২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ঢাবি শিক্ষকের জঙ্গী কানেকশনের তথ্য তদন্ত প্রতিবেদনে


গাফফার খান চৌধুরী ॥ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন হিযবুত তাহরীরের পর এবার জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া সংক্ষেপে তালাবা নামের একটি সংগঠনের তৎপরতা থাকার তথ্য মিলেছে। সংগঠনের তৎপরতায় সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর এবং ফার্সী ও উর্দু বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাওলানা ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে। চলতি বছরের ২১ জুন এই শিক্ষকের কক্ষ থেকেই তালাবার সভাপতি ওমর ফারুক ডিবি কর্তৃক গ্রেফতার হয়। গ্রেফতারের পর তদন্তে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। দেশে যে ৪১টি উগ্র মৌলবাদী ও জঙ্গী সংগঠনের তৎপরতা থাকার তথ্য বিভিন্ন সময় প্রকাশিত হয়েছে, তারমধ্যে তালাবার অবস্থান ২২ নম্বরে। শিক্ষকের কক্ষ থেকে তালাবার সভাপতি গ্রেফতারের বিষয়টি ব্যাপক চাঞ্চল্যের জন্ম দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে এ ব্যাপারে দীর্ঘ অনুসন্ধান চলে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বরাবর প্রক্টরের দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্যই জানানো হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ॥ চলতি বছরের ২১ জুন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের ষষ্ঠতলার হাফিজ চত্বরে অবস্থিত ৬০৩৭ নম্বর কক্ষে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। কক্ষটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সী ও উর্দূ বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের নামে বরাদ্দকৃত। তিনি বেসরকারী ইউআইটিএস (ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি এ্যান্ড সায়েন্সেস) এর উপ-উপাচার্য। ওই কক্ষ থেকে গ্রেফতার হন ওমর ফারুক। গ্রেফতারকৃত ফারুক কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র এবং জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া নামের উগ্র মৌলবাদী সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি। পুলিশ ওই কক্ষ থেকে ওমর ফারুকের ব্যবহৃত কম্পিউটার জব্দ করে। সিলগালা করে দেয়া হয় কক্ষটি।

এর আগে গত ১৬ জুন রাতে রাজধানীর পল্টন থেকে গ্রেফতার হয় তালাবার সাবেক সভাপতি বর্তমানে ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের ঢাকা মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক এসএম সাখাওয়াত হোসনকে। সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে ফেসবুকে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে মুসলমান ও বৌদ্ধদের বিভেদ সৃষ্টিসহ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষকের কক্ষ থেকে ওমর ফারুক নামের এক জঙ্গী গ্রেফতারের ঘটনায় রীতিমতো হৈচৈ পড়ে যায়। বিষয়টির তদন্তে নামে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

তদন্তে যা বেরিয়ে এসেছে ॥ মাওলানা সাইফুল ইসলাম পিরোজপুরের কুখ্যাত রাজাকার ও পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের ডেপুটি আমির মাওলানা আব্দুর রহিমের অনুসারী। মাওলানা রহিম ১৯৪৬ সালে মুওদুদির জামায়াতে যোগদান করেন। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫৫ সালের পর দীর্ঘ সময় জামায়াতের প্রথম আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি ইসলামী ঐক্য আন্দোলন নামে নতুন মৌলবাদী সংগঠন সৃষ্টি করেন। আমৃত্যু তিনি এ সংগঠনের চেয়ারম্যান ছিলেন।

অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে ১৯৮৪ সালে দাখিল, ১৯৮৮ সালে ফাজিল পাস করেন। বিভিন্ন মাদ্রাসায় পড়াকালীন কৈশোর থেকেই তিনি ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামী হুকুমত বা মৌলবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার সংগ্রামে তিনি সক্রিয় হয়ে উঠেন। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্সী ও উর্দূ বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৯১ সালে সম্মান এবং ১৯৯২ সালে একই বিভাগ থেকে এমএ ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৯৫ সালের ৩ ডিসেম্বর একই বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতা লাভ করে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে শীর্ষ পদে পরিবর্তন আসে। ওই সময় প্রক্টরপদে নিয়োগ পান সাইফুল ইসলাম খান। প্রক্টর হওয়ার পর গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনাও হয়।

শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পরেও তিনি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ অক্ষুণœœ রাখেন। উপরন্তু অত্যন্ত গোপনে উগ্র মৌলবাদী তৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকেন। সাংগঠনিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তিনি বিভিন্ন প্রকাশ্য ও গোপন সভায় এবং প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যোগ দিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছিলেন। দেশে ইসলামী বিপ্লব প্রতিষ্ঠার তালিম ও তারবিয়াত প্রদান করতেন।

তালাবার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ॥ সংগঠনটি ১৩টি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে। এগুলো হচ্ছে, প্রচলিত শাসন ব্যবস্থা বা রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ভূলুণ্ঠিত করা, ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামী হুকুমত কায়েম করা, ছাত্র সমাজের মধ্যে সর্বাত্মক জিহাদের চেতনা সৃষ্টি করা, প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতিকে বর্জন এবং এ পদ্ধতিতে নির্বাচিতদের ইসলামের দুশমন হিসেবে চিহ্নিত করা, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নাস্তিকতাবাদী হিসেবে জানা, দেশের সরকারকে তাগুতি সরকার অর্থাৎ খোদাদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করা, সরকার মাদ্রাসা শিক্ষাকে ধ্বংস করছে, এই মর্মে ব্যাপক প্রচারণা চালানো, জনগণকে ধর্মীয় উস্কানির মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ করে তোলা, জালিমের মসনদ ভেঙ্গে তছনছ হবে, সেদিন বেশি দূরে নয়-মর্মে আন্দোলন চাঙ্গা রাখা ও তাদের মাঝে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের আশার সঞ্চার করা, ইসলামী বিপ্লব হবেই হবে, এই মর্মে সংশ্লিষ্টদের নিশ্চয়তা দেয়া, জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সরকার ইসলামকে মিলিয়ে দিচ্ছে-মর্মে অপপ্রচার চালানো, গণতন্ত্রের সেøøাগান দিয়ে ইসলাম কায়েম সম্ভব নয় বলে সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে ইসলাম কায়েমের দিকে অগ্রসর হওয়া এবং দেশের বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে দানবীয় শাসন ব্যবস্থা তথা তন্ত্রমন্ত্রের শাসনব্যবস্থা বলে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়ার আহ্বান।

শিক্ষক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে তালাবার সম্পর্ক ॥ তালাবার ১৩ দফায় বিশ্বাসী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম আগাগোড়াই তালাবার হয়ে কাজ করছিলেন। ২০০৫ সালে সংগঠনটির তরফ থেকে সাবেক তালাবা এ্যালবামে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালনকারীদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত স্মারকের ২৩ নম্বরে রয়েছে শিক্ষক সাইফুল ইসলামের নাম। নামের পাশে তালাবার প্রধান সম্পাদক ও মেয়াদকাল হিসেবে ১৯৮৯/১৯৯০ লেখা রয়েছে। নিয়মিত তার কাছে বিভিন্ন উগ্র ও ধর্মান্ধ সংগঠনের দাওয়াত কার্ড আসে।

শিক্ষক সাইফুলের নিয়ন্ত্রণাধীন কক্ষটি তালাবার অস্থায়ী কার্যালয় ছিল ॥ রাজধানীর পুরানা পল্টন লাইনের ৮৫/১-এ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলায় সংগঠনটির মূল কার্যালয়। কিন্তু সংগঠনটির সাবেক সভাপতি এসএম সাখাওয়াত হোসেন মুল কার্যালয় থেকে গ্রেফতার হয়। এরপর গোয়েন্দা নজরদারি বেড়ে যায়। সংগঠনটি তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুবিধাজনক জায়গা হিসেবে শিক্ষক সাইফুল ইসলামের নিয়ন্ত্রণাধীন ওই কক্ষটি বেছে নেয়। শিক্ষক সাইফুল ইসলাম আদর্শের কারণেই তালাবার সভাপতি ওমর ফারুককে ওই কক্ষ দলের অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ করে দেন। গ্রেফতারকৃত ওমর ফারুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। এমনকি ওই শিক্ষকের কোন আত্মীয়ও নয়। শুধুমাত্র আদর্শের কারণে একজন বহিরাগত হয়েও নিরাপদ জায়গা হিসেবে ওমর ফারুক তালাবার হয়ে ওই কক্ষটি থেকে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন।

তদন্ত কমিটির সুপারিশ ॥ শিক্ষক সাইফুল ইসলাম এক বা একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখেন। বিভিন্ন সময় আগ্নেয়াস্ত্র ৬০৩৭ নম্বর সেই কক্ষের টেবিলে রেখে দেখান। এতে করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়েছে। তার অস্ত্র নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক নিরাপত্তায় তার অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলে তা বাতিল করতে বলা হয়েছে। এমনকি যত্রতত্র আগ্নেয়াস্ত্র ক্যাম্পাসে বহন না করার কথা বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। এছাড়া ছুটিতে থাকা এই শিক্ষকের নামে বরাদ্দকৃত ওই কক্ষটি বাতিলের কথাও বলা হয়েছে।

শিক্ষক সাইফুল ইসলামের বক্তব্য ॥ এ সবই ষড়যন্ত্র। আমি ছুটিতে। আমি যাতে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করতে না পারি তারই নীলনকশার অংশ হিসেবে তার কক্ষে অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে গ্রেফতারকৃত ওমর ফারুক একটি থিসিস করতে গ্রেফতার হওয়ার আড়াই থেকে ৩ মাস আগ থেকে তার কাছে যাতায়াত করছিল। তার কাছে অনেক ছাত্রই এমফিল ও পিএইচডি করে থাকে। ফলে স্বাভাবিক কারণেই অনেক ছাত্র সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা সম্ভব হয় না। তবে ওমর ফারুক তালাবার সভাপতি সেটি তার জানা ছিল। ওমর ফারুক তার কক্ষ ব্যবহার করে সংগঠনের কার্যক্রম চালানোর বিষয়টি তার জানা ছিল না। তবে আমার জানামতে বা আমার আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে ওমর ফারুকের আপত্তিকর কর্মকা- চালানোর প্রশ্নই আসে না। আমি শিক্ষক হিসেবে ওমর ফারুকের ছাত্রের বাইরে আর কোন পরিচয়কে প্রাধান্য দেইনি।

আমিও মাদ্রাসায় পড়াকালীন তালাবার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তালাবা প্রধান সম্পাদকও ছিলাম। বিভিন্ন সময় তালাবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও বক্তব্য দিয়েছি। তবে আমি খারাপ উদ্দেশ্যে কোন সময়ই সেই সব অনুষ্ঠানে যাইনি। দীর্ঘদিন ধরেই আমি তালাবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছি। তবে তালাবার তরফ থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দাওয়াতপত্র তার কাছে আসে। যেমনটি এখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষকের নামে নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীরের দাওয়াতপত্র আসে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি নিরাপত্তাহীনতা বোধ করায় একটি বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করি। তবে তা কোন সময়ই কারও ভীতির সঞ্চার করতে নয়। আগ্নেয়াস্ত্রটি কারও ভীতির সৃষ্টি করতে পারে, এমনভাবে কোন সময়ই আগ্নেয়াস্ত্রটি বহন করি না। পিরোজপুরের কুখ্যাত রাজাকার মাওলানা আব্দুর রহিমের অনুসারী বা তার আদর্শে বিশ্বাসী হওয়ার তথ্যটি একেবারেই ভিত্তিহীন। তিনি অতীতে জামায়াত-শিবিরবিরোধী অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন বলেও দাবি করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগপন্থী নীল দলের শিক্ষক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বক্তব্য ॥ অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক জনকণ্ঠকে বলেন, প্রক্টরের প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনসহ সার্বিক বিষয়াদি পর্যালোচনা শেষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: