১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

পুতুল নাচ সৃজনশীল জীবন ও ঐতিহ্যের কাব্যগাথা


আবহমানকাল ধরে আমাদের গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে মিশে আছে পুতুল নাচের সংস্কৃতি। ছেলেবেলায় বাচ্চাদের পুতুল খেলা একটি অপরিহার্য বিষয় ছিল। এক বাড়ির ছেলে পুতুলের সঙ্গে অন্য বাড়ির মেয়ে পুতুলের বিয়ের আয়োজন করা হতো। অভিভাবকরাও সানন্দে আয়োজন করতেন খাওয়া-দাওয়া ও জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের। অনেক মনোবিজ্ঞানী বলেন, ছেলেবেলায় যেসব শিশু পুতুল খেলে তারা সংসার জীবনে সার্থক হয়। পুতুল খেলার মাধ্যমে সংসার গঠনে পরবর্তী সার্থক জীবনের ছায়াপাত ঘটে থাকে শিশুদের মনে। এক সময় পুতুল ছিল আবহমান বাংলার একমাত্র বিনোদনের বিষয়। পুতুল তৈরি, একে নিয়ে খেলার পর মানুষ পুতুল নাচ বা পাপেট শোয়ে নিজেদের আশা আকাক্সক্ষার কথা বলতে শিখল। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী, নন্দনতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তফা মনোয়ার এক সাক্ষাতকারে বলেছেন ‘আমাদের প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অন্বেষণ করলে দেখা যায় পুতুল নাচ সারা ভারতবর্ষেই ছিল। ময়মনসিংহ গীতিকায়ও এর উল্লেখ আছে। পুতুল নাচের গল্পে তুলে ধরা হতো সে সময়ের মানুষের ধর্মকথা, নীতিকথা, সুখ-দুঃখ ও নিত্যদিনের জীবনাচরণ। মোট কথা মানুষের যেসব কথা বলা দরকার, সমাজের জন্য ভাল কাজ করা দরকার, সান্ত¡না দেয়া দরকার এগুলো কিন্তু পুতুল নাচের মধ্য দিয়েই হয়েছে। আগে তো মানুষের জীবনযাত্রা একটু অন্যরকম ছিল। বছরের কিছু সময় কৃষকের কোন কাজ থাকত না। তখন তারা মনোরঞ্জনের জন্য গান বাজনা করত। সার্বিকভাবে মানুষের যোগযোগের ব্যাপারটা এভাবেই তো হতো। এখন যে পাপেট্রি করছে তা পুতুল নাচের নতুন সংস্করণ’।

পুতুল নাচের ইতিহাস বা এর উৎপত্তি কোথায়, কখন, কিভাবে তার সঠিক ইতহিাস এখনও পাওয়া যায়নি। পুতুল নাচ লোকনাট্যের একটি প্রাচীন মাধ্যম। বাংলাদেশে পুতুল নাচের হাজার বছরের ঐতিহ্য রয়েছে। বাংলাদেশে মুিক্তযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে শিবিরে পুতুল নাচের মাধ্যমে সেই সময়কার পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কাহিনী তুলে ধরা হতো। পুতুল নাচের মাধ্যমে শরণার্থী শিবিরের অসহায় মানুষ নতুন দেশের স্বপ্ন দেখত।

‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ এই ক্ষুদ্র বৃষ্টি বিন্দু পতার ওপর পড়া আর পাতা নড়ে উঠা দেখে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মন নাড়া দিয়েছিল। সেই ক্ষুদ্র নড়াচড়া দেখে তাঁর মনের যে নড়া, ছন্দের ও সুরে জেগে উঠা তার ফল অসাধাণ রচনা রেখে গেলেন, তাঁর বাণীতে তাঁর সুরে কেপে ওঠে অন্তর, এই সেই বাণীতে সুরে ও ছন্দে নতুন করে বিশ্বের রূপ দেখা যায়। শিশুরা এমন কত তুচ্ছ নড়াচড়া মুগ্ধ নয়নে দেখে, আকারণে আনন্দ পায়, মনে রাখে চিরকাল। মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে এর উত্তর নেই, শুধু আজীবন অন্বেষা। এই জগত জোড়া লাখ লাখ নড়া চড়া লক্ষ্য করে মানুষ নড়ার রূপক সৃষ্টি করেছে সেই মাধ্যম হলো পুতুল নাচ’।

নেপথ্যে থেকে যারা পুতুল নাচায় তাদের বলা হয় পরিচালক। তারা চরিত্রের প্রয়োজন অনুসারে পুতুলের পোশাক নির্ধারণ করে থাকে। এছাড়া থাকে নানা উপকরণ। জলের প্রাণী, আকাশের পাখি, ডাঙ্গার মানুষ, বনের পশু সব কাহিনীর প্রয়োজনে এক মঞ্চে এক সঙ্গে অভিনয় করে। এদের হাসি কান্না, আনন্দ বেদনা, রাগ দুঃখ সব অভিনয়ের মাধমে এবং নেপথ্য সংলাপ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। প্রাণীদের ভাষায মানুষের কণ্ঠ ব্যবহার করা হয়। এর ফলে পুতুল নাচ হয়ে উঠে প্রাণবন্ত।

ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায় বিশ শতকে শিল্পকলার জগতে পুতুল নাচ একটি আধুনিক শিল্প বলে গণ্য হয়। টেলিভিশন আবিষ্কারের পর তা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠে। পুতুল নাচকে একটি টোটাল আর্ট ফর্ম বলা হয়। কেননা এতে আছে চারুও কারুকলা শাখার সব কয়টি ফর্মের ব্যবহার। গল্প, কবিতা, নাটক, অভিনয়, গান, নৃত্যকলা, ভাস্কর্য, এবং অন্যান্য দৃশ্যমান আর্টের সার্থক মিলন ঘটেছে পুতুলনাচে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পুতুলনাচ একটি পুরাতন শিল্পকলা হিসেবে গণ্য করা হয়। ইউরোপের পুতুল নাচের সবচেয়ে প্রাচীনতম দেশ জার্মানি। এদের হাত ধরেই পুতুল নাচ উন্নত বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তারা পুতুল নাচের মাধ্যমে পৌরাণিক ও রূপকথার কাহিনী তুলে ধরত। আস্তে আস্তে তা ইউরোপের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যযুগের ইটালিতে ‘পুলসিনেলো’ নামে আবির্ভাব ঘটে সুতা পাপেটের। ফ্রান্সে পাপেটের নতুন নাম হয় ‘পলসিনেল’। ফ্রান্সে রূপকতার ও ঐতিহাসিক মিশ্রণে যে লৌকিক গল্প, তার প্রকাশ হয় ‘দস্তানা পাপেটে’র মাধ্যমে। এর জনপ্রিয় চরিত্র হিসেবে জন্ম নেয় ‘পাঞ্চ’। এই পঞ্চ চরিত্রের প্রতিরূপ দেখা দেয় রশিয়া, জাপান ও ব্রাজিলে। জার্মান ও সুইডেনে পাঞ্চের নাম ‘শাসপার’ হল্যান্ডে ‘ইয়ন কাসেন’ এবং হাঙ্গেরি রোমানিয়ায় ‘ভাসিলচে’। এভাবে পুতুল নাচ ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। মিসর, চীন, কোরিয়া, ফিলিপাইন, মায়ানমার, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং শ্রীলঙ্কায় রূপকথার ও আধুনিক ধারার পুতুল নাচ ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতায় বেশকিছু পুতুল নাচের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। পাপেট থিয়েটার, পিপল থিয়েটার, ডলস থিয়েটার, এবং বর্ধমান পাপেট থিয়েটার এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন সামাজিক সচেতনামূলক ও বিনোদনমূলক পুতুল নাচ পরিবেশন করে আসছে। পুতুল নাচের মাধ্যমে গ্রুপগুলোর কর্তৃপক্ষ রূপকথার কাহিনী, ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও জীবনীমূলক কাহিনী, সমাজ সচেতনতা; পরিবেশ উন্নয়ন; পরিবার পরিকল্পনার কাহিনী ছাড়ার শিশুদের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে থাকে। প্রতিষ্ঠনগুলো এসব প্রচারের ক্ষেত্রে আধুনিক ধারার পুতুলের চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে পুতুল নাচের ইতিহাস প্রায় হাজার বছরের পুরাতন। বাংলাদেশে কয়েকটি গ্রামে সাধারণত পুতুল তৈরি হতো শোলা দিয়ে। একে কাপড় পরিয়ে এবং রং মাখিয়ে সুন্দর করে সাজান হয়। কোথাও কোথাও শুধুমাত্র বিভিন্ন রঙের কাপড় দিয়ে পুতুল তৈরি হয়। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় প্রথম পুতুল নাচের প্রচলন শুরু“হয়। তারাই কাপড়, কাঠ, পাট, শোলা দিয়ে পুতুল আধুনিক আঙ্গিকে তৈরি করে।

প্রথম দিকে নাচের পুতুল মাটি ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো। নিচের অংশ কাঠ বা ওপরের অশেং কাঠ ব্যবহার করা হতো। ওপরের মাটির অংশে রঙ দিয়ে মানুষ, পশু, পাখির অবয়ব আঁকা হতো। নিচের অংশে কাপড়ের পোশাক ব্যবহারের প্রচলন ছিল। চুল হিসেবে ব্যবহার করা হতো পাট বা কচুরিপানার শিকড়। পরবর্তিতে ভাঁটশোলা, ন্যাকড়া, লোহার তার দিয়ে নাচের পুতুল তৈরি করা হয়ে থাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও শোলার খেলনা পুতুল ফরিদপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে এবং ঢাকার শাঁখারি বাজারে তৈরি হয়। ঢাকার লালবাগ, ধামরাই ও সাভারের বিভিন্ন সিরামিক কারখানায় পুতুল তৈরি হয়। এই পুতুলগুলো গৃহসজ্জার কাজ হিসেবে ব্যবাহার করা হয়। তবে পুতুল নাচের জন্য কাপড়ের পুতুলের কোন বিকল্প নেই। নাচের পুতুল তৈরির জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কান্দিপাড়র গ্রাম বেশ প্রসিদ্ধ। এখানেই গড়ে উঠে কয়েকটি পুতুল নাচের দল। এক সময় অবশ্য হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত পেশাজীবী পুতুল নাচিয়ে দল গ্রামে গঞ্জে পুতুল নাচ পরিবেশন করত। এই দলগুলো বংশ পরস্পরায় ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বতর্মান যে দলগুলো তারা অনেকে মুসলিম ও ধর্মনিরপেক্ষভাবে পুতুল নাচ পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশে সাধারণত তারের পুুতুল ও লাঠিপুতুলের প্রচলন খুব বেশি। পুতুল নাচে সাধরণত রাধাকৃষ্ণের সিতাহরণ, রামায়ন মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনী এবং লোকজীবনের বিভিন্ন ‘কিসসা’ পালাগান ইত্যাদি তুলে ধরা হয়। এছাড়া পুতুল নাচে সমসাময়িক ঘটনাবলী প্রকাশ পায়। বিয়ের অনুষ্ঠান ঘটকালি থেকে বধূ বিদায়। এর মধ্যে থাকে যৌতুক বিষয়ের শিক্ষণীয় একটি অংশ। সুখী পরিবার, দাম্পত্য জীবনের নানা সমস্যা ও এর সমাধান, গ্রাম্য বিচার, নারী ও বয়স্ক শিক্ষা, যুব উন্নয়ন, পরিবেশ উন্নয়ন, জামাই শাশুড়ি ও বউয়ের কলহ এবং ঐতিহাসিক ঘটনা ও চরিত্র নিয়েও পুতুল নাচের আসর হয়ে থাকে। গ্রামে বিভিন্ন মেলা ও লোকজ উৎসবে পুতুল নচের আসর একটি অপরিহার্য বিষয়। বাংলাদেশের পুতুল নাচের যে সাফল্যের ইতিহাস সেই সম্পর্কে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার বলেনÑ ‘বাংলাদেশে আদি গ্রামীণ ঐতিহ্য পুতুল নাচের যে বিশেষ স্থান ছিল, কালের বিবর্তণে এই যান্ত্রিক বিনোদনের আগ্রাসনে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পুরনো ঐতিহ্যকে অপরিবর্তিত রূপে বোধ হয় আর ফিরিয়ে আনা যায় না। তাকে অন্তরের মধ্যে রেখে শৈল্পিক শ্রদ্ধাবোধ থেকেই নতুন কিছুকে সংযোজন করা যায়। ঐতিহ্য বন্ধন নয়, ঐতিহ্য মুক্ত মনের পাসপোর্ট, এটা নিয়েই নতুন পথের যাত্রা শুরু। বাংলা সহিত্যে সাংস্কৃতিতে এমন সব সম্পদ আছে যা এই আধুনিক গতিপ্রবণ মানুষকে দুদ- শান্তি দিতে পারে নাটোরের বনলতা সেনর মতো।

এই যে সহজ শান্তি এটাই আমাদের ঐতিহ্যের মূল কথা। পুতুল নাচে আছে সেই সহজ শান্তি।’ আজকাল শিশুরা টম ও জেরি ভারতীয় সিরিয়ালের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে তারা নির্জীব জীবনাসক্তে দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিষয়টি অবশ্যই বেদনাদায়ক। মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, টেলিভিসনের কল্যাণে আমরা অনেকে অনেক কিছু হাতের মুঠোয় পেয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এ সবের প্রতি আসক্তি শিশুদের সৃজনশীলতা ও সৃষ্টিশীলতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আমাদের শিশুকে সৃজনশীল ও মননশীল হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অবশ্যই চাই আমাদের ঐতিহ্যগত দিকগুলোর বিশেষ প্রয়োগ। এর একটি মাধ্যম হতে পারে অবশ্যই পুতুল নাচ।