২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ব্লগার মানে লেখক মারুফ রায়হান


না, ভুল দেখেননি। ভুল পড়েনওনি। ব্লগার মানে লেখক, অনলাইনে যিনি শব্দের মিনার গড়েন তিনিই ব্লগার। পত্রলেখকও লেখক বটে, আবার ঔপন্যাসিকও লেখক। কবি, প্রাবন্ধিক, গদ্যকার-পদ্যকার সবাই লেখক। দু’কলম লিখতে সবাই পারেন, লিখতে চানও বহু মানুষ। কিন্তু লিখতে গিয়ে বোঝেন যে, যুক্তি পরম্পরা বজায় রেখে অর্থপূর্ণ বাক্য লেখা জলের মতো অত সোজা নয়। কারণ এ নয় দু’ছত্রের ফেসবুকিং। একটা কমেন্ট করলাম, একটা স্ট্যাটাস দিলাম। ব্যস। অর্থহীন এলেবেলে বাক্য নয়, অর্থপূর্ণ বাক্য লেখা বা লিখতে পারা একজন লেখকের প্রথম গুণ, অতিআবশ্যিক শর্ত এবং একই সঙ্গে অবশ্যই শুদ্ধ বাক্য লেখাটাও। খেয়াল করে দেখুনÑ দুটো তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ আছে আগের বক্তব্যে। ‘অর্থপূর্ণ’ এবং ‘শুদ্ধ’। আবার এ দুটোর ভেতরে আন্তঃসম্পর্কও রয়েছে। অর্থপূর্ণ বাক্য লিখলেন, অথচ তাতে ব্যাকরণের ভুল থেকে গেল, বানানবিভ্রাট ঘটল, আর বাক্য-গঠনসংক্রান্ত ত্রুটিও বিদ্যমান থাকল। তাহলে সে বাক্যে শুদ্ধতার ঘাটতি থেকে যাবে। তবু সেটি বক্তব্যের বিবেচনায় অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মুখের কথা আর লিখিত বাক্যে এখানেই পার্থক্য। তাই তিনিই ভাল লেখক যিনি লেখার কাজটি করেন দক্ষতার সঙ্গে, জেনে বুঝে। ভাষার ওপর যার প্রয়োজনীয় দখল রয়েছে। ব্লগার কিন্তু অতশত ভেবে লেখেন না, বিশেষ করে যিনি নতুন ব্লগার। তাহলে তার লেখা থেমে যেত। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দু’শ’ গজ গিয়ে একেবারে ফুলস্টপ পড়ে যেত। অবশ্য আমাদের দেশে অনলাইনে লেখালেখি বা ব্লগিং খুব বেশিদিন আগের তো নয়। মাত্র এক দশক পার করেছি। এই এক দশকেই একগুচ্ছ নাম মুখেমুখে, মানে কম্পিউটারে-কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়েছে। বলতে ভুলে গেছি, সাহিত্যিকদের কলম-নাম বা ছদ্ম নাম ধারণ করার মতো ব্লগারদের অনেকের ভেতরেই একটা ভিন্ন নাম গ্রহণের প্রবণতা রয়েছে। সেই সাবেক আমলে বাংলা সাহিত্যের বাঘা বাঘা অনেক লেখকই ছোট্ট একটা নাম ধারণ করে লেখালেখি করতেন। অনেকেই জানেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নাম নিয়েছিলেন ‘নীললোহিত’। মাসুদ রানার লেখক কাজী আনোয়ার হোসেনেরও ছিল আরেকটা নামÑ বিদ্যুৎ মিত্র।

যা হোক, সংবাদপত্রে বা পত্রিকায় লেখা ছাপানো চাট্টিখানি কথা নয়। বিভাগীয় সম্পাদক সন্তুষ্ট হলে তবেই ছাড়পত্র মেলে প্রকাশের। সাহিত্য সম্পাদকের কাছে গাদা গাদা কবিতা নিয়ে গেছেন বহুদিন আমার পরিচিত একজন। তবু একটাও কবিতা ছাপা হয়নি তার। এমন উদাহরণ অজস্র। মান্না দের ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানখানিতেও এমন লেখকের দেখা আমরা পাই। কিন্তু ব্লগারের অত ঝক্কি বা উৎকণ্ঠার কিছু নেই। তিনি নিজেও ব্লগ বানাতে পারেন। কিংবা কোন ব্লগের সদস্য হয়ে সেখানে লিখে যেতে পারেন। প্রতিষ্ঠিত আর দায়িত্বশীল ব্লগ কর্তৃপক্ষ তাদের ব্লগে কোন লেখা তুলে দেয়ার আগে সেটা পড়ে দেন। প্রয়োজনে প্রকাশ-স্থগিত রাখেন কিংবা এডিট বা সম্পাদনা করেন। আবার কোন কোন ব্লগের থাকে নিজস্ব নীতিমালা। সেই নীতিমালার পরিপন্থী কিছু হলে সেই লেখা ব্লগের উন্মুক্ত প্রান্তরে প্রবেশাধিকার পায় না। তবু ব্লগ হলো সদ্য নবীন লিখিয়ের জন্য আত্মপ্রকাশের সহজ সুগম দারুণ এক মাধ্যম। বলতে পারি, ব্লগ হলো ‘যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা’। কম্পিউটারের চাবি চেপে চেপে শব্দের পর শব্দ লিখে আকাশের দেয়ালে নিজের লেখাখানি তুলে দেয়া। সেই লেখা কেউ না কেউ পড়েন, দু-চারটে ভালোমন্দ মন্তব্য আসে। এভাবেই সৃষ্টিশীল নবীন লেখক আস্তে আস্তে নিজের লেখার প্রেরণা খুঁজে পান, ভালমন্দ বিচার করতে শেখেন। লেগে থাকলে দস্তুরমতো লেখক হয়ে ওঠেন কালেকালে। বলা দরকার, ব্লগাররা সৃষ্টিশীল ও মননশীল উভয় বিষয়েই শব্দচর্চা করেন। দেশ, সমাজ ও বিশ্বের নানা বিষয় সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করেন। সতীর্থ ব্লগাররা সেইসব লেখা ও মত নিয়ে নিজেদের অনুভূতি ও মন্তব্য প্রকাশ করেন। এভাবে তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে কোন একটি বক্তব্যের নানা দিক উঠে আসে। সেখানে হীরদ্যুতি ছড়ায় তথ্য, সত্য ও বিশ্লেষণ। দারুণ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এসব আলোচনা ও আলোকপাত। প্রিন্ট মিডিয়ার থাকে সীমাবদ্ধ পরিসর। পক্ষান্তরে ব্লগাররা পান মত প্রকাশের বিশদ স্পেস।

একজন মানুষ কেন লেখেন? নানা কারণেই তো লেখেন। নাম কামাতে চান কেউ। লোকে তাকে কবি বা লেখক বলুক, সম্মান দিক, এসব চান। আবার একান্ত নিজের কিছু কথা থাকে, ভাব প্রকাশের কৌশল ও ভঙ্গি থাকে, যা কারও সঙ্গে মেলে না। তাই তিনি তার ভাবনাগুলোকে অন্যের মনন-প্রান্তরে ছড়িয়ে দিকে চান। সমর্থন চান, সান্ত¡না খোঁজেন। একটুখানি আত্মতৃপ্তিও তার চাই। আবারও বলি, ব্লগার মানে লেখক, অন্য কিছু নয়। শব্দই তার সম্বল; সঙ্গী ও সঙ্গিন। তবু একদল মানুষ কেন ‘ব্লগার’ আর ‘নাস্তিক’ শব্দ দুটোকে একসূত্রে গেঁথে অপপ্রচার চালাল এবং এখনও চালাচ্ছে? এর উত্তর ব্লগাররা জানেন, দেশের আলোকিত মানুষমাত্রই জানেন। যিনি একটু পিছিয়ে পড়া, জ্ঞানে ও তথ্যেÑ সেই মানুষটাকে বিভ্রান্ত করার জন্যই ওই অপপ্রচার। একটি দেশের সব নাগরিক সর্ববিষয়ে সহমত পোষণ করবেনÑ এমনটা ভাবা নির্বুদ্ধিতা। মতভেদ ও বিতর্ক সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরী। একটি পরিবারের কথাই ভাবা যাক। পরিবারের একজন ‘এ’ দলের কট্টর সমর্থক, অপর সদস্য ‘বি’ দলের প্রতি দুর্বল। একজন ভালোবাসেন নজরুল সঙ্গীত, তো অপরজন অনুরাগী রবীন্দ্রনাথের গানের। লেখকদের বেলায়ও এমনই। তাই ঢালাওভাবে লেখকদের কেউ বা কোন গোষ্ঠী যদি বিশেষ তকমা এঁটে দিতে চায়, তবে বুঝতে হবে সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটা ছোট শহরে বা গ্রামে দু-তিনজন নাস্তিক থাকা অসম্ভব নয়। তাই বলে ওই শহর বা গ্রামের সবাই তো আর নাস্তিক হয়ে যান না। ব্লগার বা লেখক কিংবা যে কোন পেশাজীবী শ্রেণীর বেলায়ও কথাটা সত্য। এটুকু বুঝলেই ঢালাও অপবাদের সপক্ষে কোন যুক্তি আর ধোপে টিকবে না।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এদেশের প্রায় সবাই অংশ নিয়েছিল। নেয়নি কেবল গুটিকতক ব্যক্তি। তারা জামায়াত রাজাকার আলবদর আল শামস। তারা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে স্বাধীনতাকামীদের হত্যাযজ্ঞে মেতেছিল। স্বাধীনতার কয়েক দশক পরে সেই সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হলে এবং প্রথম দফা বিচার শেষে কাক্সিক্ষত রায় না আসায় সর্বপ্রথম গর্জে উঠেছিল ওই ব্লগাররাই, এদেশের তরুণ মুক্তমনারা। যারা রাজনীতির কূটচাল বোঝে না, সংকীর্ণ স্বার্থচিন্তা করে নাÑ তাদেরই আহ্বানে শাহবাগে ঘটেছিল অভূতপূর্ব গণজাগরণ। পরের ইতিহাস সবার জানা। শেষ পর্যন্ত সেই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর হতে দেখেছিল জাতি। যুদ্ধাপরাধী মহলের এই পরাজয় মূলত যাদের কারণে হয়েছিল, সেই ব্লগারদের কিভাবে সহ্য করবে যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের অনুসারী ও বংশধরেরা? তাই কৌশল হিসেবে তারা ব্লগারদের ঢালাওভাবে ‘নাস্তিক’ অপবাদ দিতে শুরু করল। বাংলা ভাষা, বাংলা শব্দ, বাঙালী সংস্কৃতি নিয়ে যারা কাজ করছে, এমনিতেই তো তারা ছিল ওদের চক্ষুশূল। ডিজিটাল প্রজন্মের বাইরে রয়ে গেছে শিক্ষাবঞ্চিত, ধর্মপ্রাণ, কর্মহীন, পারিবারিকভাবে অসচ্ছল অসংখ্য তরুণ। তাদের একটি অংশকে বুঝিয়ে সুজিয়ে উল্টোপথে চালাতে শুরু করল তারা। বলাবাহুল্য, এটি সাময়িক। আমাদের প্রত্যাশা, ব্লগাররা এবং দেশের সচেতন ব্যক্তিবর্গ আগামীতে এমন একটি বুদ্ধি ও কর্মকৌশল বের করবেন, যাতে বিপথগামী তরুণরা সত্য ও আলোর পথে ফিরে আসতে সক্ষম হন। ব্লগারদের উদ্দেশে কবিতার ভাষায় আমরা বলতেই পারিÑ ‘তুমি আর ভবিষ্যত হাত ধরে যাচ্ছো পরস্পর’।

marufraihan71@gmail.com