২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রেজিস্ট্রারকে দিয়ে চিঠি দেয়া সহকর্মী বিচারপতিদের প্রতি অবমাননার


স্টাফ রিপোর্টার ॥ অবসর গ্রহণের পূর্বে পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ মামলার নথিপত্র ফেরত প্রদানের নির্দেশ দিয়ে স্বাধীন বিচার ও রায় দানের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার শপথ ভঙ্গ হয়েছে বলে দাবি করেছেন সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। প্রধান বিচারপতিকে দেয়া এক চিঠিতে তিনি এমন দাবি করেছেন। মঙ্গলবার ওই চিঠিটি প্রধান বিচারপতিকে দেয়া হয়, যার একটি অনুলিপি জনকণ্ঠের হাতেও এসেছে।

চিঠিতে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রীমকোর্টের সকল বিচারপতিই সাংবিধানিক পদের ধারক, কোন বিচারপতি প্রধান বিচারপতির অধনস্ত নয়। প্রধান বিচারপতির অবস্থান সহকর্মীদের মধ্যে প্রথম। সংবিধানের অনুচ্ছেদ মতে, সব বিচারকই বিচারিক ব্যাপারে স্বাধীন। চিঠিতে প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনার ২ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে ‘উক্ত রায়ের নথিগুলো সংশ্লিষ্ট দফতরে ফেরত প্রদান করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো’ মর্মে মামলার নথি ফেরত চাওয়া সংবিধানের ৯৪ (৪) ধারা মোতাবেক আমার স্বাধীন বিচার ও রায় দানের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ স্বরূপ, যা আমার প্রতি আপনার প্রতিহিংসার সুস্পষ্ট বহির্প্রকাশ। সংবিধানের ১৪৮ ধারা মোতাবেক এটা প্রধান বিচারপতির সুস্পষ্ট শপথ ভঙ্গ।

এর আগে গত দুই সেপ্টেম্বর বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের পেনশন যথারীতি প্রক্রিয়াকরণ করা হবে উল্লেখ করে দেয়া চিঠিতে বলা হয়েছিল, তিনি যেহেতু ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী এজন্য প্রধান বিচারপতির মনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে, অবসর গ্রহণের পর অপেক্ষমাণ রায়গুলো না লিখেই বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী যদি বিদেশে চলে যান, তাহলে অপেক্ষমাণ মামলাসমূহের রায় লেখার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হবে। চিঠিতে বিচারপতি মানিকের কাছে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ থাকা মামলাগুলোর নথিপত্র সংশ্লিষ্ট দফতরে ফেরত দেয়ার কথাও বলা হয়েছিল। ওই চিঠিতে প্রধান বিচারপতির নির্দেশিত হয়ে স্বাক্ষর করেছেন সুপ্রীমকোর্টের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জেনারেল মোঃ জাকির হোসেন। তার আগে গত ২৫ আগস্ট এক চিঠির মাধ্যমে বিচারপতি মানিককে জানানো হয়েছিল তার কাছে অপেক্ষমাণ রায়ের স্বাক্ষরকরণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পেনশন প্রক্রিয়া প্রসেস করা হবে না মর্মে প্রধান বিচারপতি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরে এর জবাবে গত ৩১ আগস্ট প্রধান বিচারপতিকে দেয়া এক চিঠিতে ওই সিদ্ধান্তকে বেআইনী, অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক দাবি করেন বিচারপতি মানিক।

মঙ্গলবারের চিঠিতে প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে বিচারপতি মানিক বলেন, আপনার আদেশক্রমে আমাকে লেখা ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের গত ২ সেপ্টেম্বরের চিঠি আমার হাতে এসেছে। এই প্রসঙ্গে আমি উল্লেখ করতে চাই, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে দিয়ে একজন আপীল বিভাগের বিচারপতিকে চিঠি দেয়া শুধু অশোভনীয় ও অসৌজন্যমূলকই নয় বরং সহকর্মী বিচারকগণের প্রতি হেয় ও অবমাননারও বহির্প্রকাশ। সুপ্রীমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল প্রধান বিচারপতির রেজিস্ট্রার নন, তিনি সুপ্রীমকোর্টের সকল বিচারপতির রেজিস্ট্রার।

প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে চিঠিতে তিনি বলেন, আপনার পত্রে আমাকে ‘বৃটিশ পাসপোর্ট ধার’ উল্লেখ করেছেন এবং আমি পেন্ডিং রায় না লিখে বিদেশ চলে যেতে পারি; মর্মে সংশয় প্রকাশ করেছেন, যা উদ্ভট, হাস্যকর, কল্পনাপ্রসূত ও সম্মানহানীকর। তিনি বলেন, বিচারপতি হিসেবে আমি আমার সাংবিধানিক শপথ রক্ষায় অঙ্গীকার বদ্ধ। অপেক্ষমাণ রায় না লিখে বিদেশে চলে যাওয়ার মতো অসুস্থ চিন্তা কোন সৎ, নীতিবান, দেশপ্রেমিক বিচারপতি করতে পারেন না। চিঠিতে বিচারপতি মানিক বলেন, ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী না হয়েও যে কোন বিচারপতি বিদেশে যেতে পারেন। তবে এখানে উল্লেখ করতেই হয়, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা কখনই সরে দাঁড়াতে পারে না। একজন রাজাকার বা শান্তি কমিটির সদস্যই কেবল দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা অস্বীকার করতে পারে, যা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত।

চিঠিতে তিনি আরও বলেন, আপনার (প্রধান বিচারপতি) প্রেরিতপত্রে আপনি ‘যদি ও সংশয়’ শব্দের ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি বা অন্য কোন বিচারপতিই তাঁদের সহকর্মী কোন বিচারপতির ক্ষেত্রে ‘যদি ও সংশয়’ শব্দ ব্যবহার করে কোনরূপ মন্তব্য করতে পারেন না। তিনি বলেন, একজন বিচারককে সকল সংশয়ের উর্ধে উঠে ন্যায়বিচারের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একজন বিচারককে সিদ্ধান্ত নিতে হয় দৃশ্যমান ঘটনার ভিত্তিতে, কল্পনার ভিত্তিতে নয়। চিঠিতে তিনি আরও বলেন, ‘যদি ও সংশয়’ এর ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্ত নিলে তা হবে অলীক, কল্পনাপ্রসূত ও ন্যায়বিচার পরিপন্থী। বিচারপতি মানিক চিঠিতে বলেন, প্রধান বিচারপতি কাল্পনিক ধারণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে বিচার ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসবে।

নথি ফেরত চাওয়ার বিষয়ে তিনি চিঠিতে বলেন, অতীতে কোন বিচারপতিকেই এভাবে পেনশন গ্রহণের পূর্বে ফাইল ফেরত দিতে বলা হয়নি। আমার প্রতি দৃষ্টান্তবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়ে এবং ফাইল ফেরতের কথা বলে আপনি (প্রধান বিচারপতি) বৈষম্যমূলক, বেআইনী ও সংবিধানবিরোধী আচরণ করেছেন। এর মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রধান বিচারপতি পদকে অসম্মান করে শপথ ভঙ্গ করেছেন। চিঠিতে তিনি বলেন, অতীতে সকল বিচারপতিই অবসরের পর অসমাপ্ত রায় শেষ করার জন্য কয়েক মাস, এমনকি বছর পর্যন্ত সময় নিয়েছেন, আপনার (প্রধান বিচারপতি) ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই এটাই হবে। আপনার কাছে বর্তমানে স্বাক্ষরের বেশ কয়েকটি মামলা কয়েক মাস ধরে রয়েছে। অতীতে সব বিচারপতিই অবসরের পর রায় লিখেছেন এবং ভবিষ্যতেও লিখবেন, এটাই স্বাভাবিক।

চিঠিতে বিচারপতি মানিক আরও বলেন, আমার বিদায়লগ্নে বলতে চাই, প্রধান বিচারপতি হিসেবে আপনার জিঘাংসামূলক আচরণ সাংবিধানিক শপথ ভঙ্গের শামিল, এতে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয় এবং বিচারালয়ের পবিত্রতা ক্ষুণœ হয়। প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, প্রধান বিচারপতি হিসেবে আপনি সহকর্মী বিচারকদের প্রতি আপনার কোন আদেশ প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাধ্যমে অবহিত করার অধিকার রাখেন না। তিনি প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করে বলেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাধ্যমে আমাকে আপনার কল্পনাপ্রসূত আদেশ অবহিত করে যে অসম্মান ও সৌজন্যহীনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, ভবিষ্যতে আমার সহকর্মী বিচারকগণের সঙ্গে তার পুনরাবৃত্তি না করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। ৩০ লাখ শহীদ আর অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রম, কোটি মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের সংবিধান। আমাদের সাংবিধানিক শপথ আমরা কোনভাবেই ভঙ্গ করতে পারি না, চিঠিতে উল্লেখ করেন বিচারপতি মানিক।

বিচারপতি মানিকের এই চিঠিতে দেখা গেছে, চিঠিতে অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রীমকোর্টের কোর্টের ২১ বিচারপতির নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সকলেই অবসরের পর রায় লেখার জন্য সময় নিয়েছেন। কারও পক্ষেই শেষ করে অবসরে যাওয়া সম্ভব নয়। রায় দেয়াটা একটা চলিত প্রক্রিয়া, যা একজন বিচারকের শেষ দিন পর্যন্ত চলে। চিঠিতে আরও দেখা গেছে, এর অনুলিপি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী আইনমন্ত্রী এবং সুপ্রীমকোর্টের উভয় বিভাগের (আপীল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ) বিচারপতিদের দেয়া হয়েছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: