২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জঙ্গীবাদী রাজনীতির ভূতল আশ্রয়ী শক্তি


বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ল্যান্ডস্কেপ জটিল ও বৈপরীত্যে ভরা। তার ওপর আছে বিভিন্ন ধরনের চাপ। এসবের একটি হচ্ছে : উনিশ শতাব্দী উৎসারিত রিফর্ম আন্দোলন। ১৯৪৭-এর ভারত বিভাজন গভীরভাবে রিফর্ম আন্দোলনের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এই প্রভাবের একদিকে আছে সেক্যুলার ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান হয়েছে; কিন্তু সেক্যুলারিজম থেকে গেছে। শিক্ষিত মুসলমান ও শিক্ষিত হিন্দু সমাজ ইংরেজীর মাধ্যমে জীবনযাপন করেছে। ক্লাসিক্যাল ভাষার মর্যাদার চেয়ে কলোনিয়াল ইংরেজীর মর্যাদা কার্যকর থাকার দরুন, রাষ্ট্রপরিচালনায়, শিক্ষায় ইংরেজীর প্রভুত্ব মেনে নেয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতে ইংরেজীর প্রভুত্ব ও উচ্চশিক্ষায় ইংরেজীর প্রভুত্ব সেক্যুলারিজমের শক্তি বৃদ্ধি করেছে; পাকিস্তান হওয়া সত্ত্বেও, আরবী ও ফার্সীর প্রভুত্বের বদলে রাষ্ট্রপরিচালনায় কলোনিয়াল ইংরেজী ভাষার মর্যাদা মেনে নেয়া হয়েছে। মুসলমানদের দেশেও ভাষাকে রিফর্ম করা হয়নি। এ সবের আন্দোলন উর্দুকে উচ্ছেদ করেনি, বরং বাংলা ও ইংরেজীকে শিক্ষায়তনিক রিফর্মে স্থান দিয়েছে। উচ্চ আদালত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা সরাসরি কলোনিয়াল অবস্থান মেনে নিয়েছে, বাংলাভাষা উর্দুভাষাকে ধাক্কা দিয়েছে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় উচ্চশিক্ষায় ইংরেজীর অবস্থান বরং শক্তি অর্জন করেছে। আদালতের রায় ইংরেজীতে হয়েছে, এখনও তা-ই, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পড়াশোনা, এখনও তা-ই, বুর্জোয়াদের ছেলেমেয়েরা আধুনিক পেশাগত দক্ষতা বাংলায় নয়, ইংরেজীতে অর্জন করে। এই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।

দু’ধরনের রিফর্ম আন্দোলন ১৯৪৭ থেকে এ পর্যন্ত ঘটেছে। প্রথমটি হচ্ছে ভাষাগত। ভাষাগত আন্দোলন সেক্যুলার ধরনের, এ ধরনের আন্দোলন প্রধানত সামাজিক ও রাজনৈতিক। সামাজিক ও রাজনৈতিক রিফর্ম আন্দোলন তৈরি করেছে বিভিন্ন অভিঘাত, কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে বাঙালী জনসমষ্টিকে স্বাধীনতার পক্ষে একত্র করেছে। একদিকে গ্রামাঞ্চল ও শহরাঞ্চল সংগঠিত হয়েছে, অন্যদিকে পুরুষ ও নারী স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হয়েছে। আবার ধর্মজ রিফর্ম কলোনিয়ালিজমের পিছু পিছু চলেছে, সেক্যুলার আন্দোলনের বদলে ধর্মজ আন্দোলন স্বাধীনতার চেয়ে শক্তিশালী মনে করেছে মাদ্রাসা শিক্ষা : দেওবন্দের দার-উল-উলুম কিংবা নাদ-ওয়াত-উল-উলুম লক্ষেèৗভিত্তিক ধর্মজ শিক্ষা।

ভাষাগত রিফর্ম থেকে তৈরি হয়েছে মধ্যপন্থী ও বামপন্থী রাজনীতি। এই রাজনীতি আবার সেক্যুলার ধরনের। ধর্মজ রিফর্ম এবং শিক্ষাগত রিফর্মের মধ্যে পার্থক্য আছে। শিক্ষাগত বহু প্রতিষ্ঠান, যে সব জন্ম নিয়েছে কলোনিয়াল এ্যাপারেটাস থেকে, যেমন সরকারী স্কুল এবং কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়, তাদের সঙ্গে যুগান্তরের তফাত মাদ্রাসার। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা, অস্তিত্বের দিক থেকে এবং ভাব জগতের দিক থেকে অন্য কোন জগতের বাসিন্দা। তারা নিশ্চিতভাবে আধুনিক সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী। এখান থেকে আধুনিকতা তৈরি হয় না, তৈরি হয় ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মাল-মসলা।

ধর্মজ আন্দোলন থেকে তৈরি হয়েছে দক্ষিণপন্থী রাজনীতি। বাংলাদেশে দক্ষিণপন্থী রাজনীতি হচ্ছে : জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম এবং বিএনপি। বিএনপির এক অংশ এসেছে সেনাবাহিনী থেকে, অপর অংশ এসেছে দক্ষিণপন্থী রাজনীতি থেকে। ’৭৫ পরবর্তী রাজনীতি এবং ’৭৫ পরবর্তী সেনা রাজনীতির অংশ এক্ষেত্রে। আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করা ও বাম রাজনীতির বিরোধিতা করা, ধর্মজ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এই রাজনীতির কাজ। সেজন্য জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম এবং বিএনপির রাজনীতির মধ্যে কোন তফাত খুঁজে পাওয়া যায় না। ডি-কলোনাইজেশনের পর, সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের বিভিন্ন লতাতন্তুর খোঁজ মেলে। এসব কিছুকে সহজভাবে বলা যায় : জাতীয় আন্দোলন। এসব আন্দোলনের গণচরিত্রকে আধুনিক কথ্য ভাষা বলে অভিহিত করা যায়। বাংলাদেশের আধুনিক/আঞ্চলিক ভাষা বিভিন্নভাবে বেড়ে উঠেছে : পাহাড়ী ভাষা কিংবা আরণ্যক ভাষা, কিংবা চট্টগ্রামের ভাষা অথবা নোয়াখালীর ভাষা। এসব ভাষা ব্যবহার রাজনৈতিক মবিলাইজেশন বলে চিহ্নিত করা যায়। আমরা হয়ত উপেক্ষা করতে পারি; কিন্তু রিফর্ম আন্দোলন অথবা ধর্মজ আন্দোলন এক নয়। ধর্মজ আন্দোলনের মধ্যে পুনরুজ্জীবনবাদিতা সোচ্চার হওয়া সত্ত্বেও, জাতীয় আন্দোলনের রেশ খোঁজা যায়।

জাতীয় আন্দোলনকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করছে মধ্যপন্থী ও বামপন্থী বিশ্বাস; অন্যদিকে অন্যভাবে ব্যবহার করছে দক্ষিণপন্থী বিশ্বাস। মধ্যপন্থী ও বামপন্থী বিশ্বাসের মধ্যে সাধারণ মানুষের ভূমিকা আছে। এই ভূমিকা আমরা দেখেছি সাতচল্লিশ-উত্তর সাধারণ মানুষের তেভাগা আন্দোলনের ক্ষেত্রে : মুসলিম কৃষক, হিন্দু কৃষক, সাঁওতাল কৃষক, হাজং কৃষকদের ক্ষেত্রে সব ধরনের কৃষকরা এক সঙ্গে লড়াই করেছে এবং বেঁচে থাকার লড়াইকে শক্তিশালী করেছে। এক সঙ্গে লড়াই করা ও লড়াই থেকে পিছু না হটা এই আন্দোলনের চরিত্র। কলোনাইজেশন, ডি-কলোনাইজেশনের মধ্যকার তফাত আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। আমরা লড়াই করেছি কলোনাইজেশনের বিরুদ্ধে ও কলোনাইজেশনকে ছিন্নভিন্ন করে জমির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি। এই অধিকার থেকে মুসলমান-হিন্দু-সাঁওতাল-হাজং কৃষক সরে যায়নি। সরে না-যাওয়া ও হটে না-যাওয়া এই আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য। এই আন্দোলন, এভাবেই, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভুবনকে সেক্যুলার করেছে।

অন্যপক্ষে ধর্মজ আন্দোলন রক্ষণশীল কাঠামো তৈরি করেছে। ধর্মজ আন্দোলন শিক্ষা বিস্তারের নামে অসংখ্য এন্টারপ্রাইজ প্রতিষ্ঠা করেছে, সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মজ উপাদানগুলো থেকে নির্মিত হয়েছে মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা। এখান থেকে দেখা দিয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক ধারা। এই ধারাই জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম এবং বিএনপি। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি এভাবে টিকে আছে। বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজত মধ্যপন্থী রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি আধুনিকতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে চলেছে, এই বিরোধিতা তৈরি করেছে ইসলামী জঙ্গীবাদ, জঙ্গীবাদী রাজনীতির ভূতল আশ্রয়ী শক্তি এখানেই।