২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রাজস্ব কম, উন্নয়ন কাজও কম ॥ অর্থমন্ত্রীর ক্ষোভ


যার ওপর সরকার চলে দেখা যাচ্ছে ঐ জায়গাতেই সমস্যা। ঐ জায়গাটি কী? সুশাসন, না। রফতানি, না। আমদানি, না। এসব কিছুই না। আসল জায়গা হচ্ছে রাজস্ব, রেভিনিউ। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা হোক, প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা হোক, সরকারের দৈনন্দিন খরচের কথা হোক, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা হোক, ঋণের ওপর সুদ পরিশোধের বিষয় হোক- এ সবই নির্ভর করে রাজস্বের ওপর, সরকারের আয়ের ওপর। আয় দেখে ব্যয় করতে হয়। আমাদের দেশে অবশ্য ব্যয় নির্ধারণ আগে, রাজস্ব আয়ের প্রশ্ন পরে। বাজেটের আকারের কথা বলা হয় খরচের অঙ্ক দেখে। মন্দ নয়। কারণ সব ধরনের খরচের টাকা আমাদের নেই, বিশেষ করে উন্নয়ন ব্যয়ের টাকা। সে যাই হোক, সরকারের দৈনন্দিন মাথাব্যথা আয়-ব্যয় নিয়ে। ব্যয় নির্বাহ সরকারকে করতে হবে, এর কোন বিকল্প নেই। বিকল্প আছে কাজকাম বন্ধ করে দেয়া। তা সম্ভব নয়। অতএব বড় মাথাব্যথা আয় নিয়ে, রাজস্ব নিয়ে। ঐ রাজস্বেই যদি টান পড়ে তাহলে মাথায় বাড়ি। কারণ যেহেতু খরচের হাত থেকে রেহাই নেই, অতএব করতে হবে ঋণ। দৈনন্দিন একটা ঋণ সরকার করতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে। এটা মাত্রার বাইরে গেলেই সমস্যা। হৈ চৈ হয়। তারপর বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ। এখন এই ঋণের কোন সমস্যা নেই। ব্যাংকে ব্যাংকে টাকার পাহাড় জমেছে। আন্তঃব্যাংক ঋণ (কল মানি মার্কেট) নেই বললেই চলে। তিন-চার শতাংশে ঋণও কেউ নিতে চায় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘চাবুকের’ ফলে সরকারী ব্যাংকের ঋণ দেয়া বন্ধ। বলা হয়েছে ১০ শতাংশ ঋণ বৃদ্ধি ঐ সব ব্যাংকে হবে। বলা বাহুল্য, শুধু বার্ষিক সুদ চার্জ করলেই ১০ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়। অতএব সরকারী ব্যাংকে ঋণ প্রদান কার্যক্রম বন্ধ। অতএব ব্যাংকে ব্যাংকে টাকার পাহাড়। অধিকন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় বড় গ্রাহককে বিদেশী ঋণ নিতে উৎসাহ জোগাচ্ছে। এমনিতে ফান্ডের সয়লাব, তার উপর বিদেশী ঋণ। টাকার পাহাড় পর্বত হচ্ছে। অতএব সরকারের বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে ক্ষতি নেই, হৈ চৈ-এর সম্ভাবনা কম। কিন্তু এ কর্মকা-ে তো মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। রাজস্ব বাড়ানো সরকারের বড় লক্ষ্য। এর ওপর নির্ভর করে বাজেট বাস্তবায়ন, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, প্রকল্প নির্মাণ ইত্যাদি ইত্যাদি। দেখা যাচ্ছে ঐ জায়গাতেই গ-গোল। স্বয়ং অর্থমন্ত্রী রাজস্ব আদায়ের শ্লথ গতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বছরের প্রথম তিন মাস গত হয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর গেছে। এখন অক্টোবরও যায় যায়। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রানুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। তিন মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা। অথচ আদায় হয়েছে ৩০ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। রাজস্ব বোর্ড বলেছে, দুটি কথা। আয়কর রিটার্ন দেয়ার সময় এবারই একবারে দুই মাস বাড়ানো হয়েছে। এই সময়সীমা শেষ হতে যাচ্ছে নবেম্বরে। সেপ্টেম্বরে স্বাভাবিকভাবে থাকে শেষ সীমা। এরপর নবেম্বর। অতএব জুলাই-সেপ্টেম্বরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ব্যর্থ হয়েছে বলা যাবে না। এছাড়া অর্থবছরের প্রথম তিন মাস রাজস্ব আদায়ের গতি থাকে ধীর। পরে তা ধীরে ধীরে বেশি গতি পায়। দেখা যাচ্ছে অর্থমন্ত্রী মহোদয় এই যুক্তি মানতে রাজি নন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, তার অর্থমন্ত্রিত্বের মেয়াদে রাজস্ব আদায়ের সফলতা এই সর্বনিম্ন। তিনি শুধু এ কথা বলেই ক্ষান্ত হননি। এর কারণের কথাও বলেছেন। মুশকিল হচ্ছে, কারণ যাই হোক যা কেন ২০১৫-১৬ অর্থবছরের চার মাস শেষ হচ্ছে দু’এক দিনের মধ্যে। বাকি আছে আট মাস। শুধু অর্থবছরের কথা নয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছর ঘটনাক্রমে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রথম বছর। প্রথম বছরেই যদি রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয় তাহলে বাকি দিন পড়েই আছে। অতএব অর্থমন্ত্রীর ক্ষোভ বোধগম্য।

মুশকিল হচ্ছে এই খবরের পাশাপাশি আরও দুটি খবর আছে, যা ভাল নয়। রাজস্ব আদায় ঠিকমতো না হলে যা হয় তাই হতে শুরু করেছে। হয়ত অন্য কারণও আছে। কিন্তু রাজস্ব ঘাটতির পাশে যখন উন্নয়ন খরচে ঘাটতির কথা প্রকাশিত হয় তখন দুর্ভাবনা বাড়ে। একটি খবরে দেখা যাচ্ছে, বিগত চার বছরের মধ্যে এবারই উন্নয়ন ব্যয় বছরের প্রথম তিন মাসে সর্বনিম্ন। লক্ষ্য করার মতো বিষয়, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি অর্থমন্ত্রীর মেয়াদকালের মধ্যে সর্বনিম্ন; আবার উন্নয়ন ব্যয়ও চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। গেল বছরের একই সময়ের তুলনায় এর পরিমাণ ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ কম। উল্লেখ্য, চলতি বছরের জন্য উন্নয়ন বাজেট ধরা যাচ্ছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দশটি মন্ত্রণালয়েই বরাদ্দের পরিমাণ ৭৩ শতাংশ। বিদ্যুত, ব্রিজ নির্মাণ, রাস্তাঘাট এবং হাইওয়ে এর মধ্যে অন্যতম। বলা হচ্ছে, দীর্ঘায়িত বর্ষাকাল না কি কাজের গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে। কারণ হয়ত এক শ’ একটা আছে। প্রতিবছরই কারণ খাড়া করা হয়। তবে একটা বিষয়ও ইতোমধ্যে পরিষ্কার। বছরের দশ মাসে কাজ হয় পঞ্চাশ ভাগ আর বাকি দুই মাসে ৪৫ ভাগ। এ বড় দারুণ গতি। প্রতিবছর তাই হয়। কীভাবে হয় তা একমাত্র ঈশ্বর জানেন, আর জানেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আর দেশবাসী জানেন কাজের মান হয় নিম্ন। যেনতেন প্রকারে কাজ সারা হয় জুনের মধ্যে বিলের টাকা পাওয়ার জন্য। আর এক টাকার কাজ তিন টাকায় হয় এই সমস্যার কথা নাইবা উল্লেখ করলাম। যেভাবেই দেখা হোক না কেন, উন্নয়ন বাজেট টাকার অঙ্কে ক্ষতিগ্রস্ত যেমন হয় তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গুণগতভাবে। ২০১৫-১৬ সালে একই ঘটনা ঘটছে। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুঃখ আছে; কিন্তু দুঃখ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়েরও। প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী একজন সফল ব্যবসায়ী। কাজ কীভাবে করতে হয় তিনি জানেন বলেই মনে করি। এখন তার সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রথম বছরেই যদি এই অবস্থা হয় অর্থাৎ প্রথম বছরেই যদি তিনি হোঁচট খান তাহলে বাকি চার বছরে তা পুষিয়ে উঠবেন কী করে? রাজস্ব আদায়ের কাজ তার নয়। কিন্তু টাকা দিলে তিনি যদি তার প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি করেন তাহলে এর বোঝা তো সরকারের ঘাড়েই চাপবে। ঢাকা শহরেই অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। শান্তিনগরের উপর দিয়ে একটা ওভারপাস হচ্ছে। কতদিন যাবত এর কাজ হতে দেখছি; কিন্তু এর গতি খুব ধীর বললে কম বলা হয়। এর জন্য কে দায়ী? ‘তমা’, অর্থ মন্ত্রণালয়, না পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়? হয়ত কেউ নয়, দায়ী ঢাকাবাসীর কপাল।

দুটি খারাপ খবরের পরে যে খবরটি আমার হাতে আছে তাও নেতিবাচক। এসব নেতিবাচক খবর আমার নির্বাচন নয়। এগুলো কাগজের বড় বড় শিরোনাম। আমি বিকল্পহীন। এখনকার খবরটিতে দেখতে পাচ্ছি বৈদেশিক সাহায্যের ডিসবার্সমেন্ট ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিগত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের তুলনায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বৈদেশিক সাহায্য ডিসবার্সমেন্ট ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিগত জুলাই-আগস্ট মাসে বিদেশী সাহায্যের টাকা ছাড় পেয়েছে মাত্র ২৯২ মিলিয়ন ডলার। এ বছর বিদেশী সাহায্যের টাকা বেশি ছাড় পাবে বলে হিসাব করা হয়েছিল। কিন্তু যেসব বিভাগ ও মন্ত্রণালয় বিদেশী সাহায্যের টাকা ব্যবহার করে তারা দুই মাসে খরচ করতে পেরেছে মাত্র ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ টাকা। প্রতিমাসে মাত্র সোয়া তিন শতাংশ টাকা। তাহলে বছরে কত টাকা ব্যবহার করা যাবে তা সহজেই অনুমেয়। সমস্যা আবার এক জায়গায় গিয়ে হাজির হয়। কেন বৈদেশিক সাহায্যের টাকা কম ব্যবহার হয়েছে? কারণ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের কাজ আশানুরূপ গতিতে চলছে না। এটা বরাবরের ঘটনা। প্রায়ই কাগজে খবর হয় বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির ওপর। সে এক ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু যে সাহায্যের টাকা বরাদ্দ করা আছে তা আমরা ব্যবহার করতে সক্ষম নই। এর ফলে প্রতিবছর পাইপলাইনে প্রচুর ডলার জমা থাকে। এই মুহূর্তের সঠিক খবর জানি না। আমার অনুমান বছর দু’-তিনেকের টাকা পাইপলাইনে আটকা পড়ে আছে। এটা আমাদের অদক্ষতা ছাড়া আর কী? আমলাদের অদক্ষতা, না কি মন্ত্রীদের অদক্ষতা? এর জবাব কে দেবে? তবে একটা অদক্ষতার কথা না লিখলেই হয় না। এই অদক্ষতা শেষ পর্যন্ত আমাদের ছারখার করে ছাড়বে। কয়েকদিন আগে দেখলাম প্রাথমিক স্তরে গণিতে অদক্ষ ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। মারাত্মক খবর। একটা মাঠ- তার দৈর্ঘ্য এত ফুট, প্রস্থ এত ফুট। পুরো মাঠটা একবার ঘুরে আসলে কত ফুট ঘোরা হবে। পঞ্চম শ্রেণীর ৭৯ শতাংশ ছেলেমেয়ে যদি এর উত্তর না জানে তাহলে এই প্রাথমিক শিক্ষার অর্থ কী? শিক্ষামন্ত্রীর কী এ ব্যাপারে কোন দায়ভার আছে? পড়ায় শিক্ষকরা, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন সচিবরা, রয়েছে শিক্ষাবোর্ড। এমতাবস্থায় প্রাথমিকের শেষ বর্ষের ছাত্রছাত্রী যদি গণিত না জানে, সাধারণ বিজ্ঞান না জানে এবং তারা থাকে এসব ব্যাপারে অদক্ষ তাহলে এর জন্য দায়ী কে? হয়ত ঈশ্বরই! তিনিই এদের মেধা দেননি।

লেখক : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও

সাবেক শিক্ষক ঢাবি