মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১০ আশ্বিন ১৪২৪, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

রাতভর আনন্দধারায় বাতিঘর নাট্যমেলা

প্রকাশিত : ২৯ অক্টোবর ২০১৫
  • পান্থ আফজাল

‘কিন্তু যে সুর একবার বাধা পড়ে দেহ তারে তা কি বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব জীবন থেকে?’

-এমন জীবন দর্শন সমৃদ্ধ উক্তিসমূহের অপূর্ব সমাবেশ বাতিঘরের ‘উর্নাজাল’ নাটক দেখার টানে বারবার নাট্যপ্রেমীদের সমাগম ঘটেছিল বিগত কয়েকটি মঞ্চায়নে। যার রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল বাতিঘরের প্রতিটি নাট্যকর্মীর ধ্যানে আর স্বপ্ন চয়নে। অবশ্য এর সিংহভাগ কৃতিত্বের দাবিদার নির্দেশক বাকার বকুলের আর বাকিটা বাতিঘর নাট্যকর্মীদের। বিশেষ করে দলের মধ্যমণি মুক্তনীল এই উদ্দীপনা আর কর্মীদের অভিজ্ঞতাকে নতুন রূপদান প্রদানের লক্ষ্য উদ্গ্রীব ছিলেন নতুন কিছু করে দেখানোর। যেন প্রতিটি নাট্যাঙ্গন একনামেই চিনতে পারে ‘বাতিঘর’ আর তার উদ্যমী নাট্যপ্রেমীদের। মনে জিইয়ে থাকা স্বপ্নকে বাস্তবে রুপদানের প্রয়াসে দলীয় প্রধান মুক্তনীল আরেক সহযোদ্ধা মনিরুজ্জামান লিপনকে সঙ্গে করে দৃঢ়চিত্তে এগুতে থাকলেন একটি সফল নাট্যমেলা উপহার দেয়ার লক্ষ্যে। তারই ফলশ্রুতিতে ২৩ অক্টোবর হতে ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিজুড়ে লোকজ আবহে এবং বিশালভাবে রঙে-বর্নে উদ্যাপিত হলো ‘বাতিঘর নাট্যমেলা ২০১৫’।

‘অশুভের বিনাশ ক্ষণে- এসো মিলি নট-নন্দনে’ সেøাগানকে ধারণ করে এই উৎসবের আয়োজন। উৎসবটিকে শুধুমাত্র নাটোৎসব না বলে, বলা হচ্ছে নাট্যমেলা। এই উৎসবের অন্যতম লক্ষ্য সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে মঞ্চনাটককে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেয়া, একইসঙ্গে কমাশ্রী পদক প্রদানের মধ্য দিয়ে সময়ের আলোচিত তরুণ নাট্যকর্মীদের সম্মাননা ও উৎসাহী করা। আমাদের নাট্য-আঙ্গিকের যে সমস্ত উপাদান আমাদের থিয়েটারকে দিনে দিনে সমৃদ্ধ করেছে, যেমন- কবিগান, পুথিপাঠ, লোকজ নৃত্য, লোকগান, মুখা খেলা, লাঠিখেলা ইত্যাদিকে সাধারণের সামনে নিয়ে আসা।

পুরো ৪ দিনব্যাপী নানা রঙ আর আল্পনায় সাজানো এই নাট্যমেলাকে ঘিরে পুরো শিল্পকলা হয়ে উঠেছিল চমৎকার এক রঙ্গশালা! নাটক প্রদর্শনীর পাশাপাশি ছিল শিল্পকলার উম্মুক্ত মঞ্চে লোকজ গানের পরিবেশনা। ছিল লোকজ মেলায় কবিগান, গম্ভীরা, ঘুড়ি ওড়ানো, বায়োস্কোপ, বানর খেলা, নৃত্য, লাঠিখেলা। যা উপভোগ করতে প্রতিদিনই হাজির হয়েছেন শত শত দর্শক।

২৩ অক্টোবর শুক্রবার বিকেলে এ নাট্যমেলার উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এ সময় অতিথি হিসেবে তার সঙ্গে ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, নাট্যজন সারা যাকের ও অভিনেত্রী ত্রপা মজুমদার। অনুষ্ঠান উদ্বোধন হয় ঢাকের বাদ্যের মধ্যেদিয়ে। এর পর অতিথিদের বক্তব্যের শেষে প্রতিবছরের ন্যায় তরুণ নাট্যযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে কমাশ্রী পদক প্রদান করা হয়। এ বছর এ পদক দেয়া হয় নাট্যসারথী ত্রপা মজুমদার এবং তৌফিকুল ইসলাম ইমন- কে। বাতিঘরের শ্রেষ্ঠ কর্মী হিসেবে পদক প্রদান করা হয় অনুষ্ঠানের শেষ অংশে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সমাপনী হয় নাট্যজন আসাদুজ্জামান নূরের পথপ্রদর্শনমূলক বক্ত্যবের মধ্যে দিয়ে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে।

শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় পরীক্ষণ থিয়েটার হলে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় প্রযোজিত নাটক ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’ দিয়ে এ নাট্যমেলার যাত্রা শুরু হয়। এরপর এই ক’দিনে নাটক প্রদর্শন করে আরণ্যক, বাতিঘর, আগন্তুক, বটতলা নাট্যদলগুলোর পরিবেশনা। নাট্যমেলার শেষ দিন সন্ধ্যা ৭টায় জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হয় প্রাচ্যনাটের পরিবেশনায় রবার্ট বোল্টের নাটক ‘এ্যা ম্যান ফর অল সিজন’ এবং পরীক্ষণ থিয়েটার হলে প্রদর্শিত হয় প্রাঙ্গণেমোর নাট্যদলের নাটক ‘আওরঙ্গজেব’। অন্যদিকে শিল্পকলার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রথমদিন হতে শেষদিন পর্যন্ত পরিবেশিত হয় ব্যান্ড ‘মায়া নহল’, ’সর্বনাম’ ‘মেঘদল’ আর ‘জলের গানের’ মন মাতানো পরিবেশনা। শেষদিনে রাতভর বাতিঘরের সদস্যরা নাচ-গানে অংশ নিয়ে উদ্যাপন করে তাদের স্বপ্নের এই মিলনমেলা। আর তাদের উড়ানো ফানুস একে একে জায়গা করে নেয় পুরো আকাশজুড়ে। শেষদিনের এই দৃশ্য শত শত মানুষের মনে কি যে এক অদ্ভুত শিহরণের আবহ তৈরি করেছিল, তা তাদের উচ্ছ্বাসেই বোঝা গেল বারংবার। অনুষ্ঠান সমাপনী হয় আজাদ আবুল কালামের ৪৯তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনের মধ্যে দিয়ে। আর সেইসঙ্গে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে নাট্যজন নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, অনন্ত হীরার ধন্যবাদ জ্ঞাপক কথামালা প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল আগামীর বাতিঘর নাট্যমেলা আহ্বানে।

প্রসঙ্গত, একে একে পাঁচ বছর অতিক্রম করতে চলেছে প্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব খালেদ খানের দেয়া নামের নাট্যদল ‘বাতিঘর’। তার অনুপ্রেরণায় উৎসাহিত হয়ে ‘বাতিঘর’ গত কয়েক বছরে দৃঢ়তার সঙ্গে নাট্যচর্চা করে আসছে। আর এমন একটি সৃজনশীল নাট্যদলের পঞ্চম বর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষেই এই নাট্যমেলার আয়োজন তো হতেই পারে!

প্রকাশিত : ২৯ অক্টোবর ২০১৫

২৯/১০/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: