২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জঙ্গীদের অর্থ আসে হুন্ডি চ্যানেলে, অস্ত্র দেয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ


মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ জঙ্গীপনায় অর্থ আসছে অবৈধ পথে বিদেশে থেকে। অর্থাৎ হুন্ডি চ্যানেলে আবার এই অর্থ চলে যায় ব্যাংকিং চ্যানেলে। এভাবে গত কয়েক বছরে বিপুল অঙ্কের অর্থ পেয়েছে চট্টগ্রামভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন ‘শহীদ হামজা ব্রিগেড’সহ জঙ্গীপনায় জড়িতরা। আর এই অর্থ দিয়ে এই জঙ্গী সংগঠন কিনেছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম। প্রতিষ্ঠা করেছে তাত্ত্বিক ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। জামায়াত ও হেফাজতসহ মৌলবাদী যেসব সংগঠন দেশে রয়েছে এদের মতো এই সংগঠনের লক্ষ্য ও আদর্শ এক ও অভিন্ন। অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের যোগান আসছে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় তৎপর বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে। জঙ্গী গ্রুপ ও সীমান্তের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোর যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি গ্রুপ। পাহাড়ে চাঁদাবাজির পাশাপাশি এরা অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসায় জড়িয়ে থেকে মোটা অঙ্কের আয় বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। গত দুদিনে খাগড়াছড়ির দীঘিনালার নৌকাছড়ি ও বান্দরবানের রুমা থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনাগুলো সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে মনে করছে নিরাপত্তা বাহিনী। অবৈধ অস্ত্রের মূল ব্যবসাটি বিস্তৃত হয়েছে বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন স্পটে। সবচেয়ে বেশি ঘটছে বান্দরবানের সীমান্তের অরক্ষিত বিশাল অঞ্চল দিয়ে।

এদিকে, চট্টগ্রামভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন হামজা ব্রিগেডের কর্মকা- নিয়ে র‌্যাবের তদন্ত এগিয়ে চলেছে। র‌্যাব এই পর্যন্ত এই সংগঠনের বেনামে ১৪টি ব্যাংকে এ্যাকাউন্টের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। যা নিয়ে তদন্ত চলছে। ইতোপূর্বে যে চারটি ব্যাংকের এ্যাকাউন্ট থেকে ১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকার হদিস মিলেছে তা সানজিদা এন্টারপ্রাইজ নামের এ্যাকাউন্টের। মূলত এসব এ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে আসছিল হামজা ব্রিগেডের সামরিক শাখার প্রধান মনিরুজ্জামান ডন। এ পর্যন্ত তিন আইনজীবী ও এক গার্মেন্টস মালিকের মাধ্যমে ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা এসব এ্যাকাউন্টে প্রদানের হদিস মিলেছে।

র‌্যাব সূত্র জানায়, এ সংগঠনের অন্যতম এক হোতার নাম ওসমান। যাকে সংগঠন নেতাকর্মীরা বড় ভাই নামে সম্বোধন করে থাকে। এছাড়া দুবাইয়ের নাগরিক আল্লামা লিবদি নামের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। যিনি হামজা ব্রিগেডকে অর্থ সহযোগিতা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে তিনি যে কয়েকবার সফর করে গেছেন এবং হামজা ব্রিগেড সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তার প্রমাণও পেয়েছে র‌্যাব।

গেল বছর নগরীর ফয়’স লেক এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে বসে এই জঙ্গী সংগঠনের জন্ম দেয় জামায়াত-শিবির ও হেফাজত থেকে বেরিয়ে আসা দুর্ধর্ষ কিছু ক্যাডার। এদের রয়েছে সামরিকসহ বিভিন্ন শাখা। এসব শাখার একেকজন প্রধান রয়েছে। সামরিক শাখার রয়েছে আবার তিনটি গ্রুপ। যার একটি প্রধান মনিরুজ্জামান ডন। এই মনিরুজ্জামান ডনই মূলত অর্থ সংগ্রহ ও অস্ত্র, গোলাবারুদ ক্রয় ও সংগঠন কর্মীদের বিভিন্ন কাজে বিতরণের দায়িত্ব পালন করত। র‌্যাব-৭-এর তদন্তে এ সংগঠনের অস্তিত্ব ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর এ পর্যন্ত ২৮ নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে। অর্থ যোগানদানের চ্যানেলে জড়িত গ্রেফতার হয়েছে সুপ্রীমকোর্টের তিন আইনজীবী ও এক গার্মেন্টস মালিক। তিন আইনজীবীকে দুটি মামলায় গ্রেফতার করে রিমান্ডে আনার পর তারা হামজা ব্রিগেড নেতা মনিরুজ্জামান ডনের ব্যাংক এ্যাকাউন্টে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা প্রদানের কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দিয়েছেন সর্বশেষ ঢাকা থেকে গ্রেফতারকৃত গার্মেন্টস মালিক এনামুল হক। এই জঙ্গী সংগঠনের এ্যাকাউন্টে ১৬ লাখ টাকা প্রদানের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। সোমবার থেকে তাকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে র‌্যাব। অপরদিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জঙ্গী সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডের চার সদস্যের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। হাটহাজারী থানায় দায়ের করা মামলায় সোমবার চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোসাদ্দেক মিনহাজের আদালতে এদের উপস্থিত করা হয়। র‌্যাবের পক্ষ থেকে এই চার জঙ্গীর ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হলে আদালত তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

চট্টগ্রাম জেলা পিপি এ্যাডভোকেট আবুল হাশেম সাংবাদিকদের জানান, এ ৪ জনকে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি হাটহাজারী এলাকার মাদ্রাসাতুল আবু বকর নামে একটি কওমী মাদ্রাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। র‌্যাবের সেদিনের অভিযানে গ্রেফতার হয়েছিল মোট ১২ জন। সোমবার যে ৪ জনের রিমান্ড মঞ্জুর হয় তারা হলেনÑ মোঃ ইউসুফ (২৩), মুস্তাকিম বিল্লাহ ওরফে মাশরুর (২১), আবদুর রহমান ইবনে আসাদুল্লাহ (২৩) ও হারুনুর রশিদ (২০)।

সামগ্রিক বিষয় নিয়ে র‌্যাবের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সোমবার জনকণ্ঠকে জানান, গ্রেফতারকৃত সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, এ্যাডভোকেট হাসানুজ্জামান লিটন, এ্যাডভোকেট মাহফুজ চৌধুরী বাপন এবং সর্বশেষ গ্রেফতারকৃত টঙ্গীর তুরাগ এলাকার গোল্ডেন টাচ্ এপারেলের মালিক এনামুল হক ইতোমধ্যে নিজেদের বাঁচাতে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন এর সবই নিজেদের রক্ষার্থে আইনজীবীদের শেখানো বুলি। তিন আইনজীবী বলেছেন, হামজা ব্রিগেড সদস্যদের বা হেফাজত বা জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের মামলা চালানোর জন্য অর্থ নিয়ে তা ফেরত দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে, গার্মেন্টস মালিক এনামুল হক বলেছেন, তৈরি পোশাকের অর্ডার নিয়ে টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। এরা ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা প্রদান করেছেন। কিন্তু টাকাগুলো কিভাবে নিয়েছিলেন তার কোন প্রমাণ তারা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। সঙ্গতকারণে নিঃসন্দেহে বলা যায়, হুন্ডির চ্যানেলে এই অর্থ এসেছে হামজা ব্রিগেডের জন্য। মাধ্যম হিসেবে তিন আইনজীবী ও গার্মেন্টস ব্যবসায়ী তাদের পাওনা হাতিয়ে নিয়ে অবশিষ্ট টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে জমা দিয়েছেন। র‌্যাব আরও জানায়, তাদের কাছে এ ধরনের অর্থ যোগানদাতা অনেকের নাম এসেছে ইতোমধ্যে। যা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এছাড়া হুন্ডির মাধ্যমে যে পরিমাণ টাকা এসেছে তার পরিমাণও বেশ বড় বলে অভিযোগ এসেছে। কিন্তু যেহেতু এ টাকা ভিন্ন নামে বিভিন্ন ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার এ্যাকাউন্টে প্রদান করা হয়েছে তার একটি অংশ ইতোমধ্যে উদ্ঘাটিত হয়েছে। এ ধরনের আরও এ্যাকাউন্ট রয়েছে। এরই মধ্যে ১০টি এ্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তা অফিসিয়ালি বলা যাবে না।

র‌্যাব আরও জানায়, দেশে এসব জঙ্গী সংগঠনের অস্ত্র যোগানের কাজে সীমান্ত এলাকার বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তাদের ধারণা। বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এলাকার গহীন অরণ্যে মিয়ানমারের যেসব সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ রয়েছে তাদের মাধ্যমে মূলত অস্ত্রের যোগান আসছে বলে তথ্য রয়েছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: