২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

সাইট ইন্টেলিজেন্সের দাবি- আইএস সংশ্লিষ্টতা সঠিক


কূটনৈতিক রিপোর্টার ॥ দুই বিদেশী হত্যা ও তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিতে বোমা হামলার ঘটনায় আইএসের দায় স্বীকারের তথ্য সঠিক বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক জঙ্গী পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ।’ একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশ সরকারকে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। মঙ্গলবার সংস্থাটির পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বলা হয়, ইতালি ও জাপানের দুই নাগরিক হত্যা এবং ঢাকায় তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিতে বোমা হামলার ঘটনায় আইএসের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সরকার তীব্রভাবে অস্বীকার করে আসছে। আর আইএসের দাবির বিষয়টি আড়ালে রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে সরকার এখন সাইটের সুনাম ক্ষুণেœর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে সাইট কর্তৃপক্ষ।

আইএসের দায় স্বীকারের বিষয়ে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ আগের অবস্থানেই রয়েছে জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, বিভিন্নভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করে নিশ্চিত হয়েই তারা ওই তথ্য প্রকাশ করেছে। আইএসের মিডিয়া চ্যানেলেও দায় স্বীকারের বিষয়টি এসেছে। যারা সতর্ক করছে তাদের বিরুদ্ধে না গিয়ে সত্যের মুখোমুখি হয়ে আসল শত্রুদের দিকে মনোযোগ দিলেই বাংলাদেশ সরকার বেশি সুফল পাবে।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সরকারের অস্বীকার এবং সাইটের সুনাম নষ্টের চেষ্টায় বাস্তবতা বদলানো যাবে না। আর অনলাইনে জিহাদী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে যে সুনাম সাইট অর্জন করেছে, তা নষ্টের চেষ্টাতেও কোন ফল আসবে না।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ইতালির নাগরিক সিজার তাভেলা ও ৩ অক্টোবর রংপুরে জাপানি নাগরিক হোশি কুনিওকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দুই হত্যাকা-ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আইএসের দায় স্বীকারের খবর দেয় ‘সাইট’টি। এরপর গত ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে আশুরার তাজিয়া মিছিলে প্রস্তুতির সময় বোমা হামলা হলে তার দায়ও আইএস স্বীকার করেছে বলে সাইট দাবি করে।

সরকার বলে আসছে, এসব ঘটনার সঙ্গে আইএসের সংশ্লিষ্টতা বা দায় স্বীকারের দাবির কোন ভিত্তি গোয়েন্দারা খুঁজে পাননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, আইএসের নামে যে টুইট করা হয়েছে তা এসেছে বাংলাদেশ থেকেই। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতারের পর পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, সরকারকে চাপে ফেলতে পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম গত সোমবার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, তাভেলা হত্যার বিষয়ে কোন তথ্য আইএসের ওয়েবসাইটে নেই। এসব বার্তা তারা কখনও গোপনেও দেয় না। এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সাইট ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক রিটা কাৎজের সঙ্গে মেলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোন উত্তর পাননি বলেও জানান।

সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সাবেক পরিচালক জোশ ডেভনের সঙ্গে ২০০২ সালে সাইট ইন্টেলিজেন্স গড়ে তোলেন রিটা কাৎজে। পরবর্তীতে সাইট ছেড়ে দেন ডেভন। অতীতে প্রকাশ্যে ইসরাইলী প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কাজ করেছেন রিটা। কাজ করেছেন মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো এফবিআইয়ের সঙ্গেও। অনর্গল আরবী ভাষায় কথা বলতে পারায় ছদ্মবেশে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়েও কাজ করেছেন তিনি। তার আরবী ভাষা শেখার নেপথ্যে এই বিশেষ উদ্দেশ্যই নিহিত ছিল।

কে এই রিটা কাৎজে ॥ ১৯৬৩ সালে ইরাকের বসরায় রিটা কাৎজের জন্ম। মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ১৯৬৮ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার রিটার বাবাকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়। রিটাসহ তিন শিশুসন্তান নিয়ে তার মা পালিয়ে যান ইরানে। সেখান থেকে পাড়ি জমান ইসরাইলে। বাট ইয়াম শহর হয় তাদের ঠিকানা। রিটা প্রথমে চাকরি করেন ইসরাইলী প্রতিরক্ষা বাহিনীতে। এরপর প্রতিরক্ষা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি, ইতিহাস আর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে ডিগ্রী নেন। ১৯৯৭ সালে চিকিৎসক স্বামীর সঙ্গে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। তবে জাল ভিসার কারণে সেখানে তিনি আটক হন। ওই জালিয়াতির কথা তিনি স্বীকারও করেছেন। ওই বছরই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে চাকরি পান রিটা। হলিল্যান্ড ফাউন্ডেশন নামের একটি গ্রুপ হামাসের পক্ষে কাজ করছে এ তথ্যটি নজরে এনে গোয়েন্দাগিরিতে অবস্থান পোক্ত করেন তিনি। তখন বোরখা পরে মুসলিম নারী পরিচয়ে রেকর্ডার নিয়ে ফান্ড সংগ্রাহকদের সঙ্গে বিভিন্ন ইসলামী সম্মেলনে যোগ দিতেন তিনি। মসজিদে মসজিদে ঘুরে থেকেছেন ফিলিস্তিনী সমর্থকদের সঙ্গে নানা আন্দোলনে। ওই সময়েই বিদেশী সন্ত্রাসী গ্রুপ খুঁজে বের করতে তাকে লুফে নেয় এফবিআই।

রিটা কাৎজে আসলে কোন বেসরকারী সংস্থায় কাজ করছেন নাকি কোন বেসরকারী গোয়েন্দা সংস্থার মুখপাত্র হয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন, তা নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। সিআইএ, কেজিবি, মোসাদ, এম-১৬-এর মতো আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা যেসব স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ করছে না, তার সংস্থা ‘সাইট’ সেসব তথ্যও প্রকাশ্যে নিয়ে আসছে। ইরাক আক্রমণের আগে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কথা বলেছিল মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সেটা মিথ্যা ও বানোয়াট প্রমাণিত হওয়ায় কালো প্রচারণার দায় পড়েছিল তাদের ওপর। মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা সমালোচিত হয়েছিল পৃথিবীজুড়ে। সেই থেকে মিথ্যা বা বানোয়াট প্রচারণার দায়টা আর সরাসরি নিতে চায় না কোন সংস্থা বা দেশ। তারা প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে সহায়তা নিচ্ছে বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থার। তাই রিটা ও তার সাইট কোন বেসরকারী সংস্থা বা পক্ষের হয়ে এ কাজগুলো করে বলে ধারণা করা হয়। কারণ, সাইট নামক বেসরকারী এ সংস্থার অর্থায়ন, ইন্টেলিজেন্স তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি, প্রচারের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যও কালো চাদরে ঢাকা। তেমনি এর মদদদাতাদের পরিচিতিটাও অন্ধকারে। আইএস নিয়ে কাজ করে বা আইএসের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এমন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাংলাদেশ নিয়ে রিটা কারও হয়ে খেলছে কিনা, সেটা খতিয়ে দেখা উচিত।

এদিকে জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও এফবিআইয়ের সঙ্গে সাইটের সরাসরি চুক্তি রয়েছে। সাইটকে ২০০৪ সালে পুরস্কারও প্রদান করেছে এফবিআই।