২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মঞ্চ নাটক সুখ চান্দের মোড়


অস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ক্যাটাস এ্যাওয়ে কম বেশি সকলের দেখা। চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র ফিডেক্স কুরিয়ার কোম্পানির কর্মী চ্যাক রোনাল্ডকে দেখা যায় চলচ্চিত্রের শুরুতে তিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে প্রাপকের মালামাল পৌঁছে দিতে দিক খুঁজে না পেয়ে দিশাহারার অবস্থায়। চলচ্চিত্রের শেষে দেখা যায়, বিমান দুর্ঘটনায় তার নিহত হওয়ার সংবাদে দীর্ঘ সময় কালে অফিস সংসার আপনজন যখন পরিবর্তিত অবস্থায় তখনও তার আর যাওয়ার কোন জায়গা নেই। অবশেষে ঠাঁই ওই তিন রাস্তার মোড়ে দিশাহারা অবস্থায়। অনেকটা সে রকমই অবস্থা সুখ চাঁন্দের মোড় নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে খেটে খাওয়া কামলা তথা শ্রমজীবী মানুষদের, যারা মোড়ে এসে কামলার কাজ খুঁজে পেতে দিশাহারা। আবার নাটকের শেষে নায্য পাওনা বঞ্চনা থেকে বিদ্রোহের কারণে সুরক্ষা পেতে দিশাহারা হয়ে ওই একই রাস্তার মোড়ে। সুখ চাঁন্দের মোড় থেকে পিচঢালা সংযোগ সড়ক নির্মাণের প্রেক্ষাপটে মালিক শ্রেণী এবং শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যকার টানাপড়েন, মূল্যবোধের অবক্ষয়, নিষ্পেশনের বাধ্যবাধকতা প্রভৃতি বিষয় নিয়েই নাটক ‘সুখ চাঁন্দের মোড়’। নাটক প্রকাশনার পাশাপাশি নাট্য প্রযোজনায় হাতেখড়ি নতুন দল কিসসা কাহিনী প্রযোজিত, নাট্যকার আসাদুজ্জামান দুলাল রচিত, নির্দেশক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন নির্দেশিত নাটক ‘সুখ চাঁন্দের মোড়’ মঞ্চায়িত হলে াগত ১১ অক্টোবর ঝিনাইদাহ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ হলে। পরীক্ষণ হলে হোক কিংবা ল্যাবরেটরিতে বসেই হোক হোমিওপ্যাথি ডাক্তার মাত্রই বিশ্বাস করেন, রোগের লক্ষণ ধরে এগিয়ে রোগের কারণ চিহ্নিত করে চিকিৎসা করলেই তবে রোগীর চিকিৎসা। তদ্রুপ নাট্যকার আসাদুজ্জামান দুলাল শ্রমিক তথা কামলাদের মজুরির বৈষম্যবিষয়কে সামনে রেখে টেন্ডারের দুর্নীতি পরিক্রমায় কিভাবে একে একে জড়িত নেতৃস্থানীয় কামলা, কামলাদের দালাল, রাজমিস্ত্রি, ঠিকাদার, ইঞ্জিনিয়ার হয়ে খোদ জনপ্রতিনিধি তার নষ্ট আখ্যান তুলে ধরেছেন নাটকীয় তীক্ষ্মতায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সামনে রেখে একপেশে স্বার্থ লাভ বাড়তি সংযোজন। লাভের জন্য লোভ আর নিরূপায় হয়ে অধীনতা স্বীকারের মধ্যে কবি কাশেম গণির ব্যক্তির মতামত বিক্রি না হওয়ার মধ্যে দিয়ে শেষ হয় আসাদুজ্জামান দুলালের নাটক। খালি চোখে যেমন আম দেখে বোঝা যায় না আটি ছোট না বড় ঠিক তেমনি মঞ্চায়ন দেখে বোঝার উপায় নেই মঞ্চায়িত নাটকে নাটকটির নাট্যকার পুরোটাই যুক্ত নাকি খানিকটা নির্দেশকের কারণে মুক্ত। ফলে দায়িত্ব নিয়ে নাট্যকারের সঙ্গে বোঝাপড়াটা করা গেল না। তবে একক প্রচেষ্টায় যে দুর্নীতি করা যায় না বরং সম্পন্ন হয় সবার চূড়ান্ত লোভের কারণে বিষয়টিতে যেমন নাট্যকারের দক্ষতা তেমনি সংঘটিত দুর্নীতিতে সকলেই অংশ নেবে এমন ভাবনাটি নাট্যকারের ব্যর্থতা। নাট্যকার নিশ্চই বিশ্বাস করেন, শুধু খাদ মিশিয়ে স্বর্ণের অলঙ্কার হয় না। উপযুক্ত মুক্তিযুুদ্ধের চেতনার প্রসঙ্গও একমুখী। আলোর নিচে বসে জাল দলিলে সই করাটাই আলোর একমাত্র ব্যবহার না। কেউ না কেউ তো ওই আলোর নিচে বসে দাতব্যলয়ের জন্য জমিও দান করে। তবে অত্যাধিক সেক্রিফাইস না থাকা সত্ত্বেও কবি কাশেম গণির একক লড়াই ভাববার।

ভাববার বিষয়, প্রযুক্তির বিস্তৃতি কিন্তু বিকাশের ক্ষেক্র সীমিত হওয়ার এই দোদুল্য সময় নির্দেশক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন প্রযুক্তনির্ভর অডিটরিয়ামে নাটক উপস্থাপন করার জন্য র্ফম হিসাবে বেছে নিয়েছেন বাংলার অধুনালুপ্ত সঙযাত্রাকে। মুখোশ দিয়ে মুখ ঢাকার এই যাত্রা পথে সঙযাত্রা ফর্মের জোরের জায়গা, ঘটনায় থেকেও সমসাময়িক সময়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন। বারাক ওবামা, মোদি, ধনী, মোস্তাফিজুর রহমান, সঙ্গীতশিল্পী হাসান প্রভৃতির বিষয় অবতরণে নির্দেশক সফল। হাস্যরসের মধ্যদিয়ে ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য সুধীজনের সামনে তুলে ধরায় ভাবনার উদ্রেক হয়। মুখাবয়াবের পাশাপাশি পুরো শরীরে পেইন্টিং তার নতুনত্বের প্রকাশ। ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মস্তিষ্কের সজ্জা, বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূণ এবং ইঙ্গিতবাহী। ফজলে রাব্বি সুকর্নোর প্রপস নাটকে পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার হয়। পোশাক, শরীর অঙ্কন ও সেট পরিকল্পনায় এনামতারা সাকী এবার আরও পরিণত ও নান্দনিক। নির্দেশনায় নির্দেশক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন দৃশ্যমান দৃশ্য নির্মাণ যতটা সফল, হাস্যরস উপস্থাপনে যতটা কৌশলী, নতুন দলের নতুন পরিবেশনায় যতটা চৌকষ ততটাই আক্রান্ত পরিণত বয়সেও শিশু সুলভ আচরণ প্রকাশ করায়। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে চাওয়া ছেলে মানুষি আর বিষয়ের গুণগত আকর্ষণে চোখকে আকৃষ্ট করানো পরিণত বিবেচ্য এক্ষেত্রে। আর এই সঙ্কটের কারণ, থিয়েটারে দিনকে দিন সাহিত্যের বিলুপ্তি। সাহিত্য শূন্য থিয়েটার, অক্সিজেন শূন্যতার শামিল। খানিকটা লোক চক্ষুর আড়ালে থাকা নাট্যকারকে যেভাবে আট বছরের চেষ্টায় মঞ্চের পাদপ্রদীপের সামনে তুলে আনলেন নির্দেশক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন অনেকটা সেভাবে নাট্য প্রযোজনার উদ্দেশ্যে নাট্যকার ও নির্দেশক একে অপরের কাছে হয়ে উঠবে প্রয়োজনীয়-সহানুভূতিশীল এবং সহযোগী তবেই নাটকের উৎকর্ষ। উৎকর্ষ নির্মাণে অভিনেতাদের দলগত অভিনয় হাসায় আবার হাসতে শেখায়। সুখ চাঁন্দের মোড় নতুন পথের সন্ধান দেয়।