১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এশিয়ার শ্রেষ্ঠ গবর্নরকে আন্তরিক অভিনন্দন


আজ এ কথাটা স্বীকার করতে হবে, একুশ শতকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ও অগ্রগতি বিস্ময়কর। ১৯৪৭ সালের বঙ্গ বিভাগের পর অবিভক্ত বাংলার কলকাতা শহরসহ শিল্পোন্নত এলাকা হারিয়ে কেবলমাত্র কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ কোনোদিন অর্থনৈতিকভাবে ভায়াবল হবে এ কথা বহু অর্থনীতিবিদ ভাবতে পারেননি। পাকিস্তানের অবাঙালী শাসকেরা তো বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) আরও সর্বনাশ ঘটিয়েছিলেন। তারা বাংলাদেশকে শোষণ করে পশ্চিম পাকিস্তানকে শিল্পোন্নত করেছেন এবং তাদের শিল্পোৎপাদনের একচেটিয়া মার্কেটে পরিণত করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানকে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তার অর্থনীতিকে বিদেশী সাহায্য-নির্ভরতা কাটিয়ে উঠে স্বাবলম্বী করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি। তাই হেনরি কিসিঞ্জার অবজ্ঞাভরে বলতে পেরেছিলেন, ‘বাংলাদেশ হচ্ছে তলাবিহীন ঝুড়ি।’ বঙ্গবন্ধু সরকার দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত ও স্বাবলম্বী করে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সফল হতে পারেননি। দেশের কায়েমী স্বার্থ, স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক চক্র এবং বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সম্মিলিত হয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা এবং তার সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে।

তারপরের দীর্ঘ ইতিহাস বাংলাদেশের জন্য পশ্চাৎপদতা ও পরাভবের ইতিহাস। সামরিক ও স্বৈরাচারী সরকারগুলোর অভিভাবকত্বে দেশে একটি লুটেরা নব্যধনী শ্রেণী গড়ে ওঠে। দেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে বিদেশী সাহায্য-নির্ভর হয়ে পড়ে। এই বিদেশী সাহায্যের বিভিন্ন শর্ত পালন করতে গিয়ে দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক উন্নতির বিকাশ রুদ্ধ হয়।

এই নব্য লুটেরা শ্রেণীর মধ্য থেকেই জন্ম নেয় দুর্ধর্ষ সিন্ডিকেট ও মাফিয়াতন্ত্র। দেশে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস লাগামহীন হয়ে ওঠে। দেশে চলে নব্য ও নীতিবর্জিত ধনীদের অবাধ লুণ্ঠন আর ক্ষমতায় বসে স্বৈরাচারী শাসক ও তাদের মন্ত্রীরা জনগণকে দেন অন্তঃসারশূন্য উন্নয়নের ভাষণ। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে দাবি করেছিলেন, তার সরকারের আমলে দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে। ফলে দেশে একটা কথা রটে গিয়েছিল। কথাটা হলো, ‘ইংরেজ আমলে ছিল শাসন, পাকিস্তান আমলে ছিল শোষণ আর এখন আছে শুধু নেতাদের ভাষণ।’

এই দৃশ্যপটটি বদলে গেছে বর্তমান হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর। অথচ দৃশ্যপটটি বদলাবার কথা ছিল না। ২০০৮ সালে দেশের যে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অরাজকতার মধ্যে হাসিনা সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেন, সেই অবস্থায় দুর্নীতিগ্রস্ত একটি প্রশাসনের আধিপত্য, রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ব্যাপকতা একটি সুশীল সমাজের (অর্ধ নোবেল লরিয়েটসহ) ক্রমাগত বিরোধিতা, দেশী-বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের অবিরাম প্রচারণার মুখে এই সরকার বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন সেই আশাই অনেকে করেননি। কিন্তু আজ সাত বছর অতিক্রম করতে চলেছে, দেখা যাচ্ছে হাসিনা সরকার শুধু টিকে থাকেননি; দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছেন।

বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ ও মঙ্গা এখন নেই। যে দেশটি ছিল খাদ্যশস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে দারুণ ঘাটতির দেশ, সেই দেশ এখন উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য বিদেশ রফতানি করছে। দেশে অর্থনৈতিক উন্নতির একটি অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় অভাবনীয়। জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে চলেছে। ‘তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ’ থেকে বাংলাদেশ যে আজ সারাবিশ্বের প্রশংসিত একটি উন্নয়নমুখী দেশে পরিণত হয়েছে, তার জন্য বর্তমান হাসিনা সরকার অবশ্যই কৃতিত্বের অধিকারী।

এই কৃতিত্ব রাতারাতি অর্জিত হয়নি। আলাদীনের জাদুই চেরাগ দ্বারাও এই সাফল্য অর্জিত হয়নি। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার সাহস ও দূরদর্শিতা (যা তিনি পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যাপারেও দেখিয়েছেন) এবং তার অর্থনৈতিক সহকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টার কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের প্রথম বাজেটকেই একশ্রেণীর অর্থনীতিবিদ অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী, লক্ষ্যে পৌঁছতে অক্ষম একটি বাজেট বলে সমালোচনা করেছিলেন। তারপর তিনি আরও কয়েকটি বাজেট ও সম্পূরক বাজেট দিয়েছেন। অর্থনীতির উন্নতিকে তা গতি দিয়েছে, শ্লথ করেনি।

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আরও একজনের নাম উল্লেখ করতে হয়। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপর্যয়ের সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সমুন্নত রেখেছেন, দেশের অর্থনীতিতে তার প্রতিক্রিয়া ব্যাপ্ত হতে দেননি। দেশের মুদ্রামান অক্ষুণœ রেখেছেন, কৃষিপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রেখেছেন এবং সবচাইতে বড় কথা, দরিদ্র ও অশিক্ষিত চাষীর জন্যও ব্যাংকিংয়ের সহজ সার্ভিস প্রবর্তন করেছেন। তা উন্নত ব্যাংকিংয়ের দেশগুলোরও প্রশংসা অর্জন করেছে।

বাংলাদেশ সর্ব সমস্যা মুক্ত হয়েছে এ কথা কেউ বলবে না। আমি এই লেখার শুরুতেই বলেছি, দেশটির প্রাপ্তি ও অগ্রগতি বিস্ময়কর। এই বিস্ময়ের একটি কারণ, বাংলাদেশ এখনও নানা জটিল সমস্যায় জর্জরিত। তার সব অর্জন ও প্রাপ্তিকে ম্লান করে দিচ্ছে দুর্র্নীতি ও সন্ত্রাস। এই দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বাধার মুখে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি ছিল অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু সেই অসম্ভব সম্ভব করেছে বাংলাদেশ। একদিকে সে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ছে, অন্যদিকে এই লড়াইয়ের মধ্যেও অর্থনৈতিক উন্নতির ধারাকে অব্যাহত রেখেছে।

বাংলাদেশের এই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির স্বীকৃতি দিয়েছে সারাবিশ্বই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতি সম্প্রতিও জাতিসংঘে সম্মানিত হয়েছেন। বিশ্বের জলবায়ু রক্ষায় তার অক্লান্ত সংগ্রামের জন্য ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ পদক লাভ করেছেন। অন্যদিকে আরেকটি সম্মান লাভ করেছেন তার মনোনীত বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান। তিনি সম্প্রতি পেরুর রাজধানী লিমায় শেরাটন হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘এশিয়ার শ্রেষ্ঠ কেন্দ্রীয় ব্যাংক গবর্নর ২০১৫’ এই পুরস্কারটি গ্রহণ করেছেন। তার এই সম্মানে সারাদেশ সম্মানিত হলো। হাসিনা সরকারও সম্মানিত হলেন। আমিও ব্যক্তিগতভাবে গর্বিত, কারণ তিনি আমার ব্যক্তিগত বন্ধু, ছোট ভাইয়ের মতো।

খবরে বলা হয়েছে, ‘দেশের সমষ্টিগত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি ব্যাংকিংয়ে সামাজিক দায়বোধ সৃষ্টি করা, সবুজ অর্থায়ন ও টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সাময়িকী ‘দি ইমার্জিং মার্কেটস’ এই পুরস্কার দেয়। এই সাময়িকীর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক টবি ফিলদেস এবং গ্লোবাল ক্যাপিটালের ডেপুটি ডিরেক্টর রুদ বেড্ডোস ড. আতিউর রহমানের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন।

এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বলা হয়েছে, ‘গবর্নর ড. আতিউর রহমান গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের ৬ শতাংশের ওপর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, উদ্ভাবনীমূলক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রমের মাধ্যমে দ্রুত দারিদ্র্য হ্রাস, দরিদ্র চাষীদের দুয়ার পর্যন্ত ব্যাংকিং সার্ভিসের সুযোগ-সুবিধা প্রসার, বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ক্রমবর্ধমান রিজার্ভ সংরক্ষণে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তারই স্বীকৃতিস্বরূপ এ পুরস্কার তাকে দেয়া হলো।’

ড. আতিউর রহমানের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এই প্রথম নয়। গত জানুয়ারি মাসে দি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকার সাময়িকী ‘দি ব্যাংকার’ কর্তৃক তিনি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার শ্রেষ্ঠ গবর্নর নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে তিনি ভারতের এশিয়া সোসাইটির কাছ থেকে ‘ইন্দিরা গান্ধী স্বর্ণস্মারক ২০১১’ পান। তাছাড়া পেয়েছেন আরও অসংখ্য পুরস্কার। এর আগে পাকিস্তান আমল থেকে আর কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংক গবর্নর এ জাতীয় আন্তর্জাতিক সম্মান ও স্বীকৃতি পাননি। এই কৃতিত্ব ড. আতিউর রহমানের জন্য ব্যক্তিগত সম্মান বহন করলেও হাসিনা সরকার, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য এটা একটা বিরাট সম্মান।

যে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সম্পর্কে অধিকাংশ সময় মুরুব্বিয়ানা দেখায়, সেই ব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট আনেত্তি ডীন বলেছেন, ‘এশিয়ার সেরা গবর্নরের স্বীকৃতি ড. আতিউর রহমানের বিশাল সাফল্যেরই স্বীকৃতি। তার সাফল্য আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে সহজ অর্থায়নে সহায়তা করবে।’ এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সম্মানে ড. আতিউর রহমান অভিভূত হলেও তিনি বিনম্রভাবে এই পুরস্কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উৎসর্গ করেছেন। বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অব্যাহত সমর্থনে বাংলাদেশ ব্যাংকে উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণ করা তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে।’

এই কথাটিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবর্নর বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া উন্নয়নের রূপকল্পকে প্রাধান্য দিয়ে গৃহীত আমাদের ‘ডাউন টু আর্থ এ্যাপ্রোচ’ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক আর্থিক সঙ্কটের প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ঝুঁকি মোকাবেলা করে ব্যাপকভিত্তিক আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিকে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক গড় জিডিপির প্রায় দ্বিগুণহারে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। মিলিনিয়াম উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাফল্য লাভের পর বাংলাদেশ এখন টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার দিকে যাত্রা শুরু করেছে। বাংলাদেশে ‘তরল মুদ্রা সঙ্কটের’ সময় শেখ হাসিনার সাহসী নির্দেশনায় গবর্নর যে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সে কথাও তিনি উল্লেখ করতে ভোলেননি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকিংয়ে অভিজ্ঞ একজন ব্যাংক গবর্নরের দরকার হওয়ায় বঙ্গবন্ধু নাজির আহমদকে ডেকে এনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর পদে বসিয়েছিলেন। তিনি স্বাধীনতার পরপরই দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও অর্থনীতি যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল, তার মোকাবেলা করেছিলেন। শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশে বিএনপি আমলের অরাজক অর্থনীতিকে স্বাভাবিক করার জন্য যখন ড. আতিউর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর নিযুক্ত করেন, তখন অনেকে তার বয়স ও অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চেয়েছিলেন। এখন দেখা যাচ্ছে শেখ হাসিনা যোগ্য ব্যক্তিকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এই গবর্নর এশিয়ার শ্রেষ্ঠ গবর্নর হিসেবে সম্মান ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাকে দেশের মানুষের সঙ্গে আমিও আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

লন্ডন, ২৭ অক্টোবর, মঙ্গলবার, ২০১৫