিক লিডারশিপে বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে, এরই মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। জিএসপি সুবিধা ছাড়াই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বিদেশে যাচ্ছে আগের মতোই।

আসলে বিষয়টা হচ্ছে প্রফেসর ইউনূস বলুন আর ইফতেখারÑ এরা একই পথের পথিক, যে পথটি চলে গেছে গুলশানের দিকে। হালে অবশ্য লন্ডনের দিকে। লন্ডনে এখন খালেদা-তারেক ছাড়াও জামায়াতের এক বড় নেতা ব্যারিস্টার রাজ্জাকসহ অনেকেই গা-ঢাকা দিয়ে আছে এবং প্রতিনিয়ত খালেদা-তারেকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। সেখান থেকে এ্যাডভাইস আসে, বাংলাদেশে একেকটা দুর্ঘটনা ঘটে।

এ অবস্থাটাকে মোটেই অবহেলা করা যাবে না। অবশ্য এরই মধ্যে ষড়যন্ত্রকারীদের মাথায়ও বাড়ি পড়তে শুরু করেছে। সর্বশেষে খালেদা জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা সাবেক পররাষ্ট্র সচিব যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শমসের মবিন চৌধুরী বিএনপি ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। পদত্যাগপত্রে তিনি শারীরিক অসুস্থতার উল্লেখ করলেও ওপেন সিক্রেটের মতো কে না জানে নানামুখী চাপের কারণেই তিনি বিএনপি ছাড়লেন। সবচে বড় চাপ হলো বিএনপি থেকে জঙ্গী শিবিরকে বের করতে না পারায়। একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এ মানসিক চাপটা দীর্ঘদিন ধরে তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। তার ওপর আরও যোগ হয় চলতি ২০১৫-এর প্রথম ৯২ দিন বিএনপি-জামায়াতের পেট্রোল বোমাবাজি তিনি গ্রহণ করতে পারেননি। বরং তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হলো পেট্রোল বোমা ও প্রাণহানির ব্যাপারটি বহির্বিশে^ তুলে ধরে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করাতে হবে। কিন্তু না, তিনি পারেননি। বরং দেখা গেছে, শেখ হাসিনার প্রতি বহির্বিশে^র সমর্থন সহযোগিতা আরও বেড়ে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন পরীক্ষিত বন্ধু রাশিয়া শক্তিশালী হয়ে আবারও বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। মস্কোতে হাসিনা-পুতিন বৈঠকও হয়েছে। শমসের মবিন চৌধুরীর কাছে এসব ষন্ত্রণা হয়ে দেখা দিয়েছিল। এর আগেও আমরা দেখেছি এক মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার জেনারেল শওকত আলী জামায়াত-শিবির ইস্যুতে পদত্যাগ করে পর্দার অন্তরালে চলে যান, দলে আর ফেরেননি। লেখক সাংবাদিক মানবাধিকার কর্মী শাহরিয়ার কবির সাম্প্রতিক বিদেশী হত্যার জন্য বিএনপির নেতার দায়-এর উল্লেখ করে বলেছেন, “সন্ত্রাসের ‘বড়ভাই’ বিএনপি হলেও ‘বাপ’ জামায়াত” (জনকণ্ঠ ৩০ অক্টোবর ২০১৫)। শাহরিয়ারের সঙ্গে আমি একমত যে, ২০০৯ সালের নির্বাচনে ওভার হুইলমিং মেজরিটি নিয়ে জয়লাভের পর শেখ হাসিনা যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করলেন তখনই জামায়াতের প্ররোচনায় খালেদা জিয়া সন্ত্রাসের রাজনীতির পথে নামেন। জামায়াত তাকে আশ^স্ত করেছে পুলিশ পেটানো থেকে শুরু করে জ¦ালাও-পোড়াও এবং পেট্রোল বোমাবাজির জন্য জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক ক্যাডার রয়েছে, যারা জঙ্গী তৎপরতার বাইরে মহাজোট সরকারকে উৎখাত করবে। এবারও যখন সাকা-মুজাহিদের চূড়ান্ত রায় হয়ে গেল এবং কার্যকর করার মঞ্চ বেশি দূরে নয় তখন খালেদা চলে গেলেন লন্ডন আর এদিকে একটার পর একটা হত্যাকা- ঘটে চলল। বিদেশী হত্যা করা হলো, গীর্জার যাজককে হত্যা করার চেষ্টা করা হলো। তাতেও যখন বিদেশীদের বিভ্রান্ত করা গেল না তখন বাংলাদেশ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বা টিআইবিকে মাঠে নামানো হলো। টিআইবি এবার বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু পার্লামেন্টকে আঘাত হানল।

বস্তুত টিআইবি যে উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল তা এখন আর নেই। টিআইবি এখন বিএনপি-জামায়াতের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত হয়েছে। নইলে খালেদা জিয়া যখন অতীতে পার্লামেন্টে ৫ বছরে মাত্র ১০ দিন উপস্থিত ছিলেন বা কোন স্ট্যান্ডিং কমিটিতে অংশ নেননি তখন কিন্তু টিআইবি এ ধরনের মন্তব্য করেনি। জনকণ্ঠের ২৯ অক্টোবরের প্রথম সম্পাদকীয়তে তাই তো প্রশ্ন তোলা হয়েছে- ‘আরেকটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দাবি করার টিআইবি কে? এ কথা বলার অধিকার তাকে কে দিয়েছে?’ কাজেই টিআইবি’র ট্রান্সপারেন্সির ওপর তদন্ত হওয়া দরকার।

ঢাকা- ৩০ অক্টোবর ২০১৫

লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব