১৭ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ছিটমহলে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিতরণ করলেন গবর্নর


রহিম শেখ/এ রহমান মুকুল, দেবীগঞ্জ, পঞ্চগড় থেকে ॥ মাত্র সপ্তাহখানেক আগে বিদ্যুত এসেছে। শুধু বিদ্যুত নয়, তৈরি হয়েছে একটি বিদ্যালয়ও। যেখানে এক সময় পরিচয় গোপন করে ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন স্কুলে পড়ত। চাকরি করার সুযোগও ছিল না সেসব শিক্ষার্থীর। এখন স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশের মানচিত্রে সদ্য মিশে যাওয়া ছিটমহল পঞ্চগড়ের দহলা খাগড়াবাড়ী গ্রামবাসী। সকল নাগরিক সুবিধার পাশাপাশি ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছেন এ অঞ্চলের ৫৪ হাজার মানুষ। এ মানুষগুলোর জন্য অন্যতম একটি আনন্দের দিন ছিল রবিবার। ছিটমহল বিলুপ্তির পর প্রথমবারের মতো তদের মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে ওই এলাকা পরিদর্শনে যান গবর্নর। এসব ভাগ্যবঞ্চিত মানুষদের সেবা দিতে দেশের সব ব্যাংককে দায়িত্ব নিতে বলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর। এ সময় সাবেক ছিটমহলবাসীর জীবনমান উন্নয়নে মানবিক কার্যক্রমে ব্যয়িত প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিতরণ করেন তিনি।

এ উপলক্ষে রবিবার পঞ্চগড়ের দহলা খাগড়াবাড়ি অধুনালুপ্ত ছিটমহলে বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ড. আতিউর রহমান। বাংলাদেশ ব্যাংক রংপুর অফিসের মহাব্যবস্থাপক খোরশেদ আলমের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেনÑ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান, মহাব্যবস্থাপক রবিউল হাসান, কাজী ছাইদুর রহমান ও এএফএম আসাদুজ্জামান। এছাড়া সভায় বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, দেবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাসনাৎ জামান চৌধুরী জজ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ শফিকুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ স ম নুরুজ্জামান বক্তৃতা করেন। সমাবেশে ঋণ বিতরণ, ১০ টাকার হিসাব খোলা এবং সিএসআর খাত থেকে নতুন নাগরিকদের আর্থিক সহায়তা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন গবর্নর। এ অঞ্চলে মানুষদের মাঝে ঋণ ও সিএসআর হিসেবে আড়াই কোটি টাকার সমপরিমাণ বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক, যার উল্লেখযোগ্য অংশ সমাবেশস্থলে বিতরণ করা হয়। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সভাপতি মঈনুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন আমরা আইনী জটিলতার কারণে সরকারের সবধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলাম। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক হয়েছি। কিন্তু আমাদের কোন উন্নয়ন হয়নি। বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর উন্নয়নে ব্যাংকগুলোর সিএসআরের অর্থ দিয়ে একটি কৃষি জোন করে দিলে কৃষকরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন। ছিটমহলের বাসিন্দা আফতাবুর রহমান আফতাব বলেন, ছিটমহলের উন্নয়নে অত্র এলাকার ছাত্রছাত্রীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন ও একটি কৃষি ব্যাংক স্থাপন করা প্রয়োজন। আর্থ-সামাজিক জীবনমানের উন্নয়নে ব্যাংকিং সুবিধা ও শিল্পকারখানা স্থাপন করা খুবই জরুরী। মোকলেছুর রহমান বলেন, ছিটমহল এলাকা থেকে দেবীগঞ্জ উপজেলা সদরের দূরত্ব ৫-৭ কিলোমিটার। বেহাল সরু রাস্তায় কোন ভারি যানবাহন চলাচল করতে পারে না। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে আর্থিক ব্যবস্থার কোন উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

সমাবেশে আগত ছিটমহলবাসী নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে সিএসআরের আওতায় আর্থিক অনুদানের পাশাপাশি জামানতবিহীন সুদমুক্ত ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে গবর্নরকে অনুরোধ করেন। অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সমাবেশে আগত বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঋণ দেয়ার বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। গবর্নর বলেন, ঋণ নিয়ে যথাসময়ে ফেরত দিলে পরবর্তীতে আবার ঋণ পাবেন। এর আগে তিনি সিএসআর কার্যক্রম উদ্বোধন উপলক্ষে দহলা খাগড়াবাড়ি ছিটমহলে স্থাপিত দিনব্যাপী ব্যাংক মেলার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকের পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার ভাউলাগঞ্জ শাখা এবং লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী শাখা উদ্বোধন করেন। এর আগে গত শনিবার রাতে গবর্নরকে সংবর্ধনা দেয় রংপুর ব্যাংকার্স ক্লাব।

ব্যাংকগুলোর সিএসআরের আওতায় অধুনাবিলুপ্ত ছিটমহল এলাকায় ৩৩৪টি নলকূপ, ১৯২টি স্যানিটারি ল্যাট্রিন, ১০টি স্প্রে মেশিন, বিপুল পরিমাণ ওষুধ এবং শিক্ষা কার্যক্রমের আধুনিকায়নে ১৯টি কম্পিউটার, ১৩শ’ স্কুল ব্যাগ, ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ, ১৫ রাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান, ১০০টি স্কুল বেঞ্চ, আত্মকর্র্মসংস্থানের জন্য ৯০টি সেলাইমেশিন, ১৮৩টি বাইসাইকেল, ১১০টি ভ্যানগাড়ি, ১৪৬ বান্ডিল ঢেউটিন, ৩০টি গরু ও দরিদ্র মানুষের শীত নিবারণের জন্য ৫১০০টি কম্বল বিতরণ করা হবে। এছাড়া ব্যাংকগুলো ওই এলাকায় সৌরবিদ্যুত স্থাপন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কালভার্ট নির্মাণসহ বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা করেছে।

সমাবেশে গবর্নর বলেন, বাংলাদেশের মানচিত্রে সদ্য অন্তর্ভুক্ত হওয়া ছিটমহল বাসিন্দাদের জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় সংযুক্ত করতে এবং তাদের সম্ভাবনাময় উদ্যোগসমূহ বিকশিত করার লক্ষ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এলক্ষ্যে কৃষি এসএমইসহ উৎপাদনমুখী ও পরিবেশবান্ধব খাতগুলোতে ঋণের যোগান বাড়িয়ে কৃষক ও হতদরিদ্রদের ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেয়া, বর্গাচাষীদের জন্য বিশেষ ঋণ, আমদানিনির্ভর ফসল চাষে কম সুদে ঋণ, নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে কম সুদে ঋণের সুযোগ সৃষ্টি, দ্রুত ও কম খরচে টাকা পাঠানোর জন্য মোবাইল ব্যাংকিং প্রবর্তন করা হয়েছে। ড. আতিউর বলেন, বর্তমান সরকারের রূপকল্প ২০২১ সামনে রেখে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যাংকিং খাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দারিদ্র্য নিরসনে ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতায় এনে অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রমকে বেগবান করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্থিতিশীল আর্থিক খাত গড়ে তুলতে ব্যাংকিং সেবায় মানবিক ধারণা প্রসারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গবর্নর আরও বলেন, দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসাম্য, বঞ্চনা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং ব্যবসায়িক কর্মকা-ের ফলে সৃষ্ট অভিঘাত হ্রাসকরণের লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রকে মূল ব্যাংকিং ধারার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: