২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শুদ্ধতম জ্ঞানসাধক


আব্দুর রাজ্জাক সম্পর্কে দেশে-বিদেশে বিস্তর লেখালেখি ও আলোচনা হয়েছে। দেশের আজ যারা মনীষী, বুদ্ধিজীবী ও আলোর পথের প্রদর্শক তাদেরও শিক্ষক এবং বাতিঘর ছিলেন তিনি। দেশসেরা বিশিষ্ট নাগরিক ও কবি-সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং অধ্যাপকরা শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন ও ঋণ স্বীকার করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বিভিন্নভাবে। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের স্নেহভাজন কবি-কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা তাঁকে ঘিরেই লিখেছেন ‘যদ্যপি আমার গুরু’ গ্রন্থ। সেখানে একটি চমৎকার চিত্র পাওয়া যায় তাঁর সম্পর্কে। একটু উদ্ধৃত করলেই পরিষ্কার একটা ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। ... ‘আমার মনে হল তাঁর বাক্য থেকে ঠিকরে মণিমুক্তো বেরিয়ে আসে। অতি সামান্য কথায়ও এমন তীক্ষè অন্তদর্ৃৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়, বিস্ময়ে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না। তাজমহলকে সামনে থেকে, পেছন থেকে, ডাইনে থেকে, বাঁয়ে থেকে যেদিক থেকেই দেখা হোক না কেনো দর্শকের দৃষ্টিতে ক্লান্তি আসে না, আরও দেখার পিপাসা জাগে। আমি রাজ্জাক সাহেবকে মনে মনে তাজমহলের সঙ্গেই তুলনা করতে থাকলাম। তাঁর ব্যক্তিত্বের এমন একটা সুন্দর সম্মোহন রয়েছে, তাঁর আকর্ষণ এড়ানো আমার পক্ষে অসম্ভব। ইন্টেলেকচুয়াল বিউটি তথা মনীষার কান্তি কী জিনিস আমাদের সমাজে তার সন্ধান সচরাচর পাওয়া যায় না। রাজ্জাক সাহেবের প্রতি প্রাণের গভীরে যে একটা নিষ্কাম টান অনুভব করেছি, ও দিয়েই অনুভব করতে চেষ্টা করি এথেন্স নগরীর তরুণেরা দলে দলে কোন্ অমৃতের আকর্ষণে সক্রেটিসের কাছে ছুটে যেত।’...

ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক খুশবন্ত সিংয়ের ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়ায় আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে এক সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে আব্দুর রাজ্জাকের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে বাঙালী জাতির বিকাশের বাহনে জ্বালানি হিসেবে তাঁর যে অবদান তা উল্লেখসহ বিশ্বমাপের জ্ঞানী-দার্শনিকের মর্যাদা দেওয়া হয়। তুলনা করা হয় গ্রিক দার্শনিক ডায়োজিনিসের সঙ্গে। শুধু জ্ঞানের আলোর মাধ্যমেই বাঙালীর ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করলেন বহির্বিশ্বে আব্দুর রাজ্জাক।

বৃত্ত ভাঙ্গার অধিনায়ক

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার নেপথ্যে তাঁর ভূমিকাকেই অগ্রগণ্য ধরা হয়। সে মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস অর্থাৎ উত্থানপর্ব আর তাঁকে এক করে দেখা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত ও মান উপযোগী করার তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টা কিংবদন্তি হয়ে রয়েছে। সেখানকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মননশীল জ্ঞানচর্চার একটি গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। সেই গোষ্ঠীর মধ্যমণি ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। সবার কাছে তিনি ছিলেন ‘মাথার ওপর জ্বলিছেন রবি’ হয়ে। একটি সুসভ্য জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে জ্ঞান ও গুণ প্রয়োজন তা ছিল তাঁর আয়ত্তে। তাঁর সংস্পর্শে যারা এসেছেন শুধু তাদেরই নয় পুরো জাতি যাতে এ মন্ত্রবলে বলিয়ান হয় সেই বীজ তিনি রোপণ করেছেন সুকৌশলে। সেই লক্ষ্যের অন্যতম উপাদান ছিল কুসংস্কারমুক্ত চিন্তার মুক্তি কিংবা মুক্তচিন্তা, সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আলোকিত মানুষ হওয়া। এই বীজ অঙ্কুরোদ্গম হয়ে এক সময় ফুল, ফল ও ফসলে পরিণত হয়েছে। যার সাক্ষ্য দিচ্ছে ইতিহাস।

গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকের পর বাঙালীর মধ্যে যে শিক্ষিত মুসলমান সমাজ গড়ে ওঠে তাদের একটি নতুন আশা-আকাক্সক্ষার জন্ম হয়। তখনকার বাস্তবতটা ছিল ভিন্ন। যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেটা মেনে নেয়া ও না নেয়ার ব্যাপারে দ্বিমত আছে এবং থাকবে; এটাই স্বাভাবিক। সেই বাঙালী মুসলমান সমাজের ধারক-বাহকদের চেতনার প্রবহমান পথযাত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে শাণিত, তীক্ষè ও ধীমান ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। তবে অবশ্যই রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, ধর্মের নামে কুসংস্কার চর্চার বিরুদ্ধে।

বাঙালীর রুশো বা ভলতেয়ার

ভারত ভেঙে পাকিস্তানের সৃষ্টি হয় দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। এই ভাঙচুরে যে দ্বিজাতি তত্ত্বের জয় হলো তা স্বীকার না করলে ইতিহাসের একটি সত্যকে অস্বীকার করা হয়। পাকিস্তান আন্দোলনে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সমর্থন ছিল। সে সমর্থন ছিল জোরালো। তিনি জিন্নাহর একজন অনুসারী ছিলেন। সে সময়ের বাস্তবতা তাকে এমনটা হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ‘যদ্যপি আমার গুরু’ থেকে আরেকটু উদ্বৃত করা যাক। শিক্ষক-ছাত্রের আলাপের মধ্যে একদিন শিক্ষক লাস্কিকে বলে ফেললেন, ...‘আই এ্যাম এ মেম্বার অব মুসলিম লীগ অ্যান্ড এ ফলোয়ার অব মি. জিন্নাহ।’... তবে কিছুদিন পরই তিনি অনুভব করতে পারেন যে পাকিস্তান তিনি চেয়েছিলেন সেই পাকিস্তান পাননি। বিশেষত ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র তার কাম্য ছিল না। দ্বিজাতি তত্ত্বের আশু মৃত্যু তিনি দেখতে পেলেন। দেখতে পেলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি ও পাহাড় সমান বৈষম্যের খ—গ। যে কারণে ভাষা আন্দোলনে তার স্বতঃস্ফূর্ততা বাঙালী জাতিকে ঋদ্ধ করে।

দিনের পর দিন পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বৈরী আচরণ তাঁকেও যে সংক্ষুব্ধ করে তা বলা বাহুল্য। পাকিস্তান আন্দোলনের এই মানুষটির মাথায় আসে পাকিস্তান থেকে পূর্ব বাংলাকে বিচ্ছিন্ন করার। নানা তথ্য-উপাত্ত, বক্তৃতা বা আলোচনার মাধ্যমে তিনি এ সত্যটাই তুলে ধরেন স্বাধীন জাতি ও দেশ গড়ার যাবতীয় উপাদান পূর্ববাংলার বাঙালীদের আছে।

ফরাসী বিপ্লবের কথা বিশ্ববাসী জানে। এর নেপথ্যে দুজন লেখক-দার্শনিক অনন্য অবদান রেখেছেন সে কথাও সুবিদিত। তাঁরা হলেন- রুশো ও ভলতেয়ার। বাঙালীর স্বাজাত্য-স্বাতন্ত্র্য আন্দোলনের নেপথ্যে তেমনি রাখলেন আব্দুর রাজ্জাক অনন্য সাধারণ ভূমিকা। তিনি প্রত্যক্ষ হতে চাননি। পরোক্ষে চিন্তা আর দর্শন দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলেন আন্দোলনের ধারা।

আন্দোলন এক সময় চরমের দিকে আগুয়ান, বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। সামনে চলে আসে বাঙালীর মুক্তির সনদ বা ম্যাগনাকার্টা বলে খ্যাত ছয় দফা। বঙ্গবন্ধু এই ছয় দফার মাধ্যমেই মূলত বাঙালী জাতিকে এক জায়গায় নিয়ে আসেন। এই ছয় দফার ব্যাপারটিও অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের মাথায় এসেছিল। মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মহান দার্শনিক, মনীষী আব্দুর রাজ্জাকের চিন্তাগত জায়গায় কী অপূর্ব সাযুজ্য!

রক্তের ধারাবাহিকতায় ’৬৯ পেরিয়ে বাঙালীর সামনে এসে দাঁড়ায় মাহেন্দ্রক্ষণ ১৯৭১ সাল। পৃথিবী কাঁপানো নয় মাসে বাঙালী ত্যাগ-তিতিক্ষার চরম পরাকাষ্ঠা দেখায়। ‘পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়’ কীভাবে জন্ম নেয় একটি জাতি, একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর অঙ্গুলি নির্দেশের দিকেও সমান দৃষ্টি। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে যান; সে অন্য গল্প, অন্য কাহিনী।

পরশপাথর ও মেলবন্ধন

বাঙালী মুসলমান সমাজে যখন মুক্তবুদ্ধির খরা তখন তিনি সেখানে উদারনৈতিকতার জল সিঞ্চনে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস পান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সে সময়ে যে চিন্তার মুক্তিতে এক প্ল্যাট ফরমে যারা এসে দাঁড়ান বা অগ্রগামী তাঁদের সাহচর্য তিনি পান। ‘বুধম-লী’ নামে অভিহিত এ গোষ্ঠীতে তিনি পান অগ্রজসম অধ্যাপক আবুল হুসেনকে। সহকর্মী ও সহমর্মী কাজী মোতাহার হোসেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ জ্ঞান ঘোষ, সত্যেন বোস, রমেশ মজুমদার, সুশীল দে, এফ রহমান, মাহমুদ হোসেন, বিএম গাঙ্গুলী দে, অমিয় দাশগুপ্ত, হরিদাস ভট্টাচার্যকে। এরপর তাঁর সঙ্গে বন্ধন ঘটে মোকারম হোসেন, নূরুল হুদা, মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম ও মুনীর চৌধুরী নামের আলোকিত মানুষদের। জয়নুল আবেদিন ছিলেন একান্ত কাছের বন্ধু।

অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন পরশপাথর। যার ছোঁয়ায় সব সোনা হয়ে যেত। তাঁর আকর্ষণশক্তি চুম্বককেও মানাত হার। জ্ঞানান্বেষী সব বয়সী মানুষই তাঁর আকর্ষণে জড়িয়ে যেতেন বন্ধনে। যারা তাঁর প্রভাবের বলয়ে আবদ্ধ ছিলেন তারা পরবর্তীকালে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও মুক্তজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন এবং এখনও তা অব্যাহত। আমাদের জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে, বিশেষত সামরিক শাসন, গণতন্ত্রহীনতা, স্বৈরশাসন, গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে স্বৈরাচারিতা, মৌলবাদের উত্থান, ধর্মব্যবসায়ীদের আস্ফালন, জঙ্গীবাদ ইত্যাকার নেতিবাচক পরিস্থিতিতে জাতির অন্যতম দিশারী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন পাশে। এখনও কারো কারো ভূমিকা সমানভাবে উজ্জ্বল। আব্দুর রাজ্জাকের ছোঁয়ায় যারা নিজেকে আলোকিত করেছেন তাদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে যাঁরা স্বমহিমায় ভাস্বর। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক রওনক জাহান, বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, আবুল মাল আবদুল মুহিত, ড. কামাল হোসেন, ড. হামিদা হোসেন, ওয়াহিদুল হক, অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক মোফাখ্খারুল ইসলাম, মফিদুল হক, হান্না পাপানাক, হুমায়ুন আজাদ, আহমদ ছফা, খায়রুল কবির, অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন, বদরুদ্দীন উমর, গুস্তাফ পাপানাক, সলিমুল্লাহ খান প্রমুখ।

ইতিহাসের মহানায়ক ও মনীষীর রসায়ন

বাঙালী জাতির পিতা, ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে আব্দুর রাজ্জাকের দর্শনে প্রভাবিত ছিলেন তার স্বাক্ষর রয়েছে ইতিহাসে, বিশেষত বাঙালী জাতির সংগ্রাম-আন্দোলন ’৪৮ পরবর্তী পর্বে। এই প-িতের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল অগাধ শ্রদ্ধা। মনীষী ও গুণীর মর্যাদা কীভাবে দিতে হয় তা তিনি জানতেন; সেভাবে কদরও করতেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালেই বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে জাতীয় অধ্যাপকের সম্মানে সম্মানিত করেন।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর আব্দুর রাজ্জাক মর্মাহত হন। তৎকালীন সরকার যখন খুনীদের পুরস্কৃত করতে ব্যস্ত, দেশ যখন পাকিস্তানী পথে পরিচালনা করছে কতিপয় বিশ্বাসঘাতক, তখন বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ যেন অপরাধে পরিণত হয়। ঠিক তখনই অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধুর প্রশংসায় হলেন উচ্চকিত। ‘বাংলাদেশ : স্টেট অব দ্য নেশন’ বক্তৃতায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি উচ্চারণ করেন ষোলবার। সাহসী মানুষকে নিয়ে নির্ভীক উচ্চারণ বটে।

বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন আর উচ্চারণ অনেকটা প্রবাদপ্রতিম হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, দেশপ্রেমকে টেনে যতটুকু বড় কর যায় তার সম্পূর্ণটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর মধ্যে। এক অনুপম দেশপ্রেমিক তিনি।

‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটিকে তিনি দার্শনিক ও আদর্শগতভাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেন- ... ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) একটি প্রতীক ছিলেন, আর তিনি একেবারে পরোক্ষ অর্থে যে প্রতীক ছিলেন, তাও না। তিনি অনেকটা দেখা দিয়েছিলেন এ-এলাকার মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার মনুষ্যমূর্তিরূপে, তাঁর মধ্যেই মানুষেরা নিজেদের আশা মূর্ত দেখতো।’... অন্যদিকে জাতির পিতা প্রসঙ্গে ওই আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ... ‘ওয়াশিংটনকে যখন বলা হয় আমেরিকার জাতির পিতা, গান্ধীকে ভারতের, জিন্নাহ্কে পাকিস্তানের, তখন শুধু এটাই বোঝানো হয় যে, ওই কয়েকজন মানুষ স্বাধীনতা লাভের জন্য বিশেষভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানও ওই অর্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।’...

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাঁর আরেকটি মূল্যায়ন অনেক কিছু পরিষ্কার করে দেয়। কত উঁচুমাপের নেতা বাঙালী হারিয়েছে তা বুঝতে সাহায্য করে। তাঁর মতে, গান্ধী ও জিন্নাহ্ দু’জনই বড় মাপের নেতা তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা জনগণ থেকে উঠে আসেননি। জনগণকে তৈরি করেননি, করেছেন ধর্মের ব্যবহার। বঙ্গবন্ধু তা করেননি। বরং তিনি তৃণমূল থেকে জনগণের সঙ্গী হয়ে উঠে এসেছেন। এমন কথা তিনি সাংবাদিক যশোবন্ত সিংকে বলেন এভাবে-...“I have known the impect to Gandni, Jinnah and Nehru. Take it From me that what I have seen of mujibÕs impact on his people was an eye-opener even to me. The depth of Feeling he evoked in so maû people and so effortlessly was something no other leader had ever done. Sheik mujib epitomi“es the desire of the people to hold together and build together. They knwo he has no magician who will pull prosperity out of a hat as if it were a rabbit; the reali“e that the country is greater than their Bangabandhu and that liberation was not his personal achievement; but it is evident to aûone that the forces that gave them strength found their fullest expression in Mujibur Rahman.”

অনন্য সাধারণের সাধারণ জীবন

যে গাছে যত বেশি ফল সেই গাছ তত বেশি নত- এ আপ্ত বাক্যটি যেন অক্ষরে অক্ষরে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের জীবনে ফলেছিল। এতবড় জ্ঞান তাপস প্রতিটি বিষয়ে যার পা-িত্য ছিল সীমহীন সেই মানুষটির মধ্যে বিন্দুমাত্র অহংবোধ ছিল না। ছিল না জ্ঞানের গরিমা। বরং খুবই সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। পোশাকে-আশাকে, চালচলনে ছিলেন সাধারণের চেয়ে অতিসাধারণ। নিজ হাতে বাজার-সদাই করতে ভালোবাসতেন। ছিলেন অতিথিপরায়ণ। প্রায় প্রত্যেককে বলতেন, কোনো দেশ বা জাতিকে চিনতে ও বুঝতে হলে তাদের কাঁচা বাজার আর বইয়ের দোকানে আগে যেতে হবে।

অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের অতি সাধারণ জীবনযাপনের ছোট দুটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক। প্রথমটা এমন- কবি-কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা অনুরোধ করেছিলেন তোপখানা রোডে তার ছাপাখানায় যেন রাজ্জাক স্যার একটু পদধূলি দিয়ে আসেন। একদিন গিয়েছিলেনও। প্রেসের ম্যানেজার ভেবেছিলেন কোনো কম্পোজিটর বোধ হয় কাজের আশায় এসেছে। তাদের লোক দরকার নেই বলে চিনতে না পেরে আর সাধারণ পাঞ্জাবি-চাদরের মতো পোশাক দেখে বিদায় করে দিয়েছিলেন। শুনে আহমদ ছফা তো অনুতাপে বাঁচেন না।

আরেকটি ঘটনা এরকম- রাজ্জাক স্যার তখন থাকেন তার ভাতিজা আবুল খায়ের লিটুর বাসায়। সেখানে এক চৈত্র মাসে জার্মান প্রবাসী পশ্চিম বাংলার এক বান্ধবী নিয়ে বেড়াতে গেছেন আহমদ ছফা। গাছে কাঁঠাল দেখে কাঁঠালের এঁচোড় খাওয়ার সাধ জাগল ভদ্রমহিলার। আহমদ ছফার ঠিকানা রাখলেন রাজ্জাক স্যার। পরদিন ঠিকই রান্না করে টিফিন ক্যারিয়ারে কাঁঠালের এঁচোড় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক আহমদ ছফার বাসায় নিজে পৌঁছে দিয়ে আসেন।

ছফা সেদিন বাসায় ছিলেন না। কাজের ছেলের কাছে পূর্বাপর সবকিছু শুনে বুঝতে পারলেন রাজ্জাক স্যার নিজেই এসেছিলেন। তাকে খাতির যতœ করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে কাজের ছেলের জবাবটা ছিল এমনÑ ‘একটা বুইর‌্যা মানুষ এই টিফিন ক্যারিয়ারটা রাইখ্যা গেছে।... মানুষটার গায়ে একটা ফাডা-ছিঁড়া পাঞ্জাবি আর ময়লা লুঙ্গি আর ঢাকাইয়া কথা কয়। কইথেক্যা আইছে যখন জিগাইলাম, কয় সায়েব টিফিন ক্যারিয়ার দেখলেই বুঝতে পারবো নে।... এই হলো তাঁর সাধারণ জীবনের নমুনা, মানুষের প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টান্ত। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের দাবার নেশা ছিল। সঙ্গী ছিলেন আরেক মহারথি কাজী মোতাহার হোসেন। আজকের আন্তর্জাতিক গ্র্যান্ডমাস্টার দাবারু নিয়াজ মোরশেদকে গড়ে তোলার অন্যতম অবদান তাঁর। তিনি ছিলেন চিরকুমার। তাঁর ঘরবসতি ছিল বইয়ের সঙ্গে। এতবড় জ্ঞানতাপস কিন্তু লিখে যাননি কোনো গ্রন্থ। দুয়েকটি প্রবন্ধ আর বক্তৃতা ছাড়া তেমন কিছু পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন লেখা ও চিন্তার অফুরন্ত উৎস। চিন্তার স্রষ্টা, খোলা জানালা। তাঁর সংস্পর্শে যারা বা যিনি এসেছেন তিনিই সমৃদ্ধ হয়েছেন, হয়েছেন আলোকিত।

১৯১২ (মতান্তরে ১৯১৪) সালের ১ জানুয়ারি জন্ম আর প্রয়াত হন ২৮ নবেম্বর ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে। আজ যখন মুক্তচিন্তার ওপর নেমে আসছে খ—গ, চিন্তাকে সীমাবদ্ধ করার চলছে নানা প্রয়াস তখন এমন জ্ঞানের শুদ্ধতম সাধক কিংবা বোধিবৃক্ষের অভাব দেখা দিয়েছে প্রকটভাবে। এ শূন্যতা পূরণ হতে পারে তার রেখে যাওয়া দর্শন ও পথ নির্দেশনায়।