১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

টনি ব্লেয়ারের ভ্রান্তিবিলাস!


‘এতোক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে’! তবে টনি ব্লেয়ারের জন্য বিষয়টি বোধকরি নাজুক এবং বিলম্বিত বোধোদয়ই বলতে হবে। সাবেক এই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, ২০০৩ সালে মার্কিন বাহিনীর নেতৃত্বে ইরাকে সামরিক অভিযান ছিল ‘ভুল’। এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি এও স্বীকার করেছেন এই যুদ্ধের পরিণামেই জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থান ঘটে। অংশত ভুল স্বীকার করলেও টনি ব্লেয়ার অবশ্য প্রয়াত ইরাকী স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করার জন্য অনুতপ্ত নন বলে জানিয়েছেন। সাবেক এই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতকারটি ২৫ অক্টোবর রবিবার সম্প্রচারিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টিভি চ্যানেল সিএনএন-এ। তবে হঠাৎ করে এই সাক্ষাতকারটি সম্প্রচারের একটি উদ্দেশ্য আছে বলে অভিজ্ঞজনরা মনে করছেন। ইরাক যুদ্ধে ব্রিটেনের অংশগ্রহণ, প্রাণহানিসহ সম্পদহানি সর্বোপরি এর জের ধরে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের দায়-দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে ২০০৯ সালে স্যার জন চিলকটের নেতৃত্বে গঠিত হয় তদন্ত কমিশন। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই তদন্ত কমিটির রিপোর্টটি ঝুলে আছে অবমুক্তির অপেক্ষায়। ইরাক যুদ্ধে নিহত ব্রিটিশ সেনাদের স্বজনরা তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশিত না হলে আইনী ব্যবস্থা নেয়ারও হুমকি দিয়েছেন। জন চিলকট স্বয়ং এ বিষয়ে বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনকে ৩ নবেম্বর চিঠি লিখবেন বলেও জানিয়েছেন। অনেকের ধারণা এবং তা বিশ্বাস করার যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণও রয়েছে, শেষ পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদনটি আলোর মুখ দেখলে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সাঙ্গোপাঙ্গ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফেঁসে যেতে পারেন। অনেকটা এই প্রেক্ষাপটেই সিএনএনভিত্তিক এই আকস্মিক সাক্ষাতকারের অবতারণা বলে অনেকে মনে করেন।

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে জোরালো সমর্থন ও সহযোগিতা দেন টনি ব্লেয়ার। তৎকালীন ইরাকের সাদ্দাম সরকারের কাছে ব্যাপক গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র ও রাসায়নিক অস্ত্র ছিল- এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ সরকার ইরাকে হামলাসহ সাদ্দামকে উৎখাতের ঘটনাটিকে জায়েজ করতে চেয়েছিল। তবে যে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই সামরিক অভিযান চালানো হয়, সেটা পরবর্তী সময়ে ভুল বলে প্রমাণিত হয়। টনি ব্লেয়ার তা স্বীকারও করেছেন। তবে বাস্তবতা হলো ইরাক যুদ্ধের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, ক্ষয়-ক্ষতিসহ এর ফলাফল হয়েছে সুদূরপ্রসারী এবং বিশ্বের শান্তি বিঘিœতকারীরূপে। সাদ্দাম সরকারের মর্মান্তিক পতনের ফলে ইরাক নিমজ্জিত হয়েছে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলায়, যাতে জাতিগত বিদ্বেষ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া ও অন্যত্র। পাশাপাশি উত্থান ঘটেছে উগ্র জঙ্গী সংগঠন আল কায়েদা ও আইএসের। শেষোক্তটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ‘বিষফোড়া’ হিসেবে বিবেচিত। এর পাশাপাশি লাখো ইরাকীর সঙ্গে নিহত হয় অন্তত চার হাজার মার্কিন এবং ১৭৯ জন ব্রিটিশ সেনা। চূড়ান্ত অপরিমাণদর্শী এই অসম একতরফা যুদ্ধের ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী বিপুল আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি এবং বিশ্বব্যাপী তার নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টিও সহজেই অনুমান করে নেয়া চলে।

অনেকটা এই প্রেক্ষাপটেই সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের ‘ভুল স্বীকার’ ও ‘দুঃখ প্রকাশ’কে বিবেচনা করতে হবে। তবে এটুকুই তার জন্য যথেষ্ট হবে না। নিহত ও আহত ব্রিটিশ সেনাদের স্বজনেরা ওই যুদ্ধের জন্য ক্ষমা না চাওয়ায় এর মধ্যেই তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তবে এর সবকিছুই চূড়ান্তভাবে নির্ভর করছে, স্যার জন চিলকটের তদন্ত রিপোর্টের ওপর।