মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর ২০১৫
  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

কৈশোরের আরও স্মৃতি

(২৬ অক্টোবরের পর)

১৯৪৬ সালে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের দুই শীর্ষ নেতা সিলেট ভ্রমণে আসেন। ২ ও ৩ মার্চে প্রথমে আসলেন মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি সিলেটের মুসলিম লীগ নেতা আজমল আলী চৌধুরীর কালিঘাটস্থ বাড়িতে অবস্থান করেন। তিনি সিলেটে পৌঁছান ট্রেনযোগে সকাল ৮/১০টার সময়। তাকে সুসজ্জিত ট্রাকে বসিয়ে কালিঘাটে নিয়ে আসা হয়। সেখানে বেলা প্রায় আড়াইটায় একদল ছাত্রদের তিনি দেখা দেন। সেখানে ছাত্রদলের নেতৃত্ব দেন সিলেটের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা তসাদ্দুক আহমদ। আমরা সেই ছাত্রদলে ছিলাম। জিন্নাহ সাহেব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে আমাদের ঐক্য ও শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকতে নসিহত করেন। পরদিন তিনি শাহী ঈদগাহ্্তে পরপর তিনটি সভায় বক্তব্য রাখেন। প্রথম সভাটি ছিল ছাত্রদের সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন আসাম মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি শিলচরের চৌধুরী এ টি মসউদ (পরবর্তীকালে তিনি হন ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি ও বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার)। দ্বিতীয় সভাটি হয় জনসভা। আর তাতে সভাপতিত্ব করেন সিলেটের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও আসাম আইন সভার মুসলিমলীগ দলের ডেপুটি দলপতি প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদ (তিনি পরে পূর্ব বাংলায়ও শিক্ষামন্ত্রী হন)। তৃতীয় সভাটি হয় মুসলিম মহিলা লীগের এবং তাতেও সভাপতিত্ব করেন আবদুল হামিদ। মহিলারা ঈদগাহ্্র টিলার উপরের ময়দানে অবস্থান নেন। সভামঞ্চ এই স্তরেই স্থাপন করা হয়েছিল। আমি মুকুলমেলার নামে একটি অভ্যর্থনা বক্তৃতা ছেপে মঞ্চে জিন্নাহ সাহেবের পাদদেশে এম এ এইচ ইস্পাহানির পাশে স্থান করে নিই। সময়াভাবে আমি আমার লিখিত বক্তব্য পাঠ করতে ব্যর্থ হয়ে বাঁধাই করা ভাষণটি ইস্পাহানি সাহেবের কাছে হস্তান্তর করি। আমার আব্বা এই সফরসূচির নেতৃস্থানীয় সংগঠক ছিলেন বলে আমি বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলাম। জিন্নাহ সাহেবের একটি বক্তব্য এখনো মনে আছে। তিনি বলেন, এরাব সব ফরংপরঢ়ষরহব ধহফ ঁহরঃু ধহফ ও ংযধষষ মরাব ুড়ঁ চধশরংঃধহ. তার বক্তৃতা তিনটিই ছিল ইংরেজীতে। তিনি ট্রেনে আসেন স্যুট পরিহিত বেশে এবং সভায় আসেন শেরওয়ানি ও চুশত পাজামা পরে। সভা শেষে তিনি সড়কপথে শিলং পাড়ি দেন।

এই বছরের শেষ দিকে ১৮ ডিসেম্বরে আসেন শিলং থেকে সড়কপথে কংগ্রেস নেতা প-িত জওহরলাল নেহরু। তিনি এর আগেও সিলেটে একবার এসেছিলেন। হিন্দু-মুসলমান আমরা যারা কিশোর আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম তাদের মধ্যে খুব সুসম্পর্ক ছিল। আমরা জিন্নাহ সাহেবের সভায় তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে জায়গা রাখি। তারাও একইভাবে আমাদের জন্য মঞ্চের কাছেই জায়গা করে দেয়। প-িত নেহরু সভা করেন বর্তমান কোর্ট পয়েন্টের পাশে। সিলেট শহরের সব জনসভার মাঠ গোবিন্দ পার্কে। এটি বর্তমানে হাসান মার্কেট নামে পরিচিত। এই সভাটি ছিল দুপুর বেলার আগেই। প-িত নেহরুর তাড়া ছিল, কেননা তিনি সেদিন বিকেলেই ট্রেনে সিলেট ছাড়েন। কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ প-িত নেহরু ছিলেন সুপুরুষ, কিন্তু আমার মনে হলো বেশ বদরাগী। জনসভার শুরুর দিকে বেশ হৈ চৈ হচ্ছিল। প-িত নেহরু মঞ্চ থেকে হাতের ইশারায় সবাইকে শান্ত হতে বার বার অনুরোধ করছিলেন। একসময় হৈ চৈ বন্ধ করার উদ্দেশ্য তিনি প্রায় মঞ্চ থেকে দ্রুতবেগে নেমে জনতার দিকে ছুটলেন। তখন সংগঠকরা ও মঞ্চে যেসব নেতৃবৃন্দ ছিলেন তারা তাকে অনেক অনুরোধ করে আবার মঞ্চে তার নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে দেন।

আমাদের কৈশোরে ইংরেজীতে কথা বলা বেশ বাহাদুরির বিষয় ছিল। রাজভাষা থেকে ইংরেজী বিতাড়িত হলো ১৯৪৭ সালে, কিন্তু তারপরও ইংরেজীর কদর ছিল বেশি মাত্রায়। ১৯৪০ সাল পর্যন্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে ইংরেজী ছিল শিক্ষার মাধ্যম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী (১৯৩৪-৪৮) বাংলা ১৯৪০ সালে হলো শিক্ষার মাধ্যম। তাই সেই বছর থেকে ইংরেজী ছাড়া প্রতিটি পাঠ্যবই হলো বাংলায়। প্রবেশিকার পর উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে কিন্তু ইংরেজীই শিক্ষার মাধ্যম ছিল সম্ভবত ১৯৫৪ পর্যন্ত। আমরা ১৯৪৯ সালে কলেজে শুধু বাংলা ছাড়া সব বিষয় ইংরেজীতে পড়াশোনা করি। আমাদের বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণীতে এলো গাবুটিকির গ্রামের ছাত্র ফারুক উদ্দিন চৌধুরী এবং সে জায়গীর পেল কুমারপাড়ার এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে। সে বাড়িতে আবদুর রহিম ছিল আমাদের দুই ক্লাস নিচে। ফারুক চৌধুরী এবং আমি দু’জনই ইংরেজীতে অপেক্ষাকৃত উত্তম ছিলাম। আমরা নিজেদের মধ্যে প্রায়ই ইংরেজীতে কথোপকথন করতাম এবং অন্যরা যাতে দেখতে বা বুঝতে পারে সেজন্য কোন ছাত্র সমাহার দেখলে একটু বেশি করেই তা করতাম। আমরা যেমন চেয়েছি তেমন প্রতিফলও পেলাম। অন্যরা শ্রদ্ধাভরে আলোচনা করতে শুরু করল যে এরা ইংরেজীতে কথোপকথন করে। ফারুক চৌধুরীও ভালভাবে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো। তারপর যে বাড়িতে সে জায়গীর ছিল তারাই তার কলেজে ভর্তি ও অন্যান্য খরচাপাতি বহন করল। এই বাড়িতে ফারুক দুটি ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনার তদারকি করত অর্থাৎ তাদের গৃহশিক্ষক ছিল। ছাত্রীটি ছিল রিজিয়া বেগম এবং তার প্রতি ফারুক আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। ফারুক আমাকে জানাল যে তার গৃহকর্তা চান যে তাদের বিয়ে হয়ে গেলে ভাল। এখন ফারুকের পক্ষে প্রস্তাব দেবার কেউ নেই, তার সবচেয়ে বড় ভাই আতিক চৌধুরী পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে পশ্চিমে থাকেন এবং নিজেকে নিয়েই তিনি ব্যস্ত। আর দ্বিতীয় ভ্রাতা আশিক চৌধুরী আমাদের দু’বছরের সিনিয়র ছাত্র, কিন্তু তিনি ছন্নছাড়া লোক। তিনি প্রবেশিকা পাস করে বোম্বাই চলে গেছেন ভাগ্যের সন্ধানে। চলবে...

প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর ২০১৫

২৭/১০/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: