মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২২ আগস্ট ২০১৭, ৭ ভাদ্র ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

‘বড়ভাই’য়ের নির্দেশে- ॥ তাভেলাকে গুলি করে শূটার রুবেল ॥ আদালতে স্বীকারোক্তি

প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর ২০১৫
‘বড়ভাই’য়ের নির্দেশে- ॥ তাভেলাকে গুলি করে শূটার রুবেল ॥ আদালতে স্বীকারোক্তি
  • অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকার ও রাষ্ট্রকে চাপে রাখাই লক্ষ্য
  • আইএসকে জড়ানোও পূর্ব পরিকল্পনার অংশ
  • ভাড়াটে খুনীরাই তাভেলাকে হত্যা করে
  • তিন আসামি ৮ দিনের রিমান্ডে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকার ও রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে রাখতেই বিদেশী হত্যার টার্গেট করা হয়। হত্যার পর ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন আইএসের হয়ে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ নামে একটি ওয়েবসাইটে দায় স্বীকারও ছিল পূর্বপরিকল্পনার অংশ। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দায় স্বীকার করে বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছিল কিনা সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। দেশকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপের মুখে রাখার অংশ হিসেবে হত্যার শিকার হন ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলা। সিজার তাভেলা পরিস্থিতির শিকার মাত্র। তাঁর জায়গায় অন্য কোন সাদা চামড়ার বিদেশী নাগরিক হলেও তার পরিণতিও একই হতো। চলতি বছরের শুরুতে যারা দেশব্যাপী বোমা হামলা, আগুন সন্ত্রাস, পেট্রোলবোমা হামলাসহ নাশকতা চালিয়েছে তাদের যোগসাজশেই তাভেলা হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে। আর হত্যাকা- সরাসরি তদারকির দায়িত্ব পালন করে এক ‘বড়ভাই’।

পুলিশী অভিযানে তাভেলাকে গুলি চালিয়ে হত্যাকারী ও তার দুই সহযোগীসহ ৪ জন গ্রেফতার হয়েছে। এদের মধ্যে ৩ জন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। অন্যজন মোটরসাইকেল দিয়ে হত্যাকা-ে সহযোগিতা করে। হত্যাকা-ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলও উদ্ধার হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একজন হত্যাকারী শূটার রুবেল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। অন্য ৩ জনকে ৮ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। হত্যাকা-ে ব্যবহৃত একমাত্র আগ্নেয়াস্ত্রটি উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত আছে। তাভেলার খুনীরা গ্রেফতার হওয়ায় গুলশান কূটনীতিকপাড়াজুড়ে স্বস্তি ফিরেছে। বিদেশীরা ফিরে পেয়েছেন স্বস্তি।

সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানালেন। তিনি আরও জানান, রবিবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইতালীয় নাগরিক তাভেলা হত্যার সঙ্গে জড়িত ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গুলশান থেকে মোঃ রাসেল চৌধুরী ওরফে চাক্কী রাসেল ওরফে বিদ্যুৎ রাসেল, বাড্ডার সাঁতারকুল থেকে মিনহাজুল আরিফিন রাসেল ওরফে ভাগ্নে রাসেল ওরফে কালা রাসেল, মধ্যবাড্ডা থেকে তামজিদ আহম্মেদ রুবেল ওরফে মোবাইল রুবেল ওরফে শূটার রুবেল ও শাখাওয়াত হোসেন ওরফে শরীফকে গ্রেফতার করা হয়।

তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় হত্যাকা-ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি। যদিও আগ্নেয়াস্ত্রটি এখনও উদ্ধার হয়নি। তবে চেষ্টা চলছে।

গ্রেফতারকৃতদের দেয়া বরাত দিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, হত্যাকা-ের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এক বড় ভাইয়ের নির্দেশে এবং মোটা অঙ্কের টাকার লোভ দেখিয়ে হত্যাকা-টি করানো হয়। সরকারকে চাপে ফেলে বিব্রত করা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তারা এ হত্যাকা- ঘটায়।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মিনহাজুল আরিফিন রাসেল ও মোঃ রাসেল চৌধুরী ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত। বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারা। এ ছাড়া তামজিদ আহম্মেদ রুবেল স্থানীয়ভাবে দুর্ধর্ষ ও ঠা-ামাথার খুনী, সাখাওয়াত হোসেন ইয়াবা ব্যবসায়ী ও অবৈধ অস্ত্র সরবরাহের মতো অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত।

পুলিশ কমিশনার বলেন, বিদেশী নাগরিককে হত্যা করতে ওই বড় ভাই মোটা অঙ্কের টাকায় গ্রেফতারকৃতদের সঙ্গে চুক্তি করে। চুক্তির অর্ধেক টাকা ইতোমধ্যেই পরিশোধ করে ওই বড় ভাই। বাকি অর্ধেক টাকা এখনও পরিশোধ করেনি। যদিও তিনি টাকার পরিমাণ উল্লেখ করেননি। ঘটনাস্থলে শরীফ ছাড়া বাকি তিনজন উপস্থিত ছিল।

চুক্তি অনুযায়ী হত্যাকারীরা শরীফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি একটি বিশেষ অপারেশন চালানোর কথা বলে নিয়ে যায়। মোটরসাইকেলযোগে শরীফ ছাড়া অন্য তিনজন গুলশান ৯০ ও ৮৩ নম্বর সড়কসংলগ্ন তিন রাস্তার মোড়ে অবস্থান নেয়। মিনহাজুল আরিফিন রাসেল ওরফে ভাগ্নে রাসেল ওরফে কালা রাসেল মোটরসাইকেলটি ৮৩ নম্বর সড়কের মাথায় রেখে উত্তর দিক করে মোটরসাইকেলেই বসে থাকে। রুবেল নেমে ৯০ নম্বর সড়কের মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। আর রাসেল চৌধুরী মোটরসাইকেল থেকে নেমে পাশেই দাঁড়িয়ে থেকে পুরো এলাকার ওপর নজর রাখতে থাকে। এ সময় তাভেলা সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। বিদেশী এবং সাদা চামড়ার হওয়ায় তাকেই হত্যার টার্গেটে পরিণত করে শূটার রুবেল। পর পর গুলি চালিয়ে তাকে হত্যা করেই দ্রুত মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যায়।

কমিশনার বলেন, একজন বড় ভাইয়ের নির্দেশে তাভেলা হত্যাকা- সংঘটিত হয়। ওই বড় ভাইকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে তিনি তদন্তের স্বার্থে ওই বড় ভাইয়ের নাম, ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা রাজনৈতিক পরিচয় জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। তাকে গ্রেফতারের পরেই এ বিষয়ে জানানো হবে।

গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, হত্যার দায় স্বীকার করে ঘটনার পর সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ নামের একটি ওয়েবসাইট থেকে ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন আইএসের নামে বিবৃতি প্রচারিত হয়। মূলত বাংলাদেশে কোন আইএসের তৎপরতা নেই। তবে আইএসের কর্মকা-কে অনুসরণকারী থাকতে পারে। সরাসরি আইএসের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা বা জঙ্গী সংগঠনটির তৎপরতা থাকার কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। সাইটটির পরিচালক রিটা কাৎজে। একমাত্র তার ওয়েবসাইট ছাড়া অন্য কোন সাইটে তাভেলা হত্যাসংক্রান্ত কোন বিবৃতি প্রকাশিত হয়নি। ইতোপূর্বে এই সাইটির কোন অস্তিত্বের কথাও জানা যায়নি। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পরিকল্পিত হত্যাকা-কে আইএস নামে চালিয়ে দিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গী সংগঠনটির তৎপরতা থাকার অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এ বিষয়ে রিটা কাৎজের সঙ্গে ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে তিনি কোন উত্তর দেননি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃতরা রাজধানীর মধ্যবাড্ডার যুবদল নেতাকর্মী। চলতি বছরের ৩ মাসে দেশব্যাপী টানা অবরোধ-হরতালে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট বিদেশী হত্যাকা- ঘটিয়ে নতুন করে দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করে। বিদেশী হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রাখার চেষ্টা চালায়। তার অংশ হিসেবে দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে বিদেশী হত্যার ঘটনা ঘটানো হয়। হত্যাকা- তদারকির দায়িত্ব পালন করেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। সোহেলসহ তার সহযোগীদের গ্রেফতারে বিমানবন্দর ও সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে ছবিসহ ওয়্যারলেস মেসেজ পাঠানো হয়েছে।

আমাদের কোর্ট রিপোর্টার জানান, আসামিদের ঢাকার সিএমএম আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। মহানগর হাকিম মাহবুবুর রহমান শুনানি শেষে ৩ জনকে ৮ দিনের করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এরপর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শাহরিয়ার মাহমুদ আদনানের আদালতে শূটার রুবেল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ক্রিকেট দল পূর্ব নির্ধারিত বাংলাদেশ সফর বাতিল ঘোষণা করে। এর কয়েক ঘণ্টা পর সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে গুলশান-২ নম্বরের ৭০ নম্বর সড়কে হত্যা করা হয় নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এনজিও আইসিসিও কো-অপারেশনের ‘প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি’ কর্মসূচীর প্রকল্প ব্যবস্থাপক সিজার তাভেলাকে (৩০)। এনজিওটি বাংলাদেশে পানি, স্যানিটেশন, রিফিউজি সমস্যা ও পুনর্বাসনসহ নানা সমাজসেবামূলক কাজ করে থাকে। হত্যাকা-ের ঘটনায় আইসিসিওর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হেলেন ভান ডার বেক বাদী হয়ে গুলশান মডেল থানায় অজ্ঞাত খুনীদের আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

নিহত সিজার ইতালির মিলান শহরের নাগরিক ছিলেন। প্রায় ২ বছর আগে স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যায়। ১৬ বছর বয়সী মেয়ে ও ডিভোর্স হওয়া স্ত্রী মিলানেই বসবাস করে। চলতি বছরের ২৫ মে’তে প্রায় ৬ লাখ টাকা বেতনে বাংলাদেশে এনজিওটিতে যোগদান করেছিলেন। বসবাস করছিলেন গুলশান-২ নম্বরের ৫৪ নম্বর সড়কের ১১/বি নম্বর বাড়ির ৫/২ ফ্ল্যাটে। গত জুন মাসে নার্জার নামে এক জার্মান বান্ধবী এসে দুই সপ্তাহ থেকে যান ওই ফ্ল্যাটে। এরপর থেকে তিনি একাই থাকতেন। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সদস্য ছিলেন। স্কুলটির সুইমিং পুলে প্রতিদিন সাঁতার কেটে বাড়ি ফেরার সময় তাকে হত্যা করা হয়। সিজারের মরদেহ ইতালিতে পাঠানো হয়েছে।

প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর ২০১৫

২৭/১০/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: