২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

গঙ্গা যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব ॥ প্রতিবাদী নাটক ‘ভূতনাথ’


গৌতম পাণ্ডে ॥ পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষকে বিবেচনা করা হয় শুধু উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবে। সেখানে মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও স্বাধীনতার মূল্য থাকে না। এখানে সাধারণ একটা উৎপাদনযন্ত্র, স্ত্রু ড্রাইভার বা একটা সেলাই মেশিনের যতটুকু যতœ নেয়া প্রয়োজন একজন শ্রমিকের অধিকারও ততটুকু। এ সমাজের কর্মক্ষেত্রের বেড়াজালে মানুষ বসবাস করছে এক বন্দী জীবনে। এই সমাজ ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা জব কালচারে লালিত প্রায় আশিভাগ কর্মচারী তাদের কাজের মধ্যে নিজেদের জীবনের কিছুই খুঁজে পান না। যন্ত্রবৎ একই ধরনের কাজের রিপিটেশন করে যেতে হয়, বেঁচে থাকার জন্য মাইনে হিসেবে কিছু টাকা পেয়ে। ফলে এমটি জব কালচার জন্ম দিয়েছে এক দাসপ্রথার। যেখানে কাজ করতে হয় ওয়েজ সেøভদের। এরা প্রতিবাদ তেমন করেন না, নিজেদের আত্মার ক্ষয় সম্পর্কেও তেমন ক্ষুব্ধ নয়, কারণ তাদের জীবন একঘেয়েমিতে পরিণত হয়েছে। কালের ব্যবধানে এর অনেকটা পরিবর্তন এসেছে। মানুষ কিছুটা হলেও এর প্রতিবাদ করতে শিখেছে। এমনই এক প্রতিবাদী গল্প নিয়ে নাটক ‘ভূতনাথ’। শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত ‘গঙ্গা যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবের দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় ভারতের সংস্তব নাট্যদলের প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হয় এ নাটক। বিশেষ চরিত্রের কমেডি এ নাটকটি লিখেছেন মোহিত চট্টোপাধ্যায় এবং নির্দেশনা দিয়েছেন দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়। নাটকে দেখা যায়, একটি অফিসের টাইপিস্ট ভূতনাথ। আপন বলতে পৃথিবীতে তেমন কেউ নেই। দীর্ঘদিন ধরে নিরলস কাজ করছেন এ অফিসে। তার সরলতার সুযোগে অফিসের অন্য কর্মকর্তারাও অহেতুক তাকে কাজের বোঝা চাপিয়ে দেন। অফিসের বড়বাবু তার সরলতা ও কাজের প্রতি একাগ্রতায় তাকে খুব স্নেহ করেন। অফিসের অন্য সবাই কাজে ফাঁকি দিলেও ভূতনাথ কখনও তার কাজে ফাঁকি দেয় না। টাইফ করতে ভূতনাথের এমন অবস্থা হয়েছে যে কারও সঙ্গে কথা বলার সময়েও সে টাইপের ন্যায় অঙ্গভঙ্গি করতে থাকে। হঠাৎ ভূতনাথের মধ্যে এক প্রতিবাদী চেতনার উন্মেষ হয়। সে অফিসের কারও হুকুম মানতে রাজি হয় না। এমনকি বড়বাবুর হুকুমও সে প্রত্যাখ্যান করে। অন্য সবাই তার এ খামখেয়ালিপনাকে অগ্রাহ্য করলেও বড়বাবু তাকে বুঝিয়ে কাজে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করে। বড়বাবু দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করছেন। কোন এক সময়ে তার মনে পড়ে যায় চাকরি জীবনের প্রথম দিকের কথা। সেই সময়ে তার লেখা ডায়রি খুঁজে সে দেখতে পায়, ভূতনাথের মতো তার জীবনে এমন এক সময় এসেছিল। বড়বাবু এ চেতনা থেকে ভূতনাথের মানসিক অবস্থা অনুভব করতে পারে। এভাবেই ভূতনাথের মধ্যদিয়ে নাটকটি এক বাস্তবিক রূপ পরিগ্রহ করে। মেলভিল ১৮৫৩ সালে ‘বার্টলিবয় দ্য সেরিভেনার’ নামের একটি গল্প লেখেন। খুব ছোট হলেও গল্পটি ছিল বর্ণনামূলক। সংলাপ নেই বললেই চলে। কাহিনীও খুব গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক মডেলে গড়ে ওঠা এ জব কালচারটি নিয়ে লেখা মেলভিলের এ গল্পটি ছিল নানাবিধ সঙ্কটে ভরা। এ গল্প থেকে নির্যাস নিয়ে অতি সাবলীলভাবে নাটক আকারে উপস্থাপন করেছেন মোহিত চট্টোপাধ্যায়। তিনি নিজেই বলেছেন, মেলভিলের গল্পটি ছিল ট্রাজিক। আমি গল্প থেকে কালের ব্যবধানের জন্য অনেকটাই সরে গেছি এবং একটা পঁজেটিভ নোটে উপসংহার খুঁজেছি। নাটকে বড়বাবু চরিত্রে নির্দেশক দ্বিজেন বন্দোপাধ্যায় নিজেই অভিনয় করেছেন। কেন্দ্রীয় চরিত্র ভূতনাথের ভূমিকায় ছিলেন পার্থ সারথী চন্দ্র, এবং অন্য যারা অভিনয় করেছেন তারা হলেন- ঘটক (পার্থ সেনগুপ্ত), দত্ত (সুব্রত সমাজদার), ডাক্তার (সুনীল মুখার্জী, মি নন্দী (শেখর চক্রবর্তী) এবং পা-ুর ভূমিকায় ছিলেন পিনাকী মুখোপাধ্যায়। নামাঙ্কন করেছেন তড়িৎ চৌধুরী, শব্দ প্রক্ষেপণ অনুপ ধর, মঞ্চ নির্মাণ মদন টিঙ্কু, রূপসজ্জা পঞ্চানন দে এবং প্রযোজনা নিয়ন্ত্রণে ছিলেন শেখর চক্রবর্তী।