মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৪ আশ্বিন ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

অনলাইনে পরচর্চা ও ব্যক্তিগত জীবন

প্রকাশিত : ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • রেজাউল করিম খোকন

নাহ, বাংলাদেশ আর পিছিয়ে নেই, অনেক সীমাবদ্ধতা, সমস্যা, সঙ্কট অতিক্রম করে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে স্বাধীনতার পর, চার দশকেরও বেশি সময়ে। অগ্রগতির নানা ধাপ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম, কৃতিত্বের ও সাফল্যের নানা বিষয়গুলো যখন আমরা দেখি পত্রিকার পাতায় তখন মনটা ভরে যায়। বাংলাদেশকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে সবাই যে যার অবস্থান থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজার রেখে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সম্প্রীতি ভ্রাতৃত্বের উজ্জ্বল নিদর্শন বাংলাদেশের মানুষ অনেকবার দেখিয়েছে। ’৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গোটা বাংলাদেশটা যেন একটি পরিবারে পরিণত হয়েছিল। একের প্রতি অন্যের সহানুভূতি, ভালবাসা, সহমর্মিতার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন দুর্যোগে, সঙ্কটকালীন মুহূর্তে। পৃথিবীর অন্য কোথাও তেমন সহানুভূতি, ভালবাসা আর সহমর্মিতার প্রকাশ রয়েছে বলে মনে হয় না। ইউরোপ আমেরিকায় সচ্ছলতা রয়েছে অধিকাংশ মানুষের মধ্যে বিত্ত বৈভবের অভাব নেই, বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত সেখানকার মানুষগুলোর হৃদয় আমাদের দেশের মানুষের মতো নয়। তাদের হৃদয়ে কোমলবৃত্তির প্রকাশ নেই, অনেকটা নৈর্ব্যক্তিক, যান্ত্রিক, কাঠখোট্টা জীবন তাদের। বাংলাদেশে বিত্ত-বৈভব সচ্ছলতা নেই বটে ধনাঢ্য ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলোর মতো কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে নিজেদের কোনোভাবেই ছোট মনে করি না আমরা, অনেক সময় অন্যদের চেয়ে বড় মনে হয় আমাদের।

কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা আমাদের ভীষণভাবে পীড়া দেয়, হতাশ করে, বেদনার্ত করে। ক্ষোভ আর হতাশা আচ্ছন্ন করে তোলে, নিজেদের হীনম্মন্যতা আর নিচুতার নানা প্রকাশ আমাদের আহত করে প্রচ-ভাবে। তখন মনে হয়, নাহ, বাংলাদেশের কিছু মানুষ এখনও সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি, পরশ্রীকাতরতা, হিংসুটে মনোভাব, কুরুচির নগ্ন প্রকাশ তাদের মুখে কালিমা লেপন করে। আমাদের চারপাশে কিছু কিছু মানুষের আচরণ ও কর্মকা- মাঝে মাঝে হৃদয়ের গভীরে বেদনা আর ক্ষোভের পাহাড় সৃষ্টি করে। তখন মনে হয়, আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানুষের চিন্তা চেতনার মধ্যে এখনো অনেক বৈষম্য রয়ে গেছে। যেখান থেকে আমরা সহজে বেরিয়ে আসতে পারছি না। কূপম-ূকতা আমাদের গ্রাস করে আছে এখনও। পরশ্রীকাতর স্বভাবটা আমরা মনে হয় ছাড়তে পারছি না।

সম্প্রতি বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন অভিনেত্রী সুমাইয়া শিমু। ঘরে ঘরে তার বেশ জনপ্রিয়তা এবং পরিচিতি রয়েছে। তার চমৎকার সহজ সাবলীল প্রাণবন্ত অভিনয় দর্শকদের ভীষণভাবে মুগ্ধ করে। সুমাইয়া শিমু অভিনেত্রী হিসেবে যেমন যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন, বিভিন্ন টিভি নাটকে তেমনিভাবে একাডেমিক জীবনেও তিনি কৃতিত্বের অধিকারী। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসএস এবং ড্রামাটিকস বিভাগ থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। শিমু যাকে বিয়ে করেছেন তার নাম নজরুল ইসলাম। তিনি নিউজিল্যান্ডের একটি ইউনিভার্সিটি থেকে এমএস করেছেন এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারী সংস্থা রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন। তাদের দু’জনের ক্যারিয়ার অনেক ভাল। তারা তাদের পরিবারের পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করেছেন। আমাদের সামাজিক কাঠামোতে এটাই বিধিবদ্ধ নিয়ম হিসেবে এখনও সর্বজনগ্রাহ্য। জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুমাইয়া শিমুর বিয়ের খবর ও ছবি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশের পর থেকে নানা রকম কুরুচিপূর্ণ, নোংরা মন্তব্য লক্ষ্য করা গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অর্থাৎ ফেসবুকে শিমুর ভক্ত-অভক্ত এক শ্রেণীর মানুষ তার বিয়ে এবং বর সম্পর্কে যাচ্ছেতাই আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন, যা আমাদের বেদনার্ত, হতাশ এবং ক্ষুব্ধ করেছে।

সভ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভাষা সংযত হয়। মত প্রকাশের গ-ি নির্ধারণেও লক্ষ্য করা যায় সতর্কতা। নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে বিশ্রীভাষায় মন্তব্য করা কোন সভ্য, ভদ্র, সুবিবেচক মানুষের কাজ নয়।

আমাদের দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদের মধ্যে কিছু অসভ্য, অবিবেচক মানুষের কর্মকা- দেখে মনে হয় আমরা এখনও সত্যিকারভাবে এগুতে পারিনি। স্রেফ ফেসবুকেই নয়। বাস্তব জীবনেও সুযোগ পেলেই আমরা আগ্রহী হয়ে উঠি অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে। মত প্রকাশের মাধ্যম ও সুযোগ পেয়েছি বলেই কি আমরা কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যা তা বলতে ও লিখতে পারি ?

অশ্লীল ভাষায় কমেন্ট রেকর্ড করে সেই ভিডিও ইউটিউব বা ফেসবুকে তুলে দেয়া কি সঙ্গত? সুমাইয়া শিমুর বিয়ে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যে বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করা গেছে সম্প্রতি তা যে কোন বিবেকবান মানুষকে পীড়িত করে বৈকি। শুধু তারকাদের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা যায় মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আমাদের কৌতূহলের শেষ নেই। সামান্য আলাপ কিংবা পরিচয়ের পরই কারো একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করি। কোন বিষয়ে আগ্রহ কেবল তখনই সৃষ্টি হয় যখন বিষয়টি নিয়ে আমরা গভীরভাবে ভাবি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভাবা এবং মন্তব্য করার মতো অহেতুক সময় আমরা পাই কোত্থেকে ? নিজের জীবন এবং পরিবারের নানা বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতেই তো আমাদের অস্থির থাকার কথা। পরচর্চা এবং অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানোর মতো অন্যায় কাজ কোন ধর্মেই সমর্থন করে না এটা সবাইকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে।

ছবি : আরিফ আহমেদ

মডেল : রিবা ও নিশা

প্রকাশিত : ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৭/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: