২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

অভিবাসী সমস্যা ॥ যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া


মিসরীয় ধনকুবের নাগিব সোয়ারিসের প্রস্তাবে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র হোসেন মিয়ার কথা মনে পড়ে। হোসেন মিয়া দারিদ্র্যে দীর্ণ পদ্মা নদীর মাঝিদের ময়নাদ্বীপে নিতে নানাভাবে ফুসলায়। ময়নাদ্বীপ সম্পর্কে লেখক বিস্তারিত না বললেও কল্পনা করে নেয়া যায়, উঠতি মুৎসুদ্দি হোসেন মিয়া সেখানে নিজস্ব উপনিবেশ গড়ে নিজের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। নাগিব সোয়ারিস তা করতে চান না। টুইটারে তা-ই বলেছেন। কোন রাজ্য বা উপনিবেশ তৈরির ইচ্ছা থেকে নয়, ইউরোপগামী শরণার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করতে ইতালি বা গ্রীসে দ্বীপ কিনতে চান তিনি। সম্ভাব্য ওই দ্বীপের নামও ঠিক করেছেন- ‘হোপ’।

ধনাঢ্য ব্যক্তির ‘উদার’ হৃদয় এবং উর্বর মস্তিষ্কের যোগ্য প্রস্তাব! প্রশ্ন হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সে দ্বীপ কেনার কথা না ভেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দরিদ্রতম দেশ গ্রীস বা ইতালির প্রতি আগ্রহ কেন? ওই তিন দেশে কি ফাঁকা জায়গা নেই? গ্রীস নিজে ট্রয়কা (ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল)র ঋণ জালে জর্জরিত হয়ে ধুঁকছে সেই দু’হাজার আট থেকে। চব্বিশ হাজার কোটি ইউরো ঋণ আর শতকরা ষাট ভাগ বেকারের বোঝা বইছে যে দেশ, সেখানে আরও কয়েক লাখ শরণার্থী যুক্ত হলে অবস্থা কী দাঁড়াবে সোয়ারিসের কল্পনার ঘোড়া সম্ভবত সে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। ইতালির অর্থনীতির অবস্থাও ভাল নয়। শরণার্থীদের মূল আশ্রয়দাতা হওয়ার কথা তো পুুঁজিবাদী কেন্দ্রের ওই তিন দেশের। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের। কারণ মধ্য এশিয়াসহ অন্যান্য দেশে অস্থিরতা জিইয়ে রাখার মূল নায়ক যুক্তরাষ্ট্র। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স অনুগত ভৃত্যের মতো তাকে অনুসরণ করে। মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে শরণার্থী এলেও মূল স্রোত আসছে সিরিয়া থেকে। প্রায় দু’বছর ধরে চলা যুদ্ধের কারণে ঘর ছেড়েছে চল্লিশ লাখ মানুষ। পুঁজিবাদী কেন্দ্রের শক্তিধর দেশগুলো চেঁচিয়ে গলা ফাটিয়ে এজন্য আইএসকে দায়ী করছে। আর কিউবার প্রবীণ রাজনীতিক ফিদেল ক্যাস্ট্রো আইএস সৃষ্টির জন্য দায়ী করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে। যেমন তারা এক সময় নিজেদের প্রয়োজনে সৃষ্টি করেছিল তালেবান। গত বছর ইসরাইল যখন গাজা উপত্যকায় সর্বাত্মক সামরিক অভিযান চালাচ্ছে সে সময় হঠাৎ করে মধ্যপ্রাচ্যে নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এ্যান্ড সিরিয়াÑ আইসিস প্রচারের আলোয় উদ্ভাসিত হয়। এরপর ইরাকের বড় শহর মসুল দখল করে ইসলামিক স্টেট বা আইএস তাদের অস্তিত্ব জানায়। তাদের নৃশংসতা আগের সব জঙ্গী সংগঠনের নৃশংসতাকে ছাড়িয়ে যায়। আইএস দমনের নামে সহযোগী ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে নিয়ে বিমান হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। সেই শুরু। এখন গৃহযুদ্ধ আখ্যা দেয়া হোক বা অন্য কিছুÑ তাতে কিছু এসে যায় না। সিরিয়া থেকে চল্লিশ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছে এটাই এখন বাস্তবতা। তার চেয়ে বড় বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্র এখন নীরব-নির্বিকার দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। যেন তাদের কিছুই করার নেই। নীরব দর্শক মধ্যপ্রাচ্যে তাদের পোষা কুকুর সৌদি আরব। ইরান ও সিরিয়াকে ঘায়েল করতে যারা জঙ্গী জিহাদী সৃষ্টির কলকব্জা তৈরি করেছিল। মার্কিন সিনেটের চৌদ্দজন সদস্য শরণার্থী সমস্যা সমাধানে সহায়তা করতে অন্তত পঁয়ষট্টি হাজার শরণার্থীকে আমেরিকায় আশ্রয় দেয়ার দাবি জানিয়ে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে চিঠি দিয়ে সমালোচিত হচ্ছেন এই যুক্তিতে যে, শরণার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দিলে ঢুকে পড়বে জঙ্গীরাও। এ শতকের শুরু থেকে জঙ্গী জুজুর ভয় দেখিয়ে ও ‘ভয় পেয়ে’ মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত করার নাটকগুলোর নেপথ্য কাহিনী যে এখন পৃথিবীর মানুষের মুখস্থ সে সম্পর্কে সম্ভবত তাদের ধারণা নেই। অথবা থাকলেও সামান্যতম চক্ষুলজ্জার ধার ধারে না তারা। ইরাক ও সিরিয়ায় আইসিস, আইএসের জন্মতত্ত্ব বিস্তারিত জানিয়েছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সিম্যাস মিলানে। যেমন তথ্য-প্রমাণসহ অকাট্য যুক্তি উপস্থাপন করে দু’হাজার এক-এ টুইন টাওয়ারে তালেবানী হামলার নেপথ্য কাহিনী জানিয়েছিলেন প্রখ্যাত আরেক ব্রিটিশ সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক। বিমান আক্রমণে টাওয়ার ধসানোর কল্পকাহিনীকেই তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

যাহোক, শরণার্থী সমস্যার দায় এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই যে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছেÑ এ নিরাপত্তা ভবিষ্যতে নাও থাকতে পারে। কারণ সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকারকে উৎখাত করতে তাদের সঙ্গে হাত মেলানো ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষক পাঠিয়ে যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুতের আগে ভাবতে পারেনি নিজেদের কর্মফলের ফাঁসে নিজেরাই এভাবে আটকে যাবে। যুদ্ধাক্রান্ত দেশ থেকে স্রোতের মতো শরণার্থী এসে তাদের শান্তির নিদ্রাভঙ্গ করবে। তাদের মতো ক্ষমতাধর দেশগুলোকে ক্রমশ এ সত্য মেনে নিতে বাধ্য হতে হবে যে, পৃথিবীর এক প্রান্তে দিনের পর দিন অশান্তি জিইয়ে রাখলে তাতে আক্রান্ত হতে হবে নিজেদেরও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যত ক্ষমতাধর দেশই হোক এ সমস্যা থেকে তারাও বেশিদিন গা বাঁচাতে পারবে না।

মধ্য এশিয়া কিংবা আফ্রিকা থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে সহজে ইউরোপ পৌঁছা যায় বলে শরণার্থীদের চাপ সেখানে বেশি। যাওয়ার রাস্তাটা সহজ। বিশেষ করে গ্রীস ও ইতালি হয়ে। তাই প্রথম চাপটা ছিল এদের ওপর। সমস্যা সামলাতে এরা বার বার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা চেয়েছিল। কিন্তু প্রথমে তাতে কান দেয়নি ইইউ। উল্টো সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়িয়ে দিয়েছিল ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড। তারাও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দর্শকের ভূমিকা পালন করতে চেয়েছিল। কিন্তু শরণার্থীরা পথ পাল্টে পশ্চিম ইউরোপের দিকে ভিড় জমাতে শুরু করলে অস্বস্তি শুরু হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নে। সমস্যা একেবারে ঘাড়ের ওপর এসে পড়ায় বৈঠকে বসতে হয় তাদের। বাধ্য হতে হয় শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে। সবচেয়ে বড় সংখ্যায় শরণার্থী আশ্রয় দিচ্ছে জার্মানি। গাঁইগুঁই করে চাপের মুখে ব্রিটেন শেষ পর্যন্ত পনেরো হাজার শরণার্থী আশ্রয় দিতে রাজি হলেও প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন জানিয়েছেন, আগামী মাসে সিরিয়ায় আইএসের ওপর বিমান হামলা চালাবে তারা।

শরণার্থী সমস্যা কেন্দ্র করে বেরিয়ে এসেছে হাঙ্গেরির মনের ভেতরে পুষে রাখা ঐতিহাসিক ক্ষোভ। শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে প্রথম থেকেই তাদের আপত্তি ছিল। এক সময় বলেই ফেলেছে, মুসলমান শরণার্থীদের তারা আশ্রয় দেবে না। কারণ এককালে অটোমান সাম্রাজ্যের মুসলিম শাসকরা তাদের ওপর নির্দয় আচরণ করেছিল। পাঁচ শ’ বছর আগে অটোমানরা উত্তর আফ্রিকার বেশির ভাগ অঞ্চল জয় করেছিল প্রথম সুলাইমানের আমলে। তাঁর শাসনকালে হাঙ্গেরির সীমান্তের অনেকটাই কমিয়ে আনা হয়েছিল। ভিয়েনা অবরোধ করা হয়েছিল এবং দখল করা হয়েছিল রোডস। সে সময় অটোমান সাম্রাজ্য দানিউবের পাড়ে বুদাপেস্ট থেকে টাইগ্রিসের পাড়ে বাগদাদ পর্যন্ত এবং ক্রিমিয়া থেকে নীল নদের প্রথম জলপ্রপাত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। হাঙ্গেরি অতীত সে স্মৃতি ভুলতে পারেনি। তাই শরণার্থীদের দুঃসহ অবস্থা তাদের স্পর্শ করেনি। স্পর্শ করেছে ভ্যাটিকানের বর্তমান পোপকে। প্রতিটি ক্যাথলিক গির্জা, পবিত্র স্থান ও প্রতিষ্ঠানকে ইউরোপে আসা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সারা পৃথিবীর বিশপদের নির্দেশ দিয়েছেন শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে। ভ্যাটিকানও দ্বার খুলেছে। কমপক্ষে দুটি পরিবারকে ভ্যাটিকান আশ্রয় দেবে বলে আশ্বস্ত করেছেন পোপ। তবে তার এ আহ্বান শুধু খ্রীস্টান শরণার্থীদের জন্য।

ভাবলে খানিকটা অবাক তো হতেই হয়Ñ চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখেও ধর্মীয় পরিচয় কখনও কখনও বড় হয়ে ওঠে। এ বিশ্ব ব্যবস্থার মূল অসঙ্গতিগুলোর এও অন্যতম একটি। একে লালন করে জিইয়ে রাখলে বিশ্বকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা যায় সহজে। তাতে খুশি থাকেন অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। আর তাদের খুশি রাখার চেষ্টায় সদাসর্বদা নিয়োজিত বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি ও তার ইউরোপীয় অনুগত মিত্ররা। কিন্তু সব ক্রিয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার সেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সামান্যই দৃশ্যমান হচ্ছে এখন। একে এড়াতে পারবে না পুঁজিবাদী বিশ্ব। এড়াতে হলে বন্ধ করতে হবে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা।