মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

পরিকল্পিত চক্রান্ত ॥ ইমামবাড়ায় বোমা হামলা

প্রকাশিত : ২৬ অক্টোবর ২০১৫
পরিকল্পিত চক্রান্ত ॥ ইমামবাড়ায় বোমা হামলা
  • জামায়াতের মদদে জেএমবি এ ঘটনা ঘটিয়েছে
  • নিহত ১, আহত শতাধিক
  • হোসেনী দালানে হামলা আর এএসআই ইব্রাহিম মোল্লা হত্যা এক সূত্রে গাঁথা ॥ আইজি
  • দেশী-বিদেশী চক্র জড়িত ॥ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

গাফফার খান চৌধুরী ॥ হোসেনী দালানে বোমা হামলায় একজন নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনায় বোমা হামলাকারীরা শনাক্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দুইজন বোমা হামলা চালায় বলে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারীরা। সন্দেহভাজন হামলাকারী হিসেবে শফিকুল ইসলাম, মোরসালিন, আব্দুল কাদির জিলানীসহ ৪ যুবককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গাবতলীতে পুলিশ কর্মকর্তা ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত ৪ জনকেও এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। কারণ হোসেনী দালানে যে ধরনের হ্যান্ড গ্রেনেড দিয়ে হামলা হয়েছে, ঠিক একই ধরনের পাঁচটি হ্যান্ড গ্রেনেড পুলিশ কর্মকর্তা হত্যার ঘটনায় কামরাঙ্গীরচর থেকে গ্রেফতারকৃত তিনজনের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফ থেকে বোমা হামলাকারী হিসেবে কাউকে আটক করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।

হামলায় দেশী প্রযুক্তিতে তৈরি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি হ্যান্ড গ্রেনেড ব্যবহৃত হয়েছে। যার মধ্যে তিনটি বিস্ফোরিত হয়েছে। ঘটনার রাতেই দুটি অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার হয়। পরে তা নিষ্ক্রিয় করা হয়। উদ্ধারকৃত গ্রেনেডের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার রাতে গাবতলীতে পুলিশ কর্মকর্তা ইব্রাহিম মোল্লা হত্যার ঘটনায় কামরাঙ্গীরচর থেকে আটক তিনজনের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া হ্যান্ড গ্রেনেডের মিল রয়েছে। রবিবার হোসেনী দালানের কবরখানার ভেতর থেকে গ্রেনেডের তিনটি সেফটি লক উদ্ধার হয়েছে।

হামলার ঘটনায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে চকবাজার থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছে। যুদ্ধাপরাধ ইস্যু ছাড়াও বাংলাদেশ ও ক্ষমতাসীন সরকারকে বিশ্বের কাছে চাপের মুখে রাখতেই দুই বিদেশী ও পুলিশ কর্মকর্তা হত্যার পর হোসেনী দালানে বোমা হামলা করে একজনকে হত্যা ও শতাধিক জনকে আহত করার ঘটনা ঘটানো হয়। জামায়াতের মদদে জেএমবি সরাসরি হামলায় জড়িত বলে তদন্ত সংস্থাগুলো অনেকটাই নিশ্চিত।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা ॥ হোসেনী দালানের আশপাশে অন্তত ১০ দিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারি চলছিল। তাজিয়া মিছিলকেন্দ্রিক যেকোন ধরনের নাশকতা এড়াতে দুটি প্রবেশ পথেই বাড়তি পুলিশ মোতায়েন ছিল। তাজিয়া মিছিল ও শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিমা বিসর্জন কেন্দ্র করে যে কোন ধরনের নাশকতা এড়াতে তাজিয়া মিছিল ও বিজয়ার মিছিল আলাদা আলাদা রাস্তার করার সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়। ইমামবাড়ায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। সন্দেহভাজনদের দেহ ও মহিলাদের ব্যাগ তল্লাশি চলতে থাকে গত কয়েক দিন ধরেই। পুরো এলাকা মনিটরিং করতে ৩২ সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। সিসি ক্যামেরার কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয় দারুল কুরআন লাইব্রেরীর নিচতলায়। সেখানে অস্থায়ী পুলিশের ক্যাম্পও বসানো ছিল।

যেভাবে হামলা হয় ॥ হোসেনী দালানের খাদেম ও ফরাশগঞ্জে ১৬০০ সালে প্রতিষ্ঠিত সবচেয়ে পুরনো বিবিকা রওজা ইমামবাড়া কমিটির সদস্য ইসহাক আলী সরদার (৪২) জনকণ্ঠকে বলেন, আশুরা উপলক্ষে পুরানা পল্টন, মগবাজার, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ পতাকা মিছিল, বয়ানসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে থাকেন। মূলত এটি শিয়া মুসলিমদের অনুষ্ঠান। আমি সুন্নী। তারপরও এদের নানা আচার অনুষ্ঠান ভাল লাগে। তাই প্রায় ২৫ বছর ধরে হোসেনী দালানের ইমামবাড়ায় আসছি। এখানে অনেকেই মানত করে থাকেন। শিয়া-সুন্নী অনেকেই এখানে মনোবাসনা পূর্ণ করতে নানা মানত করে থাকেন। আমিও করি। এজন্য হোসেনী দালানে শিয়া-সুন্নী উভয়ই আসেন। তাজিয়া মিছিলে শিয়া-সুন্নী অনেকেই অংশ নেন।

গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার পবিত্র জুমা’র নামাজের পরই তাজিয়া মিছিল বের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিমা বিসর্জনের দিন ছিল। এজন্য যেকোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তাজিয়া মিছিল বের করার সময় পরিবর্তন করা হয়। শুক্রবার রাত সাড়ে বারোটার পর তাজিয়া মিছিল বের হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

রাত তখন ঠিক দু’টা। আমি মিছিলের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে। কবরস্থান লাগোয়া ডেন্টাল ক্লিনিকের সামনে প্রথম একটি ছোট বিস্ফোরণ হয়। হালকা বিস্ফোরণের পর সমবেত জনতা তেমন নড়াচড়া করেননি। এরপর দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি ঘটে মূল স্থাপনার পশ্চিম দিকের সিঁড়িতে। এখান থেকে শিশু ও মহিলাদের চিৎকার ভেসে আসতে থাকে। তখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এত মানুষের শব্দে তেমন কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। তিনি মাঝ বরাবর থাকায় কিছুটা বিস্ফোরণ ও কান্নার আওয়াজ পান। এরপর ডেন্টাল ক্লিনিকের সামনে বিকট শব্দে তৃতীয় বিস্ফোরণটি ঘটে। এরপর পুরো মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে থাকে। মুহূর্তেই চিৎকার কান্নাকাটির আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে। শত শত মানুষের আর্তনাদে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এরপর মিছিলে আসা লোকজন আহতদের দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পুরো এলাকা রক্তে ভেসে যায়। ক্লিনিকের সামনে তৃতীয় বিস্ফোরণের জায়গায় বহু মানুষ পড়ে থেকে আর্তনাদ করতে করতে গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন। আহতদের সারাশরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। জখম হওয়া জায়গা থেকে রক্ত ঝরছিল। আহতদের হাতে, পায়ে, কোমরে, মাথায়, কপালসহ প্রায় সারাশরীরে জখম হয়েছে। ঘটনাস্থলেই সাজ্জাদ হোসেন সানজু নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়। আহত হয় শতাধিক।

আরও তিনটি গ্রেনেডের সেফটি লক উদ্ধার ॥ শুক্রবার রাতেই হোসেনী দালানের মূল স্থাপনার পশ্চিম পাশের সিঁড়ি থেকে অবিস্ফোরিত অবস্থায় একটি হ্যান্ড গ্র্রেনেড উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেনেডটির সেফটি লক খোলা ছিল। সেফটি লকটি খোলা থাকলেও সেটি হ্যান্ড গ্রেনেড থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। আলগাভাবে আটকে ছিল। এজন্য গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয়নি। প্রায় একই অবস্থায় আরেকটি গ্রেনেড দারুল কুরআন লাইব্রেরীর নিচ থেকে উদ্ধার হয়। সেগুলো নিষ্ক্রিয় করে ফেলে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। উদ্ধারের পর গ্রেনেড দুটির নানাদিক পর্যবেক্ষণ করা হয়।

রবিবার বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে হোসেনী দালানের ডেন্টাল ক্লিনিক সংলগ্ন কবরস্থানে প্রবেশের লোহার গেটের কাছে কোণার দিক থেকে তিনটি সেফটি লক উদ্ধার হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ॥ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক, র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটি পরিকল্পিত হামলা। দেশ ও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এমন ষড়যন্ত্র হচ্ছে। ষড়যন্ত্রের সঙ্গে দেশী-বিদেশী চক্র জড়িত থাকতে পারে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক বলেছেন, পুলিশ কর্মকর্তা ইব্রাহিম মোল্লা হত্যা ও হোসেনী দালানে বোমা হামলার মধ্যে বিশেষ যোগসূত্র থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ কর্মকর্তা হত্যার সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তিনি আগেই গণমাধ্যমে বলেছেন।

তদন্ত কমিটি গঠন ॥ ঘটনা তদন্তে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এ্যান্ড অপস) শেখ মোহাম্মদ মারুফ হাসানকে প্রধান করে এবং যুগ্মকমিশনার মীর রেজাউল আলম এবং গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার মাশরুকুর রহমান খালেদের সমন্বয়ে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ।

মামলা দায়ের ॥ ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মোঃ মফিজউদ্দিন আহমেদ জানান, রবিবার দুপুরে চকবাজার থানার এসআই জালাল উদ্দিন আহমেদ বাদী হয়ে সন্ত্রাস দমন আইনে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন।

মামলা ডিবিতে হস্তান্তর : হোসেনী দালান ইমামবাড়ায় দেশীয় গ্রেনেড হামলার ঘটনায় সন্ত্রাস দমন আইনে দায়ের করা মামলাটি পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (ডিসি-মিডিয়া) মুনতাসিরুল ইসলাম রবিবার রাত নয়টা ৪০ মিনিটে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বিকেলে মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে ডিবি বিষয়টি ছায়া তদন্ত করছিল।

প্রকাশিত : ২৬ অক্টোবর ২০১৫

২৬/১০/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: