২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিদায় বিএনপি বিদায় রাজনীতি


বিদায় বিএনপি বিদায় রাজনীতি

শরীফুল ইসলাম ॥ বিএনপি ছাড়লেন দলের ভাইস- চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী। চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কাছে লেখা পদত্যাগপত্রে বিএনপি ছাড়ার কথা জানান। বুধবার রাতে পদত্যাগপত্রটি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে পৌঁছে দেন তিনি। জানা যায়, অসুস্থতার কথা বলে পদত্যাগ করার কথা বললেও নানামুখী চাপের কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন। এদিকে দলের চরম দুঃসময়ে প্রভাবশালী নেতা শমসের মবিনের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে বিএনপিতে তোলপাড় চলছে। শমসের মবিনের পথ ধরে বিএনপির আরও কয়েক সিনিয়র নেতা দল ছাড়তে পারেন বলে গুঞ্জন চলছে। লন্ডন থেকে এ খবর শুনে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমানও চিন্তিত বলে জানা গেছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দলের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেছেন, অসুস্থতার কারণে যে কেউ দল থেকে পদত্যাগ করতেই পারেন।

সূত্র মতে, এ বছর ৬ জানুয়ারি থেকে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন টানা অবরোধ-হরতাল চলাকালে নাশকতামূলক বিভিন্ন কর্মকা- নিয়ে সারাবিশ্বে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে পরিস্থিতি মোকাবেলায় শমসের মবিন চৌধুরীর ওপর দলীয় হাইকমান্ডের চাপ বাড়ে। তবে তিনি বিদেশী কূটনীতিকদের মাধ্যমে বিএনপি জোটের আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিভিন্ন দেশে তথ্য পাঠানোর চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু তার কর্মতৎপরতায় সন্তুষ্ট হতে না পেরে লন্ডন থেকে তারেক রহমান শমসের মুবিনের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। আন্দোলন শুরুর ৩ দিন পর নাশকতার মামলায় ৮ জানুয়ারি বনানী ডিওএইচএসের বাসা থেকে গ্রেফতার হন তিনি। তখন বিএনপির ভেতর থেকেই তার গ্রেফতার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। দলের নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে এমন কথাও বলাবলি করে যে, আন্দোলন চলাকালে দলকে বেকায়দায় রেখে নিজের দায় এড়াতে তিনি কৌশলে গ্রেফতার বরণ করেছেন। অবশ্য, টানা ৯২ দিনের নেতিবাচক আন্দোলন শেষ হওয়ার পর ২২ মে জামিনে মুক্তি পান শমসের মবিন চৌধুরী। মুক্তির পর তিনি ছিলেন চুপচাপ। এর পর আর তাকে রাজনীতিতে খুব বেশি সক্রিয় দেখা যায়নি। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে কোন দেশের রাষ্ট্রদূত কিংবা অন্য কোন প্রতিনিধি দেখা করতে গেলেও শমসের মবিন চৌধুরীকে সচরাচর উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বিএনপির প্রতিনিধি দলের বৈঠকেও ছিলেন না শমসের মুবিন। তবে টানা আন্দোলনে বিএনপি চেয়ারপার্সনের অপর দুই উপদেষ্টাÑরিয়াজ রহমান ও সাবিহ উদ্দিন আহমেদকে নিয়মিত এ ধরনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। শারীরিক অসুস্থার কারণে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করে কিছুদিন চিকিৎসা শেষে সম্প্রতি দেশে ফেরেন শমসের মবিন চৌধুরী।

এদিকে দুই বিদেশী হত্যাকা-ের ঘটনার পর বিএনপির কিছু নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আসার বিষয়টি নিয়ে সরকার ও সরকারী দলের নেতাকর্মীরা সোচ্চার হয়। এ নিয়ে দেশ-বিদেশে নানামুখী প্রশ্নের মুখে পড়ে বিএনপি। বিশেষ করে বিদেশী হত্যার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের মন্ত্রীদের মুখে বিএনপির কয়েক কেন্দ্রীয় নেতার নাম উচ্চারিত হওয়ায় বিদেশীদের কাছে বিব্রত হন দলীয় হাইকমান্ড। এ সময় শমসের মবিন চৌধুরীকে এ নিয়ে সোচ্চার হয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলার কথা বলা হলে তিনি অসুস্থতার কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এতে বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি হাইকমান্ড চরম ক্ষুব্ধ হন। আর দলীয় হাইকমান্ডের আচরণে শমসের মবিন চৌধুরীও ক্ষুব্ধ হন। এ ছাড়া টানা আন্দোলন চলাকালে নাশকতার মামলায় জামিনে থাকা শমসের মবিন চৌধুরীর ওপর সরকারেরও চাপ ছিল বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে। এর বাইরে সিলেটে বিএনপির রাজনীতি নিয়ে নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর অনুসারীদের সঙ্গে শমসের মবিন চৌধুরীর দ্বন্দ্ব ছিল। সব কিছু মিলিয়ে চাপা ক্ষোভের অবসান ঘটাতে বুধবার শমসের মবিন চৌধুরী দল থেকে পদত্যাগ করেন।

সূত্র মতে, টানা আন্দোলন চলাকালে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যাওয়া ও মুক্তি পাওয়ার পর শমসের মবিন চৌধুরী দলের কাছ থেকে কোন সহায়তা পাননি বলে কিছুটা মনোক্ষুন্ন ছিলেন। অপরদিকে টানা আন্দোলনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে পদত্যাগের জন্য তার ওপর ক্রমাগত চাপ ছিল বলে জানা যায়। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির রাজনীতির বিষয়ে তার আপত্তি ছিল। তার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের কিছু কূটনীতিক বিএনপি হাইকমান্ডকে জামায়াত ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু এ প্রস্তাব গ্রহণ না করায় শমসের মবিন চৌধুরী দলীয় হাইকমান্ডের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাই পদত্যাগ করে তার ক্ষোভের অবসান ঘটালেন।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের কাছে লেখা পদত্যাগপত্রে শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, আপনি নিশ্চই অবগত আছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে আমি গুরুতর আহত হয়ে ছিলাম। সে কারণে আমাকে বিভিন্ন সময় দেশ-বিদেশে নানাবিধ চিকিৎসা নিতে হয়েছে। বর্তমানে আমার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। আমার বর্তমান স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারণে আমি অনতিবিলম্বে রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অবসর গ্রহণের প্রেক্ষিতে আমি বিএনপির সকল পদ থেকেও পদত্যাগ করলাম। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার স্বাস্থ্যগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যবোধকে সামনে রেখে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করার প্রয়াস আমার চিরকাল থাকবে।

শমসের মবিন চৌধুরী এক সময় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার খুবই ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা শমসের মবিন একাত্তরে সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট পদে কর্মরত ছিলেন। স্বাধীনতার পর মেজর পদে থাকা অবস্থায় তার চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় শমসের মবিন চৌধুরীকে পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়। ২০০৫ সালে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়। সেখানে দুই বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৭ সালে তিনি অবসরে যান। ২০০৮ সালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে বিএনপিতে যোগ দেন শমসের মবিন চৌধুরী। সে সময় বিএনপি চেয়ারপার্সনের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান তিনি। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের পর শমসের মবিনকে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান করা হয়। ভাইস-চেয়ারম্যানের পাশাপাশি বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন তিনি। গত ক’বছর ধরে তিনি বিএনপির ক্ষমতাকেন্দ্রের খুব কাছাকাছিই ছিলেন।

শমসের মবিন চৌধুরী এমন এক সময় দল ও রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিলেন যখন সরকারবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা করতে ব্যর্থ হয়ে কঠিন এক সময় পার করছে বিএনপি। দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ১৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনে যাওয়ার পর থেকে সেখানে বড় ছেলে তারেক রহমানের বাসায় অবস্থান করছেন। আর দেশে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবস্থান করলেও অসুস্থতার কারণে দলে সক্রিয় নন তিনি। দলের অন্য সিনিয়র নেতারাও দলীয় কার্যক্রম থেকে কার্যত নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন। এ ছাড়া কিছু নেতা জেলে ও আরও কিছু নেতা গ্রেফতার এড়াতে বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কেবল দলের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন প্রতিদিন নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে প্রেস ব্রিফিংসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রমে অংশ নেন।

এদিকে বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বিএনপি ত্যাগ করায় শমসের মবিনকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, আরও অনেক নেতা বিএনপি ছাড়বেন । আমি মনে করি বিএনপিতে যারা এখনও মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী আছেন তারা একে একে এই সন্ত্রাসী নেতৃত্ব থেকে বেরিয়ে এসে বিএনপিকে ঢেলে সাজাবেন। তিনি বলেন, বিএনপির অনেক নেতাই দলের বর্তমান নেতৃত্বে আস্থা রাখতে পারছেন না। মাঠের নেতারাও চান তারেক রহমান ও খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে বিএনপিকে সাজাতে। আন্দোলনের নামে পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যার সঙ্গে একমত না হওয়ায় বিএনপির বিবেকবান নেতারা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং তাদের কর্মকা-ের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে শমসের মবিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীতে যুবদল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, অবসরে গেলেও জাতীয়তাবাদী শক্তির সঙ্গেই থাকবেন শমসের মবিন চৌধুরী। এর আগে দুপুরে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, অসুস্থতার কারণে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেছি। প্রোস্টেট ও চোখের সমস্যায় ভুগছেন জানিয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসার জন্য আমার বিদেশে যাওয়া জরুরী। এমআরপি পাসপোর্টের জন্য আবেদন জমা দিয়েছি। কিন্তু এখনও আমাকে তা দেয়া হয়নি।

শমসের মবিনের পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মোবাইল ফোন বন্ধ রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি জানি না। আর এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু।

জানা যায়, শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগের বিষয়টি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব খালেদা জিয়াকে অবহিত করেছেন। তবে খালেদা জিয়া দেশে ফিরে এলে পদত্যাগপত্রটি গ্রহণের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।