মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ আগস্ট ২০১৭, ৮ ভাদ্র ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

হোসেনী দালান, সাভারের ব্যাংক ডাকাতি ও শিবির মেসের গ্রেনেড একই

প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর ২০১৫

শংকর কুমার দে ॥ পবিত্র আশুরার প্রস্তুতির রাতে রাজধানীর হোসেনী দালান এলাকায় তাজিয়া মিছিলের সমাবেশে হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেড আর পুলিশের এএসআই হত্যাকা-ের দায়ে গ্রেফতারকৃত শিবির নেতা মাসুদ রানার মেস থেকে উদ্ধারকৃত গ্রেনেডের ধরন এক ও অভিন্ন। পুলিশের এএসআই হত্যাকা-ের অভিযোগে জামায়াত-শিবিরের যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদেরই হোসেনী দালান তাজিয়া মিছিলে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হোসেনী দালানের তাজিয়া মিছিলে হামলার ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা দায়ের করার পর সন্দেহজনকভাবে ৪ জনকে আটক করে পুলিশ। এই চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি পুলিশের এএসআই হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ঢাকায় ৮ জন ও ঢাকার বাইরে ২৮ জনসহ ৩৬ জনকে গ্রেফতার করে তাজিয়া মিছিলে গ্রেনেড হামলার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে জামায়াতÑশিবিরের সম্পৃক্ততার বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে তদন্তকারীরা। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দেশে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বিদেশীদের হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিতে একের পর এক নাশকতার ঘটনা ঘটানোর নীলনক্সার ছকের অংশ হিসেবেই হোসেনী দালানের তাজিয়া মিছিলের গ্রেনেড হামলা ঘটানো হয়েছে এবং পুলিশের এএসআই হত্যাকা-ের ঘটনাও একই যোগসূত্রে গাঁথা। তদন্তে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এ ধরনের তথ্য জানা গেছে।

তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে, দেশে তৈরি গ্রেনেড দিয়েই হোসেনী দালানে হামলা চালানো হয়েছে। একই ধরনের গ্রেনেড পাওয়া গেছে চট্টগ্রামের জঙ্গী সংগঠন ‘হামজা ব্রিগেডের’ আস্তানায়। সাভারে ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় ব্যবহৃত ও উদ্ধারকৃত গ্রেনেডও একই ধরনের। দারুস সালাম চেকপোস্টে পুলিশের এএসআই হত্যাকা-ের পর ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে গ্রেফতারকৃত জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার মাসুদ রানার মেস থেকে উদ্ধারকৃত গ্রেনেডগুলোও একই ধরনের ও অভিন্ন। হোসেনী দালান থেকে উদ্ধার করা গ্রেনেডগুলোর সঙ্গে কামরাঙ্গীরচর থেকে উদ্ধার করা গ্রেনেডের হুবহু মিল রয়েছে। সব হাতে তৈরি গ্রেনেড। আর্কিটেকচার ডিজাইনও গ্রেনেডের মতোই। বৃহস্পতিবার রাতে গাবতলীতে চেকপোস্টে দায়িত্বকালে পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ইব্রাহিম মোল্লা চুরিকাঘাতে নিহতের পর কামরাঙ্গীরচরে মাসুদ রানা যে মেসে থাকত সে মেসে অভিযান চালিয়ে ৫টি হাতে তৈরি গ্রেনেড উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, হামলায় ব্যবহৃত বিস্ফোরক ‘হোম মেইড’। এগুলো দেশেই তৈরি করা হয়েছে। দারুস সালামে এএসআই হত্যায় যারা জড়িত তাদের আস্তানায়ও অভিযান চালিয়ে একই ধরনের বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। আমাদের বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, এর একটি পিন রয়েছে। পিনটি তুলে ফেলার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই এটার বিস্ফোরণ ঘটে।

হোসেনী দালানের ভেতরের চত্বর থেকেই নাকি বাইরে থেকে গ্রেনেডগুলো ছোড়া হয়েছে; তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, দুর্বৃত্তরা তাজিয়া মিছিলে আগেভাগেই আগত লোকজনের সঙ্গেই ভেতরে ঢুকে গিয়ে মিশে গিয়েছিল। গ্রেনেডগুলো যেখান থেকে ছোড়া হয় সেই স্থানটি ছিল অন্ধকার। ফলে সিসিটিভিতে তা স্পষ্টভাবে ধরা পড়েনি। তদন্তে প্রকাশ, হামলাকারীরা পাঁচটি গ্রেনেড নিয়ে এসেছিল। এর মধ্যে তিনটির বিস্ফোরণ হয়। দু’টি অক্ষত অব্স্থায় উদ্ধার করা হয়। এর একটি র‌্যাব নিষ্ক্রিয় করে। অপরটি করে গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেনেডে ব্যবহৃত তিনটি সেফটি ক্লিপই গতকাল উদ্ধার করা হয়েছে। হোসেনী দালান এলাকায় প্রায় তিন বছর আগে ১৬টি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল। ঘটনার তিন দিন আগে পুলিশ আরও ১৬টি ক্যামেরা লাগায়। মোট ৩২টি ক্যামেরার ফুটেজ এখন বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আসামিদের কাউকেই গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

প্রসঙ্গত, পবিত্র আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় গত শুক্রবার রাত ১টা ৫৮ মিনিটে হোসেনী দালান চত্বরে পরপর তিনটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মারা যায় সাজ্জাদ হোসেন সানজু (১৫) নামে এক স্কুলছাত্র। আহত হন শতাধিক। আহতদের ঢাকা মেডিক্যাল ও মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

তদন্তের তদারকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, পবিত্র আশুরার প্রস্তুতির রাতে রাজধানীর হোসেনী দালান এলাকায় তাজিয়া মিছিলে গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি কোন সাধারণ অপরাধের ঘটনা নয়, এটা রাজনৈতিক কারণে ঘটানো হয়েছে এটা নিশ্চিত। দুই বিদেশী হত্যাকা-ের ঘটনায় সরকার বিদেশী চাপ মোকাবেলা করে যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখনই রাজধানীর গাবতলীতে কর্তব্যরত পুলিশের এএসআইকে ছুরিকাঘাত করে হত্যাকা- ঘটানোর উদ্দেশ্যই হচ্ছে সরকারকে আরও বেকায়দায় ফেলে বিদেশীদের হস্তক্ষেপ সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়া। একই উদ্দেশ্যে পবিত্র আশুরার প্রস্তুতির রাতে রাজধানীর হোসেনী দালান এলাকায় তাজিয়া মিছিলে গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে।

তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে, হোসেনী দালানের ইমামবাড়া চত্বরে হামলার ঘটনায় কিলিং মিশনের চেয়ে রাজনৈতিক মিশন নিয়েই মাঠে নামানো হয়েছিল দুর্বৃত্তদের। কিলিং মিশনে বেশ কয়েকজন অংশ নিলেও গ্রেনেড নিক্ষেপের দায়িত্বে ছিল এক থেকে দু’জন। ওই সন্ত্রাসীরা গ্রেনেড নিক্ষেপের জন্য চত্বরের গোরস্থানটি নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নেয়। পরে তারা গোরস্থানের উত্তর পাশ থেকে পরপর পাঁচটি হাতে তৈরি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে থাকতে পারে, যার মধ্যে তিনটি বিস্ফোরণ হলেও দু’টি অবিস্ফোরিত থেকে যায়। দুর্বৃত্তরা দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের প্রাচীর টপকে পালিয়ে যায়। সন্দেহ এড়াতে শিয়াদের বেশেই ওই দুর্বৃত্তরা হোসেনী দালান চত্বরে প্রবেশ করেছিল। ঘটনার আগে সন্ত্রাসীরা কয়েকবার ওই এলাকাটি রেকিও করেছিল বলে মনে করা হচ্ছে।

অপরাধ বিষয়ক একজন গোয়েন্দা বিশ্লেষক বলেছেন, দেশে নিষিদ্ধ কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠনগুলো সক্রিয় হয়ে উঠছে। টার্গেট করে হামলা চালানো হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণে এরা বিভিন্নভাবে নাশকতা চালাচ্ছে। প্রতিনিয়তই পুলিশ, ব্লগার, মাজারভিত্তিক ফকির ও পীর’রা কোন না কোনভাবে এদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। পুরান ঢাকার হোসেনী দালান ইমামবাড়ায় শিয়াদের তাজিয়া মিছিলের ওপর বোমা হামলার ঘটনাটি এই কট্টরপন্থী গ্রুপগুলোর কাজ বলে সন্দেহের বাইরে নয়। তবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দেশে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য এটা যে রাজনৈতিক কারণে কোন সরকারবিরোধী মহলের কাজ, তা জানার জন্য কোন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয় না এবং জামায়াত-শিবির যে এসব নাশকতার নেপথ্যে থেকে কাজ করে যাচ্ছে, তা তদন্তেই বের হয়ে আসছে।

প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর ২০১৫

২৭/১০/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: