মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
১৭ আগস্ট ২০১৭, ২ ভাদ্র ১৪২৪, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

পাকিস্তানীরা তাদের রক্ষা করতে পারবে না

প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর ২০১৫
  • এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার

চাঞ্চল্যকর খবরই বলতে হবে। চুয়াল্লিশ বছর আগে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানীদের পরাজিত করেছে বাংলাদেশের মানুষ। এতকাল পর পাকিস্তানীদের আবার ডেকে আনতে চায় সেই তারা, যারা একাত্তরে গণহত্যা পরিচালনায় পাকিস্তানীদের সহযোগিতা ও সমর্থন করেছে এবং নিজেরাও গণহত্যায় অংশ নিয়েছে। বাঙালী জাতির কলঙ্ক হিসেবে রাষ্ট্রের বুকের ওপর চাপা পাথরের মতো তারা সেই থেকে দাঁড়িয়ে আছে। এই ডাকের উদ্দেশ্য একাত্তরের একজন গণহত্যাকারী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে সাকা চৌকে বাঙালীদের হাত থেকে রক্ষা করা। এর পূর্বে অন্য কায়দায় তারা যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু পারেনি। একাত্তরে পরাজিত হওয়ার পর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এই বিশ্বাসঘাতকদের ফেলে রেখে নিজেদের প্রাণ নিয়ে পাকিস্তানে ফিরে গিয়েছিল। পাকিস্তানীরা ভ-ামিতে শতভাগ পারদর্শী। ৯ মাস যাবত জানি দোস্তদের মতো সাকা চৌ ও গংয়ের সঙ্গে রেখে এবং তাদের দিয়ে অপকর্ম করিয়ে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর এদের ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে তারা পাকিস্তানে চলে যায়। কারণ, তারা বুঝেছিল যেসব মানুষ সদৃশ জীব স্বজাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে তারা হীনস্বার্থে পাকিস্তানের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করবে। তখন বাঙালী এই বিশ্বাসঘাতক দলের অনেকে পাকিস্তানী সিপাইদের পা জড়িয়ে ধরেছিল পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য। কিন্তু পাকি সিপাইদের সোজা উত্তর ছিল, গাদ্দারকে বিশ্বাস করা যায় না।

সাকা চৌ-এর পিতা পাকিস্তানের মশহুর সহযোগী ফজলুল কাদের চৌধুরী (ফকা চৌ.) একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর বর্মার দিকে পালিয়ে যাওয়ার সময় মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন ফকা চৌকে হত্যা করেনি, জেলে ঢুকিয়েছিল। জেলের অভ্যন্তরে ফকা চৌ-এর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। মরে বেঁচে গেছেন ফকা চৌ। তা না হলে বাপ-বেটা দু’জনেই আজ একই জায়গায় থাকতেন। সেই সময়ে, একাত্তরের ডিসেম্বরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী সাকা গংকে উদ্ধার বা সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেনি। ৪৪ বছর পর আল্লাহর ইচ্ছায় বাংলাদেশ আজ বহুগুণে সবদিক থেকে পাকিস্তানের চেয়ে সমৃদ্ধ ও ক্ষমতাশালী। এই সময়ে সাকা চৌ পাকিস্তানীদের সাহায্য চাইলেন। খড়কুটো ধরে বাঁচার শেষ চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা হবে না। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ওই পাঁচ পাকির সাফাই সাক্ষ্য দেয়ার সুযোগ আছে কিনা আমি বলতে পারব না। এ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, সে সুযোগ নেই, এটা নজিরবিহীন ঘটনা। আইনে যা-ই থাকুক না কেন পাকিস্তানীরা বাঙালীদের মনোভাব এবং শক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। সুতরাং সাকা চৌ-এর সাহায্যে বাংলাদেশে আসার আগে পাকিস্তানীরা নিশ্চয়ই স্মরণে রাখবেন মুক্তিযোদ্ধারা এখনও বেঁচে আছে এবং লক্ষ কোটি নতুন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়ে গেছে। এই মুক্তিযোদ্ধারা এখন পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি জাগ্রত এবং শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ। পত্রিকায় পড়লাম, সাকা চৌ-এর আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান পাকিস্তানী সাফাই সাক্ষী গ্রহণ করার জন্য সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করেছেন। যে পাঁচজন পাকিস্তানীর নাম সাফাই সাক্ষী হিসেবে পত্রিকায় এসেছে তার মধ্যে একজন হলেন গত শতকের পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, ফিরোজ খান নূনের নাতি রিয়াজ আহমেদ নূন। ফিরোজ খান নূন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাঙালী মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে খাঁটি মুসলমান মনে করতেন না। কে বা কারা তাকে বুঝিয়েছিলেন, বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষের সঠিকভাবে নাকি মুসলমানিত্ব হয় না। ফিরোজ খান নূনের সেই অপমানজনক কথা বাঙালীরা ভুলে যায়নি। রিয়াজ খান নূন নিশ্চয়ই তার পূর্ব পুরুষের ইতিহাস সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েই বাংলাদেশে আসবেন। পাঁচজন পাকিস্তানী ও তাদের কর্তৃপক্ষ হয়ত ভাবতে পারেন বাঙালীদের ভেতরে এখনও অনেক খাঁটি পাকিস্তানী সৈনিক আছেন, যারা ঢাকায় তাদের প্রোটেকশন দেবেন। কিন্তু এদেশে পাকিস্তানী দোস্তদের রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষমতা থাকলেও জনক্ষমতা নেই, তরুণ প্রজন্মের শক্তি তাদের সঙ্গে নেই। সুতরাং পাকিস্তানের এদেশীয় দোস্তরা ইচ্ছা করলেও তাদের জন্য মেহমানদারির ডালা খুলতে পারবেন না। ইতোপূর্বে কাদের মোল্লাকে পাকিস্তানের খাঁটি সৈনিক ঘোষণা দিয়েও রক্ষা করতে পারেনি। তবে একথাও ঠিক, পাকিস্তানীদের কাছে কাদের মোল্লার চাইতে সাকা চৌ-এর অবস্থান অনেক উঁচুতে।

ঢাকাতে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর প্রধান খুঁটি এবং সংযোগী সাকা চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসম্মানজনক উক্তির কারণে ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার ইরফান রাজাকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এই বহিষ্কার আদেশ বাতিল করার জন্য সাকা চৌ পাকিস্তান দূতাবাসে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শলাপরামর্শ করেন। সেই অনুসারে ঢাকার কূটনীতিক পাড়ায় তদ্বির চালান। কিন্তু ইরফান রাজার শেষ রক্ষা হয়নি। পুরনো কথা আবার বলছি এ কারণে যে, পাকিস্তান পূর্বে এরকম অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে, আগামীতেও তারা ব্যর্থ হবে। সাকা চৌ মনেপ্রাণে বাংলাদেশকে কখনও মেনে নেয়নি। গত ৪৪ বছর ধরে পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য সাকা চৌ বলে আসছেন তিনি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক নন। সুতরাং তাকে রক্ষা করার জন্য পাকিস্তানীদের শেষ চেষ্টা থাকতে পারে। এটা নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, ভাবনারও কিছু নেই। কিন্তু বিবেচ্য বিষয় হলোÑ এহেন সাকা চৌধুরী এখনও বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য এবং চেয়ারপার্সনের অন্যতম উপদেষ্টা। সাকার প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন পাকিস্তানী সাফাই সাক্ষীদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে বিএনপির এমন অবস্থান সম্পর্কে ভাবনার বিষয় থাকলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। বিএনপি চেয়ারপার্সন থেকে শুরু করে মওদুদ আহমদ সকলেই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে এবং ট্রাইব্যুনাল বাতিলের দাবি একাধিকবার প্রকাশ্যে উত্থাপন করেছেন। আর পাকিস্তানের সাফাই সাক্ষী আনার প্রধান পরামর্শদাতা খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, জাতীয়তাবাদী শক্তি আগামীতে ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধী বিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে বিচারের আওতায় আনা হবে। সুতরাং কাদের মোল্লা ও গোলাম আযমের বেলায় পাকিস্তানের যে অবস্থান দেখেছি তার সঙ্গে বিএনপির অবস্থানের কোন পার্থক্য নেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে এখনও আছে ন্যুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রায়াল, আর কোন উদাহরণ নেই। এই দুই আদালত দ্রুততার সঙ্গে এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেশিরভাগ যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন এবং ফাঁসির দ- কার্যকর করে। আপীল, সাফাই সাক্ষী, রিভিউ, ক্ষমা ভিক্ষাÑ এর কোন সুযোগই সেখানে ছিল না। বাংলাদেশে এর সব সুযোগই পাচ্ছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীরা। বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্য হলোÑ এর পরেও দীর্ঘদিন রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা বিএনপি থেকে বলা হয় আন্তর্জাতিক মানের বিচার হচ্ছে না। যাক সে কথা, বাংলাদেশের মানুষ বিএনপি ও জামায়াতকে এখন আর আলাদা করে দেখে না।

ফিরে আসি পাকিস্তানী সাফাই সাক্ষী আসা বা প্রেরণ প্রসঙ্গে। পাকিস্তান সাকার পক্ষে সাফাই সাক্ষী পাঠাবে কিনা অথবা সেই সুযোগ তারা পাবে কিনা তা আমরা এখনও সঠিক বুঝতে পারছি না। তবে আমাদের কথা অন্য জায়গায়। বাংলাদেশের নাগরিক সাকা চৌকে বাঁচানোর চেষ্টার আগে পাকিস্তানের মনে রাখতে হবে ১৯৫ জন চিহ্নিত পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবি আমরা এখনও ছেড়ে দেইনি। ১৯৭৩ সালের প্রত্যাবর্তন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমেদ খান। ওই চুক্তিতে যুদ্ধাপরাধের কথা স্বীকার করেছে পাকিস্তান পক্ষ। চুক্তির ১৩ নম্বর ধারায় স্পষ্ট লেখা আছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্তানী নাগরিকের বিচার পাকিস্তান করবে। এই চুক্তির বলে আটকেপড়া দুই দেশের নাগরিকদের পরস্পর প্রত্যাবর্তন বাস্তবায়িত হয়। গত ৪৪ বছরে পাকিস্তান চুক্তি অনুযায়ী ওই ১৯৫ জনের বিচারের ব্যবস্থা করেনি। বরং উল্টো এখন বাংলাদেশের নাগরিক, যারা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচারের বিরোধিতা এবং রক্ষা করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানীরা এই স্পর্ধা দেখানোর আরও সুযোগ পাচ্ছে এই কারণে যে, বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিয়েছেন এবং পাকিস্তানীদের মতো একই সুরে কথা বলছেন। এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য এবং বাংলাদেশের সব সমস্যার মূল কারণ। একাত্তরের বর্বরতা ও নৃশংসতার জন্য পাকিস্তান একটিবারের জন্যও বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চায়নি, দুঃখও প্রকাশ করেনি। উল্টো একাত্তরের গণহত্যাকারী কাদের মোল্লাকে তারা পাকিস্তানের একজন খাঁটি সৈনিক হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর অর্থ পাকিস্তান এখনও মনে করে তারা একাত্তরে যা করেছে ঠিক করেছে। যারা নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে একটু হলেও গর্ব করে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধাবোধ আছে, তারা কি কোন কারণে পাকিস্তানের দিকে হাত বাড়াতে পারে? প্রশ্নটি রাখলাম আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য। এহেন পরিস্থিতিতে যারা বা যে রাজনৈতিক গোষ্ঠী পাকিস্তানের সঙ্গে গলায় গলায় ভাব রেখে অতীতে চলেছে, আগামীতেও সে রকম চলতে চায়, তাদের পরিচয় বাংলাদেশের মানুষের কাছে কি হওয়া উচিত? সেই বিষয়টি সকলকে ভেবে দেখার জন্য অনুরোধ করছি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অপরাধের জন্য জাপান একাধিকবার ক্ষমা চেয়েছে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে। জার্মানিও সমগ্র ইউরোপের কাছে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। বাংলাদেশের কাছে শুধু ক্ষমা চাওয়া নয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আরও কথা আছে। ২৩ বছরে যৌথ পাকিস্তানের সময় পুঞ্জীভূত সম্পদের হিস্যা পাকিস্তান এ পর্যন্ত বাংলাদেশকে দেয়নি এবং সে সম্পর্কে কোন উচ্চারণও নেই। সাতচল্লিশে দেশ ভাগের পর পাকিস্তানের পাওনা নিয়ে ভারত গড়িমসি শুরু করলে নেহরু সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য মহাত্মা গান্ধী অনশন শুরু করেন। আর সে কারণেই এক হিন্দু উগ্রবাদী যুবক গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করে। পরে পাকিস্তানের অংশ ভারত ফেরত দেয়। বিহারী ইস্যুটিও পাকিস্তান আজ পর্যন্ত মীমাংসা করল না। এটা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য একটা বড় বিষফোঁড়া হয়ে আছে। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ, বিশেষ করে কোটি কোটি তরুণ প্রজন্ম পাকিস্তানীদের এমন ঔদ্ধত্য আচরণ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে না, তারা এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়ার জন্যও সর্বদা প্রস্তুত আছে। সুতরাং স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর পরাজিত শক্তি পাকিদের সাহায্য চেয়ে কোন যুদ্ধাপরাধী পার পাবে না।

লেখক : ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর ২০১৫

২৭/১০/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: