২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

দখল-থাবায় শীতলক্ষ্যা


দখল-থাবায় শীতলক্ষ্যা

মীর আব্দুল আলীম, রূপগঞ্জ ॥ রাজধানীর পাশের শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে আছে শত শত প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। নদী দখল করে শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ নানা ধরনের স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। শীতলক্ষ্যা নদীর কেবল রূপগঞ্জ অংশেই ৩ শতাধিক পয়েন্টে ছোট বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, ইট-বালুর ব্যবসায়ী দখলদারিত্বের রাজত্ব কায়েম করেছে। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন নদী দখল বন্ধে জোরালো উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে দিন দিন নদী দখলদারের সংখ্যা বাড়ছে। রূপগঞ্জে দখলদারের প্রতিযোগিতায় একচেটিয়া দাপটে আছে বেশ কয়েকটি নামী-দামী প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান গায়ের জোরে বালি ফেলে ভরাট করেছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের শীতলক্ষ্যার সীমানা। ১৭৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই রূপগঞ্জের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদীর দু’পাশেই এখন বসত করছে অবৈধ দখলদার।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রূপগঞ্জের তারাবো ও ডেমরায় অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে গেছে সুলতানা কামাল সেতুর দু’পাড়। প্রভাবশালী স্থানীয়রা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সেতুটির দু’পাশের নিচের জায়গাগুলোতে এবং শীতলক্ষ্যা নদী ভরাট ও অবৈধ দখল করে নির্বিঘেœ চালিয়ে যাচ্ছে

ইট-বালু ও কাঠ-বাঁশের ব্যবসা। সুলতানা কামাল সেতুর রূপগঞ্জ অংশে আওয়ামী লীগ নেতা বারেক, বিএনপি নেতা শহীদুল্লাহ, নুরু মিয়া, চনপাড়ায় জয়নাল ডাক্তার, আনোয়ার, কাদির দেলোয়ারসহ ৩০ জনের বালুর গদি রয়েছে। ডেমরা অংশে দাপটের সঙ্গে বালুর ব্যবসা করছে, ডেমরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাসু, ডেমরা ইউনিয়ন যুবলীগের সহসম্পাদক ইউনুসসহ ৯ যুবলীগ নেতা, ডেমরা ইউনিয়ন যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুর রহমান, ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সদস্য মোঃ মোস্তফা, ডেমরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা হাজী মোঃ আলাউদ্দিন, মোঃ মমিন মিয়া, হাজী মোঃ আতিকুল রহমান, আবদুল মালেক ডেমরা ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মোঃ সালাউদ্দিন, যুবলীগ নেতা মোঃ সোহেল, ডেমরা থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোঃ আবদুল ওহাব। সরেজমিনে জানা যায়, সুলতানা কামাল সেতুর দু’পাড়ের নিচের খালি জায়গা ডেমরা ঘাট ও তারাবো এলাকা স্থানীয় দখলদাররা শুরু থেকেই অবৈধ দখল করে তাদের মনগড়া ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। নিয়মবহির্ভূত জেনেও স্থানীয়রা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এবং প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে তাদের ব্যবসা। এ ব্যাপারে বিশিষ্ট সমাজসেবক লায়ন মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এ নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা চিন্তিত নন? যদি তাঁরা কার্যকর পদক্ষেপ নিতেন, তাহলে এভাবে নদী দখল উৎসবে মেতে উঠতে পারত না দখলদারা।’ নদী দখলের ব্যাপারে তারাব এলাকার দখলদার আওয়ামী লীগ নেতা বারেক বলেন, ‘বাপ-দাদাগো জায়গাই আমরা দখল করছি, এইডা অন্যায় কিসের? তাছাড়া আমরা সবখানে টাকা দিয়া ব্যবসা করি।’ রূপসী এলাকার দখলদার কথিত কোটিপতি কাদের বলেন, ‘আমি বালু ব্যবসা করি। নদী দখল করি নাই।’ রূপসী এলাকার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়া বালু ব্যবসা করছি, এখানে অবৈধ কোন বিষয় নেই।’

রূপগঞ্জের ফেরিঘাটের পার্শ্ববর্তী লীনা পেপার মিল, ক্রিস্টাল সল্ট ও এসিআই নদী দখল করে রেখেছে। নদীর পশ্চিম প্রান্তে কাজী আঃ হামিদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর, আওয়ামী লীগ নেতা তারিকের বাড়ি ও উপজেলা পোস্টঅফিসের সীমানা প্রাচীরও রয়েছে নদীগর্ভের সীমানায়। দখলে বাদ নেই রূপগঞ্জ ইউনিয়ন ও দাউদপুর ইউনিয়ন এলাকাও। নদী পারের দু’কূল ঘেঁষেই অবৈধ ৩৬টি ইটভাঁটির মালিকরা ও আশকারী জুট মিল এবং মাশরীকি জুট মিলের সীমানা প্রাচীর দিয়েও দখলে নিয়েছে রূপগঞ্জ অংশের শীতলক্ষ্যা। এছাড়াও রূপগঞ্জের শীতলক্ষ্যার অংশের কোথাও বৈধ বালুমহাল না থাকলেও বেলদী, কাঞ্চন, ও ভোলাব এলাকায় শতাধিক ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করতে দেখা যায়। এ সকল বালুমহাল বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয়রা জানান, বেলদী ও কাঞ্চন এলাকায় এসব অবৈধ দখলে এবং বালুমহাল পরিচালনা করছে স্থানীয় যুবলীগ নেতাকর্মীরা। অবৈধ দখল বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ লোকমান হোসেন জানান, অবৈধ বালুমহাল উচ্ছেদ ও অবৈধ দখল বিষয়ে উচ্ছেদ করার জন্য জেলা প্রশাসকের নির্দেশে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী জানান, শীতলক্ষ্যা নদী প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা বিধায় এখানে এ জাতীয় স্থাপনা/অবকাঠামো নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে যারা ব্যবসা চলাচ্ছে তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নৌ আদালতে মামলা রয়েছে।’

শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা পিলার থাকলেও এ পিলার উপেক্ষা করেই রূপগঞ্জের চনপাড়া এলাকায় ও নদীর অপরপ্রান্তে তারাব পৌরসভার প্রাচীন হাট নোয়াপাড়া বাজার এলাকায় শতাধিক দোকান ও নানা স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। পৌরসভার রূপসী এলাকায় দখলদাররা শীতলক্ষ্যার আংশিক দখলে নিয়েছে সীমানা প্রাচীর দিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রূপসী এলাকার সিটি কোম্পানির পার্শ্ববর্তী নদী তীরের সীমানা পিলার সঠিক নয়। এই সীমানা পিলার নির্মাণসংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ম্যানেজ করে নদীর সীমানা এই অংশে কম দেখানো হয়েছে। এ ব্যাপারে সিটি গ্রুপের ম্যানেজার ওসমান আলী বলেন, আমাদের সীমানা প্রাচীর নদীর সীমানায় যতটুকুই আছে তা কেবল ভাঙ্গন রক্ষায় নির্মিত হয়েছে। সরকার চাইলে আমরা নদীর অংশ ভেঙ্গে দেব। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে রূপসী এলাকায় নাভানা গ্রুপ, বালু ব্যবসায়ী সংগঠন তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য নদী সীমানাকে দখলে নিয়েছে। মুড়াপাড়া এলাকায় হাট-বাজার, মীর সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসহ একাধিক সিরামিক কোম্পানি তাদের প্রতিষ্ঠানের নদী পারের অংশ বালি ভরাট করে গড়ে ২০-৫০ ফুট দখলে নিয়েছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান তাদের মালামাল ওঠানোর সুবিধার্থে স্থায়ী জেটি নির্মাণ করে দখলে নিয়েছে এই নদীর ২০০ ফুটেরও বেশি অংশ। মুড়াপাড়া বাজার এলাকার লীনা পেপার মিল, এসিআই সল্ট, স্থানীয় বালু ব্যবসায়ীদের দখলে রয়েছে প্রায় ৭৫০ একর জমি। এ ব্যাপারে ‘শীতলক্ষ্যা নদী বাঁচাও’ আন্দোলনের নেতা বিশিষ্ট কলামিস্ট মীর আব্দুল আলীম বলেন, ‘দখলবাজদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশ রয়েছে বলেই নদী দখল সম্ভব হয়েছে। এ ব্যাপারে সুযোগ করে দিয়ে সরকারের দায়িত্বশীলরা কোটি কোটি টাকা পকেটে পুরেছেন। আর এ কারণেই নদী বাঁচানোর জন্য তাঁদের তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ছে না।’ মুড়াপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ বরকত উল্লাহ বলেন, মুড়াপাড়া ও তারাবোতে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠান নদীতে সম্প্রসারণ করছেন। ফলে দিন দিন শীতলক্ষ্যার নদীগর্ভ চলে যাচ্ছে অবৈধ দখলদারের হাতে।’ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি বিআইডব্লিউটিএর সীমানা পিলার অতিক্রম করে নদী দখল করায় শীতলক্ষ্যা নদীর পানি ধারণক্ষমতা অবরুদ্ধ, নৌচলাচল পথ সঙ্কুচিত, প্লাবন ভূমি হ্রাস, মৎস্য ও জলজ সম্পদের ক্ষতি এবং জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হচ্ছে।

শীতলক্ষ্যা নদী দখলের ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ-১ রূপগঞ্জ আসনের এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী (বীরপ্রতীক) বলেন, অবৈধ দখলদারদের বিষয়ে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে ফলে নদী এলাকায় এখন আগের মতো অবৈধ দখলদার নাই। তবে কোন অভিযোগ পেলে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া আছে ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।