১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এবারও কাউন্সিল ছাড়া জেলা উপজেলা কমিটির টার্গেট বিএনপির


শরীফুল ইসলাম ॥ কাউন্সিলের মাধ্যমে সারাদেশের সকল জেলা-উপজেলা কমিটি করার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি বিএনপি। কেন্দ্র থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর স্থানীয়ভাবে বেশ ক’টি জেলা-উপজেলায় কাউন্সিল করে নতুন কমিটি করার চেষ্টা চালানো হলেও নেতাকর্মীদের কোন্দলসহ বিভিন্ন কারণে তা সম্ভব হয়নি। তাই আগের মতো এবারও কাউন্সিল ছাড়া জেলা-উপজেলা কমিটি করার টার্গেট নিয়েছে দলটি।

এদিকে কাউন্সিল করে জেলা-উপজেলা কমিটি করা সম্ভব হবে না এমনটি ধরে নিয়েই বিএনপি হাইকমান্ড বিভিন্নভাবে খোঁজখবর নিয়ে এসব ইউনিটের কমিটি করার আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বলে জানা গেছে। এ জন্য খালেদা জিয়ার নির্দেশে বিএনপির ক’জন সিনিয়র নেতা ফাইল ওয়ার্ক করছেন। এছাড়া লন্ডন প্রবাসী বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তার ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে সারাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। তিনি শীঘ্রই তার মা খালেদা জিয়াকে এ ব্যাপারে প্রস্তাব পাঠাবেন বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলের আগে সারাদেশের সকল জেলা-উপজেলার কমিটিও কাউন্সিলের মধ্যে করার চেষ্টা করে দলীয় হাইকমান্ড। কিন্তু ৬ মাসেরও বেশি সময় ব্যয় করে কাউন্সিলের মধ্যে কমিটি করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সকল জেলা-উপজেলায় কেন্দ্র থেকে কমিটি চাপিয়ে দেয়া হয়। এমনকি তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় কাউন্সিলে আগত কাউন্সিলরও কেন্দ্র থেকে ঠিক করে দেয়া হয়।

সূত্র মতে, বিএনপি হাইকমান্ড চেয়েছিল কাউন্সিলের মাধ্যমে সারাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা ও এর সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর কমিটি গঠন করতে। এভাবে কমিটি গঠন করতে গিয়ে কোন কোন এলাকায় যোগ্য নেতাদের কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দিতে না পারলে তাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ এলাকায় তৃণমূল পর্যায়ে কাউন্সিল করতে না পারায় এ পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

পরপর ২ বার বড় ধরনের আন্দোলন করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিএনপির সর্বস্তরে স্থবিরতা বিরাজ করে। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে দল ত্যাগ করতে শুরু করেন। এ অবস্থার অবসানে সারাদেশের সর্বস্তরে দল পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি হাইকমান্ড। এরই অংশ হিসেবে তৃণমূলে আগে দল পুনর্গঠন করে জাতীয় কাউন্সিল করার কৌশল নেয়া হয়। এজন্য খালেদা জিয়ার নির্দেশে ৯ আগস্ট বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে পাঠানো এক চিঠিতে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সারাদেশের সকল জেলা-উপজেলাসহ সর্বস্তরে নতুন কমিটি করার নির্দেশ দেয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে কমিটি করতে ব্যর্থ হলে কেন্দ্র থেকে নতুন কমিটি চাপিয়ে দেয়া হবে বলে তৃণমূল নেতাদের প্রচ্ছন্ন হুমকি দেয়া হয়। এ ছাড়া আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার জন্যও তৃণমূল নেতাদের দায়ী করা হয়। তাই কেন্দ্রের চিঠি পেয়ে চরম নাখোশ হন তৃণমূল নেতারা।

কেন্দ্র থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর প্রায় এক মাস সময় অতিক্রম হলেও এখন পর্যন্ত কোন জেলা, উপজেলা ও পৌরসভায় কাউন্সিল করে কমিটি পুনর্গঠন করতে পারেনি বিএনপি। তবে বিভিন্ন এলাকায় কিছু ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কোন কোন জেলা-উপজেলায় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নেয়া হলেও নেতাকর্মীদের কোন্দলের কারণে তা সম্ভব হয়নি।

জেলা-উপজেলা কমিটি পুনর্গঠন করতে না পারায় বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল করার পর প্রায় ৬ বছর অতিক্রান্ত হলেও আরপিও-র তোয়াক্কা করছে না দলটি। কারণ, আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) অনুসারে তিন বছরের মধ্যে জাতীয় কাউন্সিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বিএনপির সিনিয়র নেতারা মুখে মুখে এ বছর শেষের দিকে জাতীয় কাউন্সিল করার কথা বললেও সে জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি দরকার তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনে প্রতিবছর রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় সম্প্রতি বিএনপি কয়েক দফা সময় পিছিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিয়েছে। দলের নেতারা মাসিক চাঁদা জমা না দেয়ায় বিএনপির আয় আগের বছরের চেয়ে কমেছে।

প্রসঙ্গত, বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল হয় ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। কাউন্সিলের পর ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি খালেদা জিয়াকে চেয়ারপার্সন, তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব করে দলের ৩৮৬ সদস্যের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ওই বছর ৬ এপ্রিল দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন খালেদা জিয়া। এর আগে ১৯৯৩ সালের ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলানগরে খোলা জায়গায় তাঁবু টানিয়ে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল করা হয়। ২০১২ সালের শেষ দিকে আবার জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। কাউন্সিল করার জন্য তখন ভেন্যুও ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু কাউন্সিলকে সামনে রেখে কেন্দ্র থেকে শুরু করে সারাদেশের সকল পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-কোন্দল বেড়ে যাওয়ায় ওই যাত্রায় আর জাতীয় কাউন্সিল করতে পারেনি বিএনপি হাইকমান্ড। এরপর বেশ ক’দফা চেষ্টা চালিয়েও জাতীয় কাউন্সিল করতে পারেনি। এক পর্যায়ে দলটি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কাউন্সিলের পরিবর্তে সরকারবিরোধী আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ কারণে জাতীয় কাউন্সিল করা থেকে বিরত থাকে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে রাজনৈতিকভাবে চরম বেকায়দায় পড়ে নতুন করে আবার জাতীয় কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতির মাধ্যমে সরকারবিরোধী আন্দোলনের একটি আমেজ সৃষ্টি করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার কৌশল নেয়া হয়। এজন্য সাংগঠনিক জেলাগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। অন্য নেতাদের প্রতি আস্থা না থাকায় জেলা নেতাদের ঢাকায় ডেকে এনে বৈঠক করে কমিটি পুনর্গঠন শুরু করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট জেলার কেন্দ্রীয় নেতারা পুনর্গঠিত জেলা কমিটির নেতাদের অসহযোগিতা করতে থাকেন। তাই নতুন করে জেলা পর্যায়ে কোন্দল ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে ডজন খানেক জেলা কমিটি গঠনের পর এ প্রক্রিয়ায় কমিটি পুনর্গঠনের কাজ স্থগিত করেন খালেদা জিয়া। এবারও তৃণমূল পর্যায়ে দল পুনর্গঠনের কাজে খালেদা জিয়ার নির্দেশ উপেক্ষিত হওয়ায় জাতীয় কাউন্সিলের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

তৃণমূলে কমিটি পুনর্গঠন শেষ করে জাতীয় কাউন্সিল করতে না পারলে নতুন করে নির্বাহী কমিটিতে কাউকে সংযুক্ত করা যাচ্ছে না। এ কারণে যোগ্যতা সম্পন্ন বিএনপির অনেক নেতা হতাশ হয়ে পড়েছেন। সুযোগবঞ্চিত বিএনপি নেতাদের ক্ষোভও বাড়ছে। তবে জাতীয় কাউন্সিল করার জন্য অনুকূল পরিবেশ না পেলে ২০১৬ সালের প্রথম ভাগে বিএনপি হাইকমান্ড সরাসরি কমিটি পুনর্গঠনের কাজে হাত দিতে পারেন। দলের তরুণ নেতারা আগেভাগেই নতুন কমিটিতে ভাল পদ পেতে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কমিটি পুনর্গঠন করা হলে বিএনপির বর্তমান ৩৮৬ সদস্যের নির্বাহী কমিটি থেকে ১০০ জনের বেশি নেতা বাদ পড়ে যাবেন। যাদের রাখা হবে তাদের মধ্য থেকে অনেকেরই পদ-পদবী রদবদল হবে। আর নতুন কমিটিতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিশ্বস্ত শতাধিক নেতাকে সুবিধাজনক অবস্থানে স্থান দেয়া হবে। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ জনকে নেয়া হবে সাবেক ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা তরুণ নেতাকে। ৭৫টি সাংগঠনিক জেলা থেকেও বেশ ক’জন নেতা কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাবেন।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান বলেন, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের নতুন কমিটি গঠনের চেষ্টা চলছে। কোন কারণে তা সম্ভব না হলে কেন্দ্র থেকে কমিটি গঠন করে দেয়া হবে। তবে ইতোমধ্যে কোন কোন জেলা থেকে খবর এসেছে নেতাকর্মীদের নামে থাকা মামলাসহ বিভিন্ন কারণে স্থানীয়ভাবে কাউন্সিল করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও কুমিল্লা দক্ষিণ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি রাবেয়া চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা এখনও জেলা-উপজেলা কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করতে পারিনি। আর কখন শুরু করতে পারবো তাও জানি না। তিনি বলেন, আমি অসুস্থ এবং বৃদ্ধ মানুষ হওয়ায় হয়রানির শিকার হচ্ছি না। কিন্তু বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মী মামলাসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে সাংগঠনিক কাজে সময় দিতে পারছেন না। তাই জেলা-উপজেলার কাউন্সিল ও নতুন কমিটি গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: