মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ আগস্ট ২০১৭, ৮ ভাদ্র ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিএনপির লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ

প্রকাশিত : ২৮ অক্টোবর ২০১৫
  • ‘আকিন গাম্পে’র সঙ্গে কোটি টাকার চুক্তি

তৌহিদুর রহমান ॥ বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নতুন করে আন্তর্জাতিক লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছে বিএনপি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের লবিস্ট ফার্ম ‘আকিন গাম্প’য়ের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে দলটি। চুক্তি অনুযায়ী বিএনপি তাদের প্রথমে এক কোটি টাকা দেবে। এরপর প্রতি মাসে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা ব্যয় করবে বিএনপি। ফার্মটির পক্ষ থেকে দেয়া বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের কাছে এই প্রতিবেদন পেশ করেছে আকিন গাম্প। এদিকে বিএনপির দেয়া এই অর্থের অনুসন্ধানে নামবে সরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও বিচার বিভাগের অফিস ও ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য জানায়।

আকিন গাম্পের সঙ্গে বিএনপির পক্ষ থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এ বিষয়ে চুক্তি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আকিন গাম্পের প্রধান অফিস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন এ্যাক্টের (এএফআরএ) অধীনে সেদেশে কাজ করছে আকিন গাম্প। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও বিচার বিভাগের কাছে আকিন গাম্প এই প্রতিবেদন পেশ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএনপির সঙ্গে আকিন গাম্প যেসব বিষয়ে কাজ করবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে ওয়াশিংটনের বিভিন্ন মহলের সম্পর্ক জোরদার করা, যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়ে লবিং অব্যাহত রাখা, বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা, বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে আলোচনা, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ইত্যাদি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে আকিন গাম্প বিএনপির হয়ে কাজ করবে। এজন্য প্রথম তিন মাসে প্রতি মাসে আকিন গাম্পকে প্রায় ৩২ লাখ করে টাকা দেবে। পরবর্তীতে প্রতি মাসে ৭০ থেকে ৮ লাখ টাকা দেয়া হবে। আকিন গাম্পের সঙ্গে বিএনপির যে চুক্তি হয়েছে সে চুক্তিতে বিএনপির প্রধান অফিস ২৮ ভিআইপি রোড নয়া পল্টন, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ এই ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে।

আকিন গাম্পের দেয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএনপিকে সহায়তা দেয়ার জন্য আকিন গাম্প আবার লন্ডনের ব্যারিস্টার এ্যাট ল টবি ক্যাডম্যানের সহায়তা চেয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে টবি ক্যাডম্যানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে এই সহায়তা চাওয়া হয়। টবি ক্যাডম্যানের কাছে পাঠানো এই চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি ও আকিন গাম্প একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। সমঝোতা অনুযায়ী বিএনপিকে সহায়তা দেবে আকিন গাম্প। এ বিষয়ে সহায়তা দেয়ার জন্য আপনার নিকট আবেদন জানাচ্ছি। বিএনপিতে কি কি বিষয়ে সহায়তা করতে হবে সে বিষয়গুলোও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানো, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে লবিং অব্যাহত, বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন ইত্যাদি। এসব কাজ বিভিন্নভাবে একাধিক ফোরামে করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিষয়ে বিএনপির দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াশিংটনের বিভিন্ন মহলে তুলে ধরতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আকিন গাম্পের প্রধান অফিস ওয়াশিংটনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন এ্যাক্টের (এএফআরএ) অধীনে কোন প্রতিষ্ঠান কাজ করলে প্রতি ছয় মাস অন্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও বিভাগের কাছে এই প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। সে অনুযায়ী গত জুলাই মাসে এই প্রতিবেদন পেশ করেছে আকিন গাম্প। সম্প্রতি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও বিচার বিভাগ।

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগের বিষয়ে যে অর্থ ব্যয় করা হবে, সেই অর্থের উৎস জানতে উদ্যোগ নিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কেননা লবিস্ট ফার্মে বিএনপির প্রধান অফিসের ঠিকানা দেয়া রয়েছে। বিএনপি যে লবিস্ট নিয়োগ করেছে, সেটা এখন সরকারের কাছে খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিএনপির দেয়া অর্থের অনুসন্ধান করা হবে। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমেও এই অর্থের অনুসন্ধান চালানো হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করে চলেছে। সেই অর্থ বিদেশের বিভিন্ন লবিস্ট ফার্মেও খরচ করা হচ্ছে। আর এই অর্থ খরচ হচ্ছে খোদ সরকারের বিরুদ্ধে। লবিস্ট ফার্মের বিরুদ্ধে নিয়োগ করা অর্থের উৎস জানার জন্য ইতোমধ্যেই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কালো টাকা বাইরে নিয়ে লবিস্ট ফার্মে নিয়োগ যেন কোনভাবেই না করা হয়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ঢাকা ও ওয়াশিংটনের একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, যুদ্ধাপরাধ বিচারকে কেন্দ্র করে এর আগে যে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছিল বিএনপি-জামায়াত, ইতোমধ্যেই সেটা ব্যর্থ হয়েছে। কেননা এই বিচারকে কেন্দ্র করে সরকারকে যে চাপে ফেলতে চেয়েছিল, তা সফল হয়নি। আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করেই যুদ্ধাপরাধ বিচার কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা করছে সরকার। তবে যুদ্ধাপরাধ বিচার ছাড়াও অন্যান্য ইস্যুতে সরকারকে চাপে ফেলতে নতুন করে লবিস্ট নিয়োগ করেছে বিএনপি। জাতীয় নির্বাচন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ইত্যাদি বিষয়ে সরকারকে চাপে রাখতে চাইছে। আর এ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীতি নির্ধারণী মহলে লবিং অব্যাহত রাখতে চায় বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে নতুন করে লবিস্ট নিয়োগ করেছে দলটি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম মঙ্গলবার সাংবাদিক মুখোমুখি হয়ে জানান, ওয়াশিংটনে বিএনপি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করে সরকারের বিরুদ্ধে অপতৎপরতা চালাচ্ছে। তবে তাদের এ অর্থের উৎস অনুসন্ধান করবে সরকার। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমেও জানতে চাওয়া হবে, এ অর্থের উৎস কোথায়। এছাড়া বিএনপি যেহেতু নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত একটি রাজনৈতিক দল, সেহেতু নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমেও এ বিষয়ে তদন্ত করার জন্য আমরা অনুরোধ জানাব।

যুদ্ধাপরাধ বিচার ঠেকাতে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করে বিএনপি-জামায়াত জোট।

দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আকিন গাম্পে কাজ করছে প্রায় এক হাজার আইনজীবী ও অন্যান্য পেশাজীবী। তাদের প্রধান অফিস ওয়াশিংটনে। এছাড়াও নিউইয়র্ক, লস এ্যাঞ্জেলস, সান ফ্রান্সিসকো, ফিলাডেলফিয়া, হিউস্টন, অস্টিন, ডালাস, লন্ডন, জেনেভা, ফ্রাঙ্কফ্রুট, মস্কো, আবুধাবী, দুবাই, বেইজিং ও হংকংয়ে অফিস রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করে।

প্রকাশিত : ২৮ অক্টোবর ২০১৫

২৮/১০/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: