২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

দেশে ফিরেও গীতা ঘরে ফিরলেন না


দেশে ফিরেও গীতা ঘরে ফিরলেন না

অনলাইন ডেস্ক ॥ চৌদ্দ বছর আগে সমঝোতা এক্সপ্রেসের কামরায় একা বসেছিল মেয়েটা। বছর আষ্টেক বয়স তখন। কানে শোনে না, কথাও বলে না। লাহৌর স্টেশনে তাকে আবিষ্কার করেছিলেন পাকিস্তান রেঞ্জার্স-এর জওয়ানরা। আজ লাল-সাদা সালোয়ার কামিজ পরে ২৩ বছরের তরুণী দেশে ফিরল বিমানে।

করাচির উড়ান রাজধানীর বিমানবন্দরে মাটি ছুঁল এ দিন সকাল সাড়ে এগারোটায়।

দেশের মেয়ে দেশে এল ভারত-পাকিস্তানের রুক্ষ সম্পর্কে এক পশলা সৌহার্দ্যের হাওয়া বইয়ে দিয়ে। আর এই গোটা ঘটনাটা সম্ভব হয়ে উঠল বলিউডের সৌজন্যে। সলমন খান অভিনীত ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ গল্পকে সত্যি করে তুলল। পাকিস্তানের এক মূক-বধির বালিকাকে তার দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার কাহিনি বলেছিলেন সলমন। তার পরেই সংবাদমাধ্যমের সামনে আসে গীতার কথা। সমঝোতা এক্সপ্রেসে হারিয়ে যাওয়া সেই মেয়ে এতগুলো বছর পাকিস্তানেই একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাছে যত্নে-আদরে ছিল। কিন্তু দেশের মাটির টান তো ফিকে হয়নি! শুরু হয়ে যায় গীতাকে ফেরানোর তোড়জোড়। বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ নিজে উদ্যোগী হন। গীতার বাবা-মার খোঁজ চলতে থাকে দেশ জুড়ে। অল্প কয়েক দিন আগে বিহারের একটি পরিবারের ছবি দেখে নিজের বাবা-মা বলে চিহ্নিত করেছিল গীতা। তার পরেই তার দেশে ফেরার আয়োজন চূড়ান্ত হয়। পরিবারের সঙ্গে মধুর মিলন অবশ্য আজ হল না। কারণ বিমানবন্দরে ওই পরিবারকে সামনাসামনি দেখে গীতা আর তাদের চিনতে পারেননি।

এখন কী হবে? ঠিক হয়েছে, গীতাকে আপাতত কেন্দ্রীয় সরকারের একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হবে। ওই পরিবারের সঙ্গে তার ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে। না মিললে আবার নতুন করে শুরু হবে খোঁজ। আর যদি মিলে যায়? তার পরেও যদি গীতা তাদের বাবা-মা বলে স্বীকার করতে না চান? সুষমা জানাচ্ছেন, ‘‘তা হলে জটিল অবস্থার সৃষ্টি হবে। সেক্ষেত্রে আমরা তাড়াহুড়ো করব না। ওদের আবার আলাদা আলাদা করে আলোচনায় বসাব।’’

গীতাকে ফেরানোর জন্য গত কয়েক মাস ধরে প্রবল চেষ্টা করে গিয়েছেন সুষমা। আজ তাই দিনটিকে উৎসবমুখর করে তুলতে চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি বিদেশ মন্ত্রক। গীতার সঙ্গেই এ দেশে এসেছেন এত দিন তাঁকে আগলে রাখা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার বিলকিস ইধি। তাঁর নাতি-নাতনি সাদ আর সাবাও এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে বিলকিসের সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, ‘‘এতগুলো বছর ধরে গীতাকে আপনারা যে স্নেহের সঙ্গে কাছে রেখেছিলেন, কোনও শব্দেই তার বর্ণনা হয় না।’’ ইধি ফাউন্ডেশনকে মোদী এক কোটি টাকার অনুদান দিচ্ছেন। ইধি পরিবারের আদি বাড়ি গুজরাতের জুনাগড়ে জানার পরে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণও জানিয়েছেন। এ ছাড়াও বিলকিস এবং তাঁর সংস্থার সদস্যদের আগরা-সহ এ দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরিয়ে দেখাবেন বলে জানিয়েছেন সুষমা। এখানকার পাকিস্তানি হাইকমিশনার মনজুর আলি মেমনও বিলকিসদের জন্য বিশেষ অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করছেন। গীতার ভারতে ফেরাকে দু’দেশের জন্য এক আনন্দময় মুহূর্ত বলে বর্ণনা করে মেমন আশা প্রকাশ করেন, ভারতও নিশ্চয়ই ৪৫৯ জন নিরীহ পাক বন্দিকে এ বার মুক্তি দেবে! ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এই বিরল মাধুর্যের মাহেন্দ্রক্ষণটি ঘরের মাঠে রাজনৈতিক ভাবে কাজে লাগাতেও তৎপর হয়েছে বিজেপি। বিহারের বিজেপি নেতা সুশীল মোদী সকালেই টুইট করে বলেন, নরেন্দ্র মোদী পাকিস্তান থেকে নিয়ে এলেন বিহারের গীতাকে। এ বার কি নীতীশ কুমার অভিনন্দন জানাবেন তাঁকে! অসহিষ্ণুতার অভিযোগ নিয়ে কোণঠাসা কেন্দ্র আজ গীতার হাত ধরেই একটি পাল্টা বার্তা দিতে চেয়েছে। বিলকিসকে ইধিকে পাশে বসিয়ে বিদেশমন্ত্রী সহিষ্ণুতার জয়গান করে বলেছেন, বিলকিস মুম্বই থেকে হনুমান-কৃষ্ণর ছবি কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন গীতার জন্য!

যত্নের যে কোনও কমতি ছিল না, সে কথা বারবার জানিয়েছেন গীতা নিজেও। তবে দেশের জন্য মন কাঁদত তার পরেও। সাংকেতিক ভাষায় গীতা নিজেই এ দিন বলেন, দেশে ফিরে মনটা খুশিতে ভরে গিয়েছে। গীতা এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান। বিয়ের কথা ভাবছেন না। তাঁর সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করতে আসবেন বিলকিসরা।

মন ভাল করা এই আবহে একটু বিমর্ষ কেবল বিহারের জনার্দন মাহাতোর পরিবার। একে তো গীতা তাঁদের বাবা-মা বলে মানতে চাননি আজ। তার উপরে গীতাকে মালা পরাবেন বলে প্রস্তুত হয়ে এসেছিলেন ওঁরা। নিরাপত্তারক্ষীদের বাধায় সেটাও হয়নি।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা