২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

তদন্ত গাফিলতিতে দ্রুত ফাইল চেয়েছে দুদক


স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিমানের লন্ডন ফ্লাইটে জালিয়াতির মাধ্যমে অতিরিক্ত সাড়ে তিন টন কার্গো পাঠানোর ঘটনা তদন্ত নিয়ে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। ত্রিশ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময়সীমা নির্ধারণ থাকলেও তদন্ত কমিটির প্রধান রহস্যজনক কারণে সম্পন্ন করতে পারেননি। এ অবস্থায় তৎপর হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। বিমানের লন্ডন ফ্লাইটে কোটি টাকার কার্গো মাল জালিয়াতির ঘটনায় সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) তদন্ত রিপোর্ট ও নথিপত্র দিতে বলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ নিয়ে বিমানে দেখা দিয়েছে দুদক আতঙ্ক।

সোমবার বিমানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন মোসাদ্দিক আহমেদ জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, দুদক একটা নোটিস দিয়েছে। নোটিসে বিমানের তদন্ত রিপোর্ট চেয়েছে।

উল্লেখ্য সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশের পর বিমানে তোলপাড় হয়। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর তদন্ত কমিটি নড়ে চড়ে বসে। কিন্তু দুর্নীতির মূলনায়ক কার্গোর মহাব্যবস্থাপক আলী আহসান বাবুসহ অন্যান্য প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে ত্রিশ কার্যদিবসের তদন্তেও জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। এ নিয়ে বিমানের পর্ষদ সদস্যরাও ক্ষুব্ধ।

এ অবস্থায় তদন্ত কমিটি প্রধান ডিজিএম আব্দুল ওয়াদুদ আবারও তদন্তের সময় বাড়ানোর আবেদন করেন। তিনি অজুহাত দেখানÑ তদন্ত কমিটির এক সদস্য সৌদি আরব চলে গেছেন। আর এতে এক জিএম ও পাইলট অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এভাবে তিনি তদন্তের নামে কালক্ষেপণ করে চলেছেন।

জালিয়াতির প্রধান সন্দেহভাজন আলী আহসান বাবুকে কেন এখনও পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেননি প্রশ্ন করা হলেÑ তদন্ত কমিটির প্রধান ডিজিএম আব্দুল ওয়াদুদ সোমবার রাতে জনকণ্ঠকে বলেন, এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। আগামী তিন দিনের মধ্যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এখন তদন্ত রির্পোট লেখায় ব্যস্ত আছি।

জানা যায়, বিমানের তদন্ত কমিটি টালবাহানা করলেও ঠিকই তৎপর দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদকের কাছে অভিযোগ রয়েছে, লন্ডন ফ্লাইটে হিসাবের অতিরিক্ত সাড়ে তিন টন কার্গো পণ্য পরিবহনে আদায়কৃত ভাড়া বিমানের তহবিলে জমা না দিয়ে আত্মসাত করা হয়েছে। এ অভিযোগ দুদকে এলে তা প্রাথমিকভাবে যাচাই করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।

সোমবার দুদক সূত্র জানায়, এ বিষয়ে নথিপত্র তলব করে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নোটিস পাঠিয়েছেন দুদকের উপ-পরিচালক মির্জা জাহিদুল আলম। নোটিসে আগামী ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দুদককে সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। বিমানের এমডিকে দেয়া দুদকের চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটের দায়িত্ব পালনরত ক্যাপ্টেন-পাইলট এবং কেবিন ক্রুসহ অন্য স্টাফদের নাম-ঠিকানার তালিকা ও লোড শিটের কপি চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটে কার্গো মাল লোডে দায়িত্বরত বিমানের নিরাপত্তা শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী, কাস্টমসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কার্গো শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম-ঠিকানার তালিকা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহনকৃত কার্গো মালের বিবরণ সংবলিত তালিকা, এয়ারওয়েজ বিল এবং রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানাসহ এ সংক্রান্ত তথ্য ও রেকর্ড-পত্রের কপি চাওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটটি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণের পর বিমানের ক্যাপ্টেন ঢাকা থেকে দেয়া হিসেবের চেয়েও যে অতিরিক্ত তিন হাজার ৩৩৪ কেজি কার্গো মাল পায় সে সংক্রান্ত তথ্য ও রেকর্ড-পত্র নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে সরবরাহ করতে হবে। একই সময়ের মধ্যে যাত্রী ও কার্গো অনুযায়ী স্বাভাবিক জ্বালানি তেলের চেয়ে যে অতিরিক্ত তেল পুড়েছে তার তুলনামূলক হিসাব বিবরণীর তথ্য ও রেকর্ড-পত্রের কপি চাওয়া হয়েছে। এছাড়া হিথরো বিমানবন্দরে অতিরিক্ত কার্গো মাল উদ্ঘাটনের পর সেখানকার অপারেশন ম্যানেজার বাংলাদেশ বিমানের এমডির কাছে যে প্রতিবেদন পাঠান সে প্রতিবেদনের কপিও চাওয়া হয়েছে।

দুদকের পক্ষ থেকে বিমানের এমডির কাছে আরও যেসব রেকর্ড-পত্র চাওয়া হয়েছে সেসবের মধ্যে রয়েছে, ঢাকা থেকে লন্ডন রুটের কেজিপ্রতি কার্গো মাল ভাড়ার নির্ধারিত হার এবং জালিয়াতির ঘটনায় বিমানের পক্ষ থেকে যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় সে তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন।

জানা যায়, কার্গো মাল জালিয়াতির ঘটনাটি গত ৩ জুলাই লন্ডনে ফাঁস হয়। ওই দিন হযরত শাহজালাল (র) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সকাল দশটায় বিমানের বিজি ০০১ নামের ফ্লাইটটি লন্ডনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। হিসাবের অতিরিক্ত মাল নিয়ে ঢাকা থেকে বিমানের ফ্লাইট নিয়ে যখন লন্ডন অবতরণ করেন, তখন পাইলট সেখানেই কার্গোর ওজন মাপেন। তাতেই ধরা পড়ে হিসাবের বাইরে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে পাঠানো অতিরিক্ত মাল পাচারের বিষয়টি। হিসাবের বাইরে এই অতিরিক্ত মাল পাঠানো হয়েছে বিমানের কার্গো শাখা থেকে। এ পণ্য পরিবহনের ভাড়া (চার্জ) প্রায় এক কোটি টাকা। ওই ফ্লাইটে ছিলেন ক্যাপ্টেন ইশতিয়াক ও ক্যাপ্টেন নাদিম। যাত্রী ছিলেন ৪৯। ফ্লাইট টেক অফ করার আগে ক্যাপ্টেন ইশতিয়াক লোড শিটে দেখতে পান, যত সংখ্যক যাত্রী ও কার্গো আছে তা খুবই স্বাভাবিক। তাতে জ্বালানি তেল খুব বেশি পোড়ার মতো নয়। কিন্তু আকাশে ওড়ার পর তিনি দেখতে পান, ওজনের বিপরীতে জাহাজের যে পরিমাণ জ্বালানি তেল পোড়ার কথা, তার চেয়েও বেশি পুড়ছে। তাই হিথরো বিমানবন্দরে যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পর তিনি ওই ফ্লাইটের কার্গো মাল ওজন করান। জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পরপরই বিমানের অপারেশন ম্যানেজার আশরাফুল ঢাকায় বিমানের এমডির কাছে লেখা এক চিঠিতে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, লোড শিটের বাইরে জালিয়াতির মাধ্যমে কার্গোমাল বহন করা শুধু বাণিজ্যিকভাবে বিমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, এতে ওই ফ্লাইটের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত এমডি ক্যাপ্টেন মোসাদ্দিক আহমেদ বলেন, তদন্ত কমিটির সময় বাড়ানো ও নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি অনুমোদন করে গেছেন কাইল। এটা আমার করা নয়। আসলে জিএম মর্যাদার কারোর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গেলে কমিটিতেও একজন জিএম থাকতে হয়।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: