১৬ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সাদা মেঘের ভেলায় চড়ে


সময়ের আবর্তে পড়ে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস পেরিয়ে আবারও এলো শরতকাল। শরত এলো সাদা মেঘের ভেলায় চড়ে। শরত এলো আর প্রকৃতি হেসে উঠল। শরত এলো বন্যার পানিতে ধুয়ে আর অবিরল ধারায় বৃষ্টি স্নাত হয়ে নির্মল সজীবতা নিয়ে। শরতের প্রকৃতি যেন সদ্য স্নান সেরে আসা তরুণীর মতোই স্নিগ্ধ। শরতকে স্বাগত জানাতে অথবা শরত এলো বলেই প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজেছে। ওপরে-নিচে, ডানে-বামে যেদিকেই তাকানো যায় যেন অন্য রূপ।

গ্রীষ্মের প্রখরতা আর বর্ষার বিড়ম্বনার পরে শরত যেন একেবারেই শান্ত। চারদিকে সবুজের সমারোহ। গাছ-গাছালি, মাঠ-ঘাট, বাগ-বাগিচা, দূরের গ্রাম যেদিকেই তাকানো যায় সেদিকেই শুধু সবুজ আর সবুজ। যেন সবুজ কার্পেট আর সবুজের দেয়াল। সবুজ ধান গাছগুলো যেন পানির ওপর শুয়ে আছে। ধান গাছের ওপর দিয়ে যখন নৌকা চলে তখন নৌকার সঙ্গে পাতার ঘর্ষণে অদ্ভুত এক ছন্দের সৃষ্টি হয়। ধান গাছের ওপর বসে থাকা ফড়িং বা কীটপতঙ্গ, প্রজাপতি বা পাখি চমকিত হয়ে সুরুৎ করে উড়ে চলে যাচ্ছে। বকগুলো মাছ শিকারের আশায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে কোন জলজ উদ্ভিদের ওপর। আবার হয়ত ঝাঁক বেঁধে এক স্থান থেকে উড়ে অন্য স্থানে গিয়ে বসছে। তাদের উড়ন্ত ডানায় সূর্যের আলো পড়ে সাদা ঝিলিক দিয়ে উঠছে। জলাধারের পাশের ঝোপঝাড়গুলো আপন মনে বেড়ে উঠছে। এতে বাসা বেঁধেছে ডাহুক, পানকৌড়ি আর বালি হাঁসেরা। তাদের কলকাকলীতে মুখরিত জলাভূমি।

এ সময় বন্যার পানিতে ভাটার টান পড়ে। যাওয়ার সময় রেখে যায় সঙ্গে নিয়ে আসা পলি মাটি। তাই নদী-বিল-হাওড় বা মাঠের পানি একবারেই স্বচ্ছ। আর স্বচ্ছ পানির বুকে ফুটে আছে অসংখ্য শাপলা-পদ্ম ফুল। মনে হয় বিস্তীর্ণ মাঠ যেন শিশু কিশোরের মতোই হাসছে। কি অপূর্ব সেই দৃশ্য। ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বড়দের সঙ্গে ছোটদের শাপলা ফুল ওঠানো কি যে আনন্দের! শিশু-কিশোরেরা শাপলা ফুল দিয়ে মালা গেঁথে গলায় ঝোলায়। এ সময় খাল-বিল-নালার পানির স্রোত নদীমুখী হওয়ায় গতিপথে জেলেরা পেতে রেখেছে জাল। স্বচ্ছ পানিতে মাছের ঝাঁক দেখে জালে টান দিচ্ছে। আর উঠে আসছে অসংখ্য রূপালী মাছ। নলা, ফেকা, পুঁটি, খৈলশা, টেংরা, টাটকিনী, শৈল, টাকি আরও কত কি।

নিচে বিস্তীর্ণ সবুজ আর উপরে বিশাল নীলাকাশ। শরতের আকাশটা মনে হয়ে অনেক বড়। মেঘমুক্ত নীলাকাশ। হ্যাঁ, শরতের মেঘকে মেঘ বলি কি করে। যেন সাদা শুভ্র উড়ন্ত পায়রা। নীল আকাশের বুকে যেন মনের আনন্দে ভেসে বেড়াচ্ছে তুলার মতো নরম নরম মেঘ খ-। ইচ্ছে কি করে একটু ছুঁয়ে দেখতে। ছোট বেলায় কত কল্পনা করেছি ঐ মেঘের ওপর শুয়ে থাকতে বা পা ডুবিয়ে হাঁটতে। আসলে শরতের আকাশের দিকে তাকালে মনটা ভাল লাগায় ভরে যায়। কখনও কখনও নীলাকাশে নিঃসঙ্গ একটা চিল উড়ে যায়। উদাস হয়ে যায় মন। মনে পড়ে যায় প্রিয়জনের মুখ। আসলে প্রকৃতির নামই কি ভালবাসা? নাকি ভালবাসার নামই প্রকৃতি? কেননা সুন্দর প্রকৃতির কাছে এলেই মনে ভালবাসা জেগে ওঠে। প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে ইচ্ছে করে। একা থাকলে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়। মনে পড়ে মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা একান্ত নিজস্ব স্মৃতি। তাই তো কবির কবিতায় শরতের কোন এক দুপুরে ব্যর্থ প্রেমিকের প্রকৃতির প্রভাবে মনে উদয় হয়-

কোন কোন দুপুরে নীলাকাশে ভেসে যাবে একা চিল

সে তখন তোমাকে পাবে না।

আকাশের মতো বিস্তৃত করেও সে তোমাকে পাবে না।

সে তোমার ঠোঁট ছোঁবে, স্তনাগ্র, তোমার চিবুক

তবুও তুমি তার হবে না।

তোমার নিজস্ব পুরুষ সে তো জানো না

নিজস্ব ছাড়িয়েও আরও কিছু থাকে ॥

শরতের অন্যতম সুন্দর দৃশ্য হচ্ছে নদীর তীর ঘেঁষে বেড়ে ওঠা সারি সারি কাশফুল। নীল আকাশের নিচে সাদা কাশফুল যখন বাতাসের দোলায় দুলতে থাকে তখন মনটাও যেন আন্দোলিত হয়। মনে হয় শ্বেত বসনা এক ঝাঁক তরুণী যেন নৃত্য করছে।

শরতের সকাল শান্ত-স্নিগ্ধ, মিষ্টি আমেজের। শরতের শেষের দিকে ঘাসের ওপর হাল্কা শিশির পড়ে। সূর্যরশ্মি পড়ে যেন মনে হয় মুক্তার দানা। সকালের হাল্কা শিশির ভেজা ঘাষের ওপর শিউলি ফুল ছড়িয়ে পড়ে। বাতাসে শিউলি ফুলের সুগন্ধ মৌ মৌ করে। ছোটরা শিউলি ফুলের মালা গেঁথে অনাবিল আনন্দ পায়। শরতের শিউলি ফুল কবি হৃদয়কে আলোড়িত করে।

শরতের জ্যোৎ¯œার মতো নির্মল স্বচ্ছ জ্যোৎ¯œা অন্য ঋতুতে মেলা ভার। একবার ভাবুন তো বিস্তীর্ণ স্বচ্ছ জলরাশির ওপর ডিঙ্গি নৌকায় আপনি আর আপনার প্রিয়জন। উপরে নীলাকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। স্বচ্ছ স্থির পানিতে সেই চাঁদের প্রতিবিম্ব। চারদিকে শুধু জ্যোৎ¯œা আর জ্যোৎ¯œা। হাত বাড়ালেই ধরা যাচ্ছে। সারা শরীরে জ্যোৎ¯œা মেখে জ্যোৎ¯œায় ¯œান করছেন। মাঝে মাঝে খ- খ- শুভ্র সাদা মেঘগুলো চাঁদকে ঢেকে দিয়ে লুকোচুরি খেলছে। নাকি তারা আপনার সঙ্গেই লুকোচুরি খেলছে? কি এক অপূর্ব স্বপ্নিল পরিবেশ! শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত উপন্যাসের ইন্দ্রনাথ এই রকম জ্যোৎ¯œা রাতেই নৌকার গলুইয়ে শুয়ে মেঘের লুকোচুরি দেখতে দেখতে আনমনা হয়ে গিয়েছিল।

এ তো গেল জ্যোৎ¯œা রাতের কথা। শরতের অমাবস্যাও কি কম সৌন্দর্যের। মেঘমুক্ত নির্মল আকাশ থাকে বলেই অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকারে দেখা যায় অসংখ্য তারার মেলা। সারা আকাশে শুধু রূপালী তারা আর তারা। গোটা আকাশটা মনে হয় কদমফুল। এত তারা অন্য কোন ঋতুতে দেখা যায় না। আপনি চাইলে ছায়াপথ দেখতে পাবেন। আপনি হয়ত মুগ্ধ হয়ে আনমনে তারা দেখছেন। তারা দিয়ে কোন প্রতিকৃতি আঁকার চেষ্টা করছেন। আপনার মন চলে গেছে সীমাহীন আকাশের অন্তহীন গহীনে। সৃষ্টির বিশালতায় মুগ্ধ হচ্ছেন। হঠাৎ একটা উল্কা সাঁই সাঁই করে চলে যাবে। আর আপনি আনমনা ভেঙ্গে চমকে উঠবেন।

শরতের প্রকৃতি এতটা সৌন্দর্যম-িত বলেই হয়ত এ সময়ে দেবীরাও মর্ত্যলোকে নেমে আসেন। অনুষ্ঠিত হয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় শারদীয় পূজা। শরতের এই রূপ দেখতে হলে আপনাকে অবশ্যই প্রকৃতির কাছে যেতে হবে। শহরের দালান কোঠার আবদ্ধতা থেকে এই সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব নয়। যাদের শৈশব কেটেছে গ্রাম, পাহাড় বা প্রকৃতির কাছাকাছি তারা হৃদয়ের গভীরে শরতের এই অপরূপ সৌন্দর্য লালন করে থাকেন।

ছবি : সাদি ও আজিম এলাহি

মডেল : ফাহিম, সুজানা, নির্ঝর ও অমি