১৭ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ফুটবলের সেকাল একাল


ছাত্রজীবনে রসায়ন, জীব, পদার্থ বিজ্ঞান আর ভূগোলে পড়েছিলাম বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে পার্থক্য বিষয়ে। যেমন যৌগিক পদার্থ ও মৌলিক পদার্থের পার্থক্য, ধাতব ও তরল পদার্থের মধ্যে পার্থক্য, অনু ও পরমাণুর মধ্যে পার্থক্য- ইত্যাদি। তেমনি বাংলাদেশের ফুটবলের সেকাল এবং একালের মধ্যে পার্থক্য লিখতে গেলে অনেক পার্থক্যই চোখে পড়বে। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ দুটি পার্থক্য হলো- খেলার মান এবং দর্শক। দু’টোই একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

বাংলাদেশের ফুটবলে ’৭০ এর দশক থেকে রমরমা অবস্থা চলে টানা ’৯০ দশক পর্যন্ত। বলতে দ্বিধা নেই, খেলার মানের দিক থেকে তখন খুব বেশি এগিয়ে না থাকলেও দর্শক জনপ্রিয়তার ছিল তুঙ্গে। বিশেষ করে ঢাকা ফুটবলের জনপ্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো। ঘরোয়া ফুটবলে দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলো দেশে ও বিদেশের মাটিতে সাফল্য পেয়েছে। শীর্ষ দু’দল মোহামেডান এবং আবাহনীর পাশাপাশি ছোট দলগুলোও বিদেশের মাটিতে নজরকাড়া সাফল্য দেখিয়েছে। তাছাড়া জাতীয় দলের কাছে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, মালদ্বীপ হারের বৃত্তেই ছিল।

কাজী মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের হংকং লীগে খেলা ছাড়াও বাংলাদেশের অনেক খেলোয়াড় সে সময় ভারতের নামকরা ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান এবং কলকাতা মোহামেডান ক্লাবে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন। এক্ষেত্রে কায়সার হামিদ, মোনেম মুন্না, সাব্বির আর রুমির নাম উল্লেখযোগ্য। মুন্না তো কলকাতার মাঠে সবার মন জয় করে নিয়েছিলেন। ভাবতে অবাক লাগে সেই জনপ্রিয়তা আজকে শূন্যের কোঠায়! আর দর্শক জনপ্রিয়তা? এখনকার বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে বড় দলগুলোর খেলায় মাঠে গেলে বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায়। যেখানে আগে মোহামেডান বা আবাহনীর সঙ্গে যে কোন ছোট দলের খেলা হলেই গ্যালারি ভরপুর হয়ে যেত, সেখানে মোহামেডান-আবাহনীর খেলা হলে কি অবস্থা হতো একবার ভেবে দেখুন। দুই দলের জনপ্রিয়তার কথা ভেবে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে হলে সাদা এবং নীল দুটি দল বানাতে হতো। সাদা থাকত মোহামেডানের খেলোয়াড় সমন্বয়ে গড়া আর নীল দল থাকত আবাহনীর খেলোয়াড় সমন্বয়ে গড়া।

অথচ বর্তমানে এই দুই দলের খেলা হলে গ্যালারি দেখলে বুকটা হাহাকার করে উঠে। অনেকেই এসে জিজ্ঞেস করেন ভাই কার কার খেলা হচ্ছে? কেউ কেউ টিপ্পনি কেটে বলেন, ‘ভাই আগে মোহামেডান-আবাহনীর খেলায় যতজন হকার গ্যালারিতে থাকত আজকাল এই দুই দলের খেলায় সে পরিমাণ দর্শকও হয় না! আগে দর্শক মাঠে যেতেন প্রিয় দলের খেলা এবং একক খেলোয়াড়ের কৃতিত্ব দেখার জন্য। যেমন ৭০-৮০ পর্যন্ত সালাহউদ্দিন, নান্নু, মঞ্জু, হাফিজ, নওসের, এনায়েত টিপু এবং ৮০-৯০ সাব্বির, সালাম, চুন্নু, রুমি, কায়সার হামিদ, জোসী, গাফফার, বাদল রায় ও আসলামের নাম উল্লেখযোগ্য। তাদের স্টাইল আর খেলা দেখে দর্শকরা অভিভূত হতেন। তবে আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে দর্শক জোয়ার আগের মতো না থাকলেও খেলার মান অনেক বেড়েছে। মামুনুল, এমিলি, জামাল ভূঁইয়া, সোহেল, হেমন্তরা শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পাল্লা দিয়েই লড়াই করছেন। ১৯৮৪ সালের মোহামেডানের অধিনায়ক এবং বাংলাদেশ দলের সাবেক খেলোয়াড় স্বপন দাসের সঙ্গে এ প্রসঙ্গে কথা হয়। তার মতে, এদেশে বর্তমানে স্কিল ফুটবলারের বড্ড অভাব। দলীয় খেলার পাশাপাশি একক স্কিল খেলোয়াড় প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন তিনি। আগে বিদেশী খেলোয়াড়ের মানও ছিল অনেক ভাল। জমজমাট সেই দিনগুলোতে ইরাকের হয়ে বিশ্বকাপে খেলা সামির সাকির এবং করিম মোহাম্মাদকে এনে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলন আবাহনীর কর্মকর্তারা। পাশাপাশি মোহামেডান এনেছিল ইরানের হয়ে বিশ্বকাপে খেলা নাসের হেজাজিকে। আরও ছিলেন নালজেগার আর নাইজেরিয়ান এমেকা। এছাড়াও ঢাকার মাঠে আরও অনেক নামকরা বিদেশী এসেছেন, যাদের খেলা আজও দর্শকরা মনে রেখেছেন। যেমন সার্গেই, রহিমভ, ঝুকভ, প্রেমলাল, পাকির আলি, চিমা অকরি, গনেস থাপা এবং জিবত নিকভের নাম উল্লেখযোগ্য। মাঝমাঠে প্রেমলাল আর নালজেগারের নাম বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা ভুলবেন না অনেকদিন। আর আজকের বিদেশীদের দেখলে দেশীদের সঙ্গে তেমন কোন পার্থক্যই চোখে পড়ে না। তবে ব্যতিক্রম ছিলেন সনি নর্দে। দীর্ঘদিন পর গত মৌসুমে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবে খেলে যাওয়া হাইতির ফরওয়ার্ড দর্শকদের নজর কেড়েছিলেন।

যারা আগে নিয়মিত ফুটবল দেখেছেন নিশ্চয় তাদের স্মরণে আছে, ৮০ এর দশকে মোহামেডান আবাহনীর ম্যাচ হলে খেলার আগে দুই তিন দিন ধরে চলত জল্পনা কল্পনা। এমন কি দুই দলের প্র্যাকটিসের সময় দর্শকদের ভিড় সামলাতে কর্মকর্তাদের হিমসিম খেতে হত। এখন প্র্যাকটিস তো দূরের কথা দুই দলের খেলা দেখতে হয় বিনে পয়সায়! তবে এটা স্বীকার করতে হবে, আগের সময়ের চেয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের ফুটবলের মান বেড়েছে অনেক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতীয় দল ও ক্লাব তাক লাগানো সাফল্য পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাব বিদেশের মাটি থেকে নজরকাড়া সাফল্য পেয়েছে। যা দেশের ফুটবলের উন্নতির স্মারকই বহন করছে।

আগে ফুটবলে দর্শকপ্রিয়তা এত বেশি ছিল যে, আবাহনী-মোহামেডানের খেলার দিন স্কুল বন্ধ থাকত। ম্যাচের টিকেট পাওয়ার জন্য সবাই উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ত, স্টেডিয়ামের গেট বন্ধ করা হতো ১২টার মধ্যে। অথচ এখন দর্শকরা মাঠমুখীই হতে চান না। তবে ফুটবলকে ঢাকাকেন্দ্রিকতা থেকে বের করলে আবারও দর্শক জোয়ার সম্ভব। এর প্রমাণ মিলেছে সিলেটে সাফ অনূর্ধ-১৬ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে। সেখানে প্রতিটি ম্যাচেই দর্শক জোয়ার দেখা গেছে। একটি ম্যাচের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় আগে ফুটবল নিয়ে কতটা মাতামাতি হয়েছে। ১৯৮৭ সালে লীগে শেষ ম্যাচ ছিল মোহামেডান ও আবাহনীর মধ্যে। আবাহনী ড্র করলেই চ্যাম্পিয়ন আর মোহামেডান জিতলে দুই দলের পয়েন্ট সমান হবে। তখন রিপ্লে ম্যাচ হবে। টান টান উত্তেজনার সেই ম্যাচ। মোহামেডান সেই ম্যাচে ৩-২ গোলে আবাহনীকে পরাজিত করে পয়েন্ট টেবিলে যৌথভাবে শীর্ষে উঠে আসে।

ফলে অনুষ্ঠিত হয় রিপ্লে ম্যাচ। ওই লড়াই ড্র হলে আবারও ম্যাচ আয়োজন করতে হয়। খেলাটা তখন বড় বিষয় ছিল না , বড় বিষয় ছিল দর্শকদের চাপ আর অশঙ্কা। ম্যাচটি নিয়ে এতটাই দর্শক উন্মাদনা ছিল যে, সেটি আয়োজন করতে হয়েছিল দর্শকশূন্য এরশাদ আর্মি স্টেডিয়ামে।

ব্যতিক্রমধর্মী মোহামেডান সমর্থক দল মোহাপাগল গত ৫ এপ্রিল জাতীয় ক্রীড়াপরিষদে আয়োজন করে এক আলোচনা সভা। যার মূল বক্তব্য ছিল ‘ফুটবলের গণজাগরণে মোহামেডান-আবাহনীর বিকল্প নেই’। ওই আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন সপন দাস, কাইসার হামিদ, আহসানুল্লাহ মন্টু, কোচ জোশি এবং রকিব। কায়সার হামিদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, ভাবতে অবাক লাগে যেখানে মোহামেডান বিগত ১০ বছর ধরে লীগ শিরোপা পাচ্ছে না সেখানে দলটির ভক্তরা আজও আশায় বুক বেঁধে আছে। এটা ফুটবলেরই জয়। ভক্তরা ঠিকই ফুটবলকে ভালবাসেন। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ।